17/07/2026
স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়—বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার:
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে এবারের বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ শতাংশের বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক বার্তা এবং স্বাস্থ্যকে জাতীয় অগ্রাধিকারের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার একটি সাহসী পদক্ষেপ।
কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে রয়ে গেছে—
এই বাজেট কি সত্যিই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে?
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে—না, শুধুমাত্র বাজেট বৃদ্ধি কোনো দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার রূপান্তর ঘটাতে পারে না।
WHO, World Bank, OECD এবং The Lancet–এ প্রকাশিত বহু গবেষণায় একটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে—Health System Performance is determined less by how much money is spent, and more by how effectively the system is governed. অর্থাৎ, একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করে শুধু কত টাকা ব্যয় করা হচ্ছে তার ওপর নয়; বরং সেই অর্থ কী ধরনের নীতি, সুশাসন, জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, তার ওপর।
বাংলাদেশে আমরা বহু বছর ধরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, স্বাস্থ্যবীমা এবং Universal Health Coverage (UHC) নিয়ে আলোচনা করছি। এগুলো নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এসব উদ্যোগ এমন একটি কাঠামোর মধ্যে বাস্তবায়িত হচ্ছে, যেখানে নীতিগত অসামঞ্জস্য, আইনগত সীমাবদ্ধতা, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, খণ্ডিত সেবা এবং জবাবদিহির ঘাটতি এখনও বিদ্যমান।
ফলে, অনেক ভালো উদ্যোগও প্রত্যাশিত ফল দিতে পারে না।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের অভাব নয়; বরং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা (Structural Constraints)।
যদি আমরা সত্যিই স্বাস্থ্যখাতে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন চাই, তাহলে সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে পাঁচটি মৌলিক বিষয়—
প্রথমত, স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি আধুনিক ও সমন্বিত আইনি ও নীতিগত কাঠামো (Legal and Policy Reform), যা বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, সুশাসন (Governance)। স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ, মাননিয়ন্ত্রণ এবং তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত না হলে বাজেটের কার্যকারিতা সীমিতই থাকবে।
তৃতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে একটি সুসংগঠিত Public–Private Partnership (PPP) Framework। বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্যসেবার বড় অংশ বেসরকারি খাতের মাধ্যমে প্রদান করা হয়। অথচ এই বিশাল সক্ষমতাকে এখনও একটি জাতীয় কৌশলের আওতায় সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগানো যায়নি।
চতুর্থত, স্বাস্থ্য অর্থায়নের সংস্কার (Health Financing Reform)। ব্যক্তিগত পকেট থেকে স্বাস্থ্য ব্যয়ের (Out-of-Pocket Expenditure) উচ্চ হার কমিয়ে ধীরে ধীরে সামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা (Social Health Protection) ও কৌশলগত ক্রয়ব্যবস্থা (Strategic Purchasing)-এর দিকে অগ্রসর হতে হবে।
পঞ্চমত, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে (Primary Health Care) পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসা নয়—প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য উন্নয়ন, কমিউনিটি অংশগ্রহণ এবং ধারাবাহিক সেবার ওপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে উঠতে হবে।
Universal Health Coverage কোনো একক প্রকল্প নয়, কোনো একক বাজেটও নয়। এটি একটি System Transformation Agenda।
এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, দীর্ঘমেয়াদি নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা।
আজ বাংলাদেশের সামনে একটি বিরল সুযোগ এসেছে। নতুন বাজেট, নতুন রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং সংস্কারের আলোচনা—সব মিলিয়ে এখনই সেই সময়, যখন আমরা স্বাস্থ্যখাতকে প্রকল্পনির্ভর উন্নয়নের সীমা অতিক্রম করে একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ এবং মানুষকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রূপান্তর করতে পারি।
আমরা যদি শুধু বাজেট বাড়িয়ে সন্তুষ্ট থাকি, তাহলে হয়তো কিছু স্বল্পমেয়াদি সাফল্য আসবে। কিন্তু যদি আমরা আইন, নীতি, সুশাসন, অর্থায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে সাহসী সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই Universal Health Coverage অর্জনের পথে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে।
স্বাস্থ্যখাতের প্রকৃত সংস্কার শুরু হয় বাজেট দিয়ে নয়; শুরু হয় নীতি, সুশাসন, আইন এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান দিয়ে।
এখন সময় এসেছে—Health Sector Reform-কে একটি প্রশাসনিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি রূপান্তরমূলক এজেন্ডা হিসেবে দেখার।