10/07/2026
বাবাকে নিয়ে আমি একটি গান লিখেছি। কিন্তু গানটি আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করার সাহস এখনও ঠিক করে উঠতে পারছি না।
গানটি তৈরি হওয়ার পর প্রথমে মাকে পাঠিয়েছিলাম। মা শুনে এত কেঁদেছিলেন যে অনেকক্ষণ আমার সঙ্গে কথাই বলতে পারেননি। আমিও যখন গানটির কথা ভাবি, চোখে পানি চলে আসে।
কয়েকবার ভেবেছি পোস্ট করব। আবার থেমে গেছি। কেন এত দ্বিধা, কেন এত ভয়—আমি নিজেও ঠিক জানি না। হয়তো কিছু স্মৃতি এতটাই নিজের, এত গভীরে থাকে যে সেগুলো সবার সামনে তুলে ধরতেও কষ্ট হয়।
গতকাল বাবাকে নিয়ে আমার লেখা একটি কবিতা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করেছিলাম। কবিতাটি পড়ে আপনারা অনেকেই এত সুন্দর কথা লিখেছেন যে মনে হলো, বাবাকে নিয়ে আরও কিছু কথা আপনাদের বলি।
কবিতাটিও আসলে ফেসবুকের জন্য লেখা হয়নি। কয়েক মাস আগে নিউইয়র্কের একটি লেখক সংগঠন তাদের প্রকাশিতব্য ম্যাগাজিনের জন্য আমাকে কিছু লিখতে বলেছিল। তখন বাবাকে নিয়ে এটি লিখেছিলাম। পরে আর দেওয়া হয়নি। হঠাৎ কয়েকদিন আগে লেখাটি খুঁজে পেলাম। পড়তে গিয়ে বাবার কথা খুব মনে পড়ল, তাই আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করেছিলাম।
আমার বাবা………………
আমার বাবা শুধু একটি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন না। এলাকার মানুষের সুখে-দুঃখে তিনি খুব জড়িত ছিলেন। কারও কোনো সমস্যা হলে সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। স্কুল, সমাজ আর মানুষের কাজেই তাঁর অনেকটা সময় চলে যেত।
তাই ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বসে দীর্ঘ সময় গল্প করার সুযোগ আমাদের খুব বেশি হয়নি।
কিন্তু ছোটবেলা থেকেই আমার মধ্যে একটা বিষয় ছিল—আমি এমন কিছু করতে চাইতাম, যাতে বাবা আমাকে নিয়ে গর্ব করতে পারেন।
একবার গণিত পরীক্ষায় ৯৫ পেয়েছিলাম। কিন্তু কেন ৫ নম্বর কাটা হলো, তার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এমনকি শিক্ষকও বলেছিলেন, বিশেষ কোনো কারণ ছাড়াই ৫ নম্বর কাটা হয়েছে। আমি খুব রেগে গিয়েছিলাম। পরীক্ষার খাতাটি শিক্ষকের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমার এই রাগের কথা বাবাকে জানিয়েছিলেন। সেদিন রাতে বাবা বাড়ি ফিরে আমাকে ঘটনাটি বলেছিলেন।
আজ এত বছর পর ঘটনাটি খুব ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু আমার এখনও পরিষ্কার মনে আছে।
আবার প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়কার সেই কেন্দ্রীয় পরীক্ষার কথাও মনে আছে। গণিতে ১০০ পেয়েছিলাম এবং পুরো উপজেলায় প্রথম হয়েছিলাম। পরে আমাকে অভিনন্দন জানানো হয়েছিল।
সেই বয়সে পুরস্কার বা প্রথম হওয়ার আনন্দ ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় একটা আনন্দ ছিল—বাবা নিশ্চয়ই আমাকে নিয়ে খুশি হয়েছেন।
অথচ বাবা কোনোদিন আমাকে বলেননি, তোমাকে ডাক্তার হতে হবে, ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে কিংবা জীবনে অমুক কিছু অর্জন করতেই হবে।
তিনি কখনো তাঁর স্বপ্ন আমার ওপর চাপিয়ে দেননি।
বাবার একটি কথায় আর কোনোদিন সিগারেট ছুঁইনি……..
কিশোর বয়সের আরেকটি ঘটনা আজও মনে পড়ে।
একদিন ধানক্ষেতের মাঝখানে গিয়ে জীবনে প্রথমবার একটি সিগারেট খেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এখানে আমাকে কে দেখবে!
কিন্তু ছোট জায়গায় খবর বোধহয় ধানক্ষেত পেরিয়েও বাড়িতে পৌঁছে যায়।
সেদিন রাতে বাবা বাড়ি ফিরে আমাকে বকেননি। রাগও করেননি। খুব শান্তভাবে শুধু বলেছিলেন,
“শুনলাম তুমি সিগারেট খেয়েছ। ধূমপান ভালো নয়।”
ব্যস। এতটুকুই।
তারপর জীবনে আর কখনো সিগারেট খাইনি।
এখন ভাবি, আমাকে বোঝানোর জন্য মানুষটিকে কখনো অনেক কথা বলতে হয়নি। তাঁর শান্তভাবে বলা কয়েকটি কথাই যথেষ্ট ছিল।
ডাক্তার হওয়ার আগে অন্য একটি স্বপ্নও ছিল………..
ছোটবেলায় আমি বেশ ফ্যাশনপ্রিয় ছিলাম। অভিনয়ের প্রতিও আমার আগ্রহ ছিল।
হাইস্কুলের শেষ বছরে স্কুলের নাটকে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। গানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছিলাম। অবাক করার মতো বিষয়, প্রথম পুরস্কারও পেয়েছিলাম। এখন এত বছর পর ভাবলেও আমার নিজেরই বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।
বাবা আমার সেই দিকটিও দেখেছিলেন।
তিনি আমাকে নিরুৎসাহিত করেননি। বরং আমার আগ্রহকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি আমাকে এম. এন. আক্তারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, যিনি সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং চট্টগ্রামের শিল্পী শেফালী ঘোষের অনেক গানের সঙ্গে কাজ করেছিলেন।
সম্ভবত ১৯৮৮ সালের দিকে বাবা আমাকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও করেছিলেন।
সেই সময় ‘নীতিবান’-এর প্রযোজক মাহফুজুর রহমানের সঙ্গেও আমার দেখা হয়েছিল চলচ্চিত্রে কাজ করার সম্ভাবনা নিয়ে।
জীবন হয়তো অন্যরকমও হতে পারত।
কিন্তু আমার মায়ের চিন্তা ছিল অন্যরকম। তিনি মনে করতেন, ওই জগতে যাওয়া আমার জন্য ভালো হবে না।
আমি বাবাকে খুব ভালোবাসতাম। তাঁকে খুশি করতে চাইতাম। আবার মাকেও খুব ভালোবাসতাম। তাঁর মনে কষ্ট দিয়ে কিছু করতে পারিনি।
শেষ পর্যন্ত সেই পথে আর যাওয়া হয়নি। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমি আমেরিকায় চলে আসি।
আজ ভাবলে ভালো লাগে—বাবা কখনো আমাকে নিজের পছন্দের কোনো ছাঁচে ঢোকানোর চেষ্টা করেননি। আমার মধ্যে যে আগ্রহ দেখেছিলেন, সেটাকে বিকশিত করার সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন।
পরে বাবাকে যেন নতুন করে পেয়েছিলাম…………..
অনেক বছর পর যখন বাবাকে আমেরিকায় আমার কাছে নিয়ে আসতে পেরেছিলাম, তখন যেন ছোটবেলায় না-পাওয়া কিছু সময় ফিরে পেয়েছিলাম।
আমরা একসঙ্গে রান্না করতাম। বাইরে যেতাম।
বয়স বাড়ার পর আমি বাবাকে শেভ করতে সাহায্য করতাম। আমার স্ত্রী তাঁর চুল কেটে দিত। আমার স্ত্রীর হাতের রান্না বাবা খুব পছন্দ করতেন।
কোনো বড় ঘটনা নয় এগুলো।
কিন্তু আজ মনে হয়, জীবনের বড় বড় অর্জনের চেয়ে সেই সাধারণ দিনগুলোর মূল্যই অনেক বেশি।
আর একবার যদি সেই দিনগুলো ফিরে পেতাম!
মানুষটি খুব সাধারণ ছিলেন………….
বাবা B.Ed.-এ প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। তারপরও বেশি অর্থ উপার্জনের জন্য সরকারি স্কুলে যাওয়ার কথা ভাবেননি। নিজের স্কুল, নিজের ছাত্র আর নিজের এলাকার মধ্যেই জীবন কাটিয়েছেন।
অবসরের সময় কোনো বিদায়ী উপহারও নিতে চাননি।
জীবনে কোনো পেনশনও পাননি।
আমার কাছেও কোনোদিন একটি পয়সা চাননি।
আমি যখন তাঁর জন্য কিছু কিনে দিতাম, অনেক সময় পরে দেখতাম, সেটিও তিনি অন্য কাউকে দিয়ে দিয়েছেন।
তখন আমার খুব খারাপ লাগত।
মনে হতো—এত যত্ন করে বাবার জন্য কিনলাম, আর বাবা অন্য কাউকে দিয়ে দিলেন!
আজ সেই কথা মনে পড়লে আর খারাপ লাগে না।
আজ শুধু মনে হয়—
আর যদি একবার বাবার জন্য কিছু কিনে দিতে পারতাম!
তিনি চাইলে আবার অন্য কাউকে দিয়ে দিতেন।
আমি আর কিছু বলতাম না।
যখন দেওয়ার সামর্থ্য হলো, তখন বাবা নেই………
আমার জীবনের একটি আক্ষেপ আমাকে আজও খুব কষ্ট দেয়।
যখন আমি একটু সচ্ছল হলাম, তখন আমার বাবা আর এই পৃথিবীতে নেই।
বাবা আমার কাছে কোনোদিন কিছু চাননি। সম্ভবত সেই কারণেই তাঁকে কিছু দেওয়ার ইচ্ছাটা আমার আরও বেশি ছিল।
কিন্তু সময়টা যেন মিলল না।
আজ আমার অনেক কিছু দেওয়ার সামর্থ্য হয়েছে—
শুধু দেওয়ার জন্য বাবা নেই।
আজ মানুষ আমাকে টেলিভিশনে দেখে। আমার লেখা বই প্রকাশিত হয়। আমার লেখা পড়ে মানুষ প্রশংসা করে। জীবনে এমন অনেক কিছু ঘটেছে, যেগুলো ছোটবেলায় হয়তো কল্পনাও করিনি।
কিন্তু যাঁকে গর্বিত করার জন্য ছোটবেলা থেকে এত পরিশ্রম করেছি, সেই মানুষটি এসব কিছুই দেখে যেতে পারলেন না।
এই জায়গাটায় এসে আমার সব অর্জন খুব ছোট মনে হয়।
মাঝে মাঝে শুধু মনে হয়—
বাবা, আপনি যদি আর কয়েকটা বছর থাকতেন!
তাই হয়তো গানটি পোস্ট করতে ভয় লাগে…………….
হয়তো এখন বুঝতে পারছি, বাবাকে নিয়ে লেখা গানটি পোস্ট করতে আমার এত দ্বিধা কেন।
এটা শুধু একটি গান নয়।
এর মধ্যে আছে ধানক্ষেতের মাঝখানে লুকিয়ে সিগারেট খাওয়া সেই কিশোরটি, বাবার শান্ত একটি বাক্য, গণিতে ৯৫ পেয়ে রাগ করা ছেলেটি, আবার ১০০ পেয়ে বাবাকে খুশি করতে চাওয়া সেই একই ছেলে।
এর মধ্যে আছে অভিনয় করতে চাওয়া এক কিশোর, যার আগ্রহকে বাবা থামিয়ে দেননি।
এর মধ্যে আছে অনেক বছর পর আমেরিকায় বাবার সঙ্গে রান্না করা, বাইরে যাওয়া, তাঁকে শেভ করতে সাহায্য করা, আমার স্ত্রীর তাঁর চুল কেটে দেওয়া এবং তাঁর আনন্দ করে আমার স্ত্রীর রান্না খাওয়া।
আর এর মধ্যে আছে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপগুলোর একটি—
যখন বাবার জন্য অনেক কিছু করার সামর্থ্য হলো, তখন বাবা আর নেই।
গানটি তৈরি করে মাকে পাঠিয়েছিলাম। মা শুনে অনেকক্ষণ কথা বলতে পারেননি।
হয়তো মা গানটির মধ্যে তাঁর জীবনসঙ্গীকে খুঁজে পেয়েছিলেন।
আর আমি খুঁজে পাই আমার বাবাকে।
যাঁকে জীবনে অনেক কথা বলা হয়নি।
যাঁর জন্য আরও অনেক কিছু করার ইচ্ছা ছিল।
যাঁকে দেখানোর মতো আজ অনেক কিছু আছে—
শুধু মানুষটিই নেই।
বাবা, আপনি যেখানেই থাকুন, আপনাকে খুব মনে পড়ে।
ছোটবেলায় যেমন চেষ্টা করতাম আপনাকে গর্বিত করতে, আজও হয়তো নিজের অজান্তে সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছি।
I miss you, Dad.
আপনারা আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন। আর পৃথিবীর যেসব বাবা আজ আমাদের মাঝে নেই, তাঁদের সবার জন্যও দোয়া করবেন।
আল্লাহ যেন তাঁদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করেন, তাঁদের প্রতি রহম করেন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন।
আমিন।
হতভাগ্য এক সন্তান , আপনার মনজুর….