03/07/2026
দশমহাবিদ্যা সংখ্যায় দশ হলেও, আদতে তাঁদের মধ্যে পাঁচজনই মৌলিক মহাবিদ্যা। বাকি পাঁচজন সেই মৌলিক পঞ্চবিদ্যার বিস্তার।
কালী, তারা, ছিন্নমস্তা, ষোড়শী এবং লক্ষ্মী।
কালীর বিস্তার ধূমাবতী। কালী ও ধূমাবতীর উৎস এক ঐ বেদের নিঃঋতি। কালী চতুর্বর্গদাত্রী, ধূমাবতী সেই কালীর প্রায়োগিক মূর্তি। ধূমাবতীর স্বতন্ত্র কোনো ক্রম হয় না। কালী থেকেই ধূমাবতীর কাছে যেতে হয়। অন্য মহাবিদ্যা দিয়েও যাওয়া যায়। কিন্তু কালী এখানে মুখ্য। ধূমাবতীর মন্ত্রক্রমের সর্বোচ্চ মূর্তি ভদ্রকালী। ধূমাবতী কালীতে সম্পূর্ণতা পান। ধূমাবত্যষ্টকাদি স্তুতিপ্রমাণেও ধূমাবতী মূলত কালীরই প্রকাশভেদ।
তারার বিস্তার মাতঙ্গী। যদিও মাতঙ্গীর স্বতন্ত্র ক্রমোপাসনা আছে, তথাপি মাতঙ্গী স্বরূপত প্রায়োগিক মূর্তি। মাতঙ্গীর কোনো মন্ত্রই মোক্ষপ্রদ নয়, সকলই ভোগপ্রদ। মাতঙ্গী সাধনার মূলত দুই শাখা--
রাজমাতঙ্গীক্রম এবং উচ্ছিষ্টচাণ্ডালিনীক্রম।
এঁদের মধ্যে রাজমাতঙ্গী শ্রীবিদ্যার সঙ্গে একীভূতা হয়েছেন, শ্রীবিদ্যার ক্রমোপাসনার মধ্য দিয়েই এই রাজমাতঙ্গীর সাধনা প্রকাশিত হয়।
উচ্ছিষ্টচাণ্ডালিনীক্রম মূলত উচ্ছিষ্টক্রমমার্গেই প্রকাশিত হয়। উচ্ছিষ্টগণেশ, বটুক কিংবা দেবী তারার মন্ত্রক্রমের অঙ্গরূপেই উচ্ছিষ্টমাতঙ্গীর সাধনা পাওয়া যায়।
রাজমাতঙ্গীর সাধনা শ্রীবিদ্যায় এবং উচ্ছিষ্টমাতঙ্গীর সাধনা নীলসরস্বতীতে সম্পূর্ণতা পায়।
মাতঙ্গীক্রমের আর একটি শাখা বাগবাদিনী। সেটিও নীলসরস্বতীতেই সম্পূর্ণতা পায়। তবে এই বাগবাদিনী নিতান্তই সারস্বত সাধনা বলে সেই অর্থে কৌলমার্গে উদযাপিত নয়। অঙ্গবিদ্যারূপেই এঁর চর্চা হয়।
সরস্বতীর সাধনাও তারা মহাবিদ্যাতেই সমাপ্ত হয়। সারস্বত সাধনার স্বতন্ত্র ক্রম মেলে না। শারদাদি সকল সারস্বতবিদ্যা তারাতেই সম্পূর্ণতা লাভ করেন।
আসলে তারা, মাতঙ্গী এবং সরস্বতী তিনেরই উৎস বেদের বৃহস্পতিপত্নী বৃহতী সরস্বতী। ফলে এঁরা অভিন্ন নয়। বৃহস্পতিপত্নী বৃহতীই তন্ত্রের নীলসরস্বতী। তাই নীলসরস্বতীই মাতঙ্গী, সরস্বতী ও তারার সম্পূর্ণতা।
ত্রিপুরসুন্দরীর বিস্তার হল ভুবনেশ্বরী, বগলামুখী এবং ভৈরবী। ভৈরবী এবং ভুবনেশ্বরীর কোনো স্বতন্ত্রক্রম সেই অর্থে নেই। ভুবনেশ্বরী সাধনা ক্রমশ গৌরী, দুর্গা এবং ত্রিপুরসুন্দরীতে সম্পূর্ণতা পায়। একাক্ষর থেকে ষোড়শাক্ষরের যাত্রা ত্রৈপুরক্রমেই রক্ষিত।
বগলামুখীর ক্ষেত্রেও একই। সাংখ্যায়ন তন্ত্রে স্পষ্টই উল্লেখ আছে যে, শ্রীবিদ্যার ঊর্দ্ধ্বাম্নায় সিদ্ধ করলে তবেই বগলামুখী দীক্ষা গ্রহণ করা উচিত। বর্তমানে বগলামুখীর স্বতন্ত্রক্রম আবিষ্কৃত হলেও, তার শাস্ত্রীয় ভিত্তি মেলে না।
কালী, তারা, ত্রিপুরা, ছিন্নমস্তার অঙ্গরূপেই বগলামুখীর সাধনা হবে। বগলামুখী মহাবিদ্যা সম্পূর্ণ প্রায়োগিক বিদ্যা। এই বিদ্যার সম্পূর্ণতা শ্রীবিদ্যাতেই হয়ে থাকে।
আর ভৈরবীবিদ্যার সঙ্গে শ্রীবিদ্যার সম্পৃক্ততা সকলেই অবহিত। ত্রিকূটা বালা থেকে ত্রিকূটা ত্রিপুরার সবই ত্রিপুরসুন্দরীর নবাসনে সমাহিতা। তাই ভৈরবীর সম্পূর্ণতা যে ত্রিপুরসুন্দরীতে, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ভৈরবীরও স্বতন্ত্রক্রমোপাসনা নেই। শ্রীবিদ্যাসাধনাতেই ভৈরবীসাধনা সম্পূর্ণ হয়।
ছিন্নমস্তার কোনো বিস্তার হয়নি শাক্তক্রমে। ইনি স্বয়ংসম্পূর্ণ একাকী বিরাজ করছেন দশমহাবিদ্যায়। কারো কারো মতে ধূমাবতী বা বগলা এই ছিন্নমস্তার বিস্তার হতে পারে। যেহেতু ধূমাবতীতে ক্ষুধাতত্ত্ব এবং বগলাতে বজ্রতত্ত্ব দেখা যায়। কিন্তু এগুলি তাত্ত্বিক সমন্বয় মাত্র। ক্রমসাধনা তত্ত্ব দিয়ে হয় না।
ছিন্নমস্তার মন্ত্রক্রম স্বতন্ত্র। এঁর স্বতন্ত্র ক্রমোপাসনাও দেখতে পাওয়া যায়। বঙ্গদেশে যদিও কালী, তারা, ত্রিপুরার অঙ্গবিদ্যারূপে ছিন্নমস্তার সাধনা প্রচলিত; কিন্তু এর কারণ ছিন্নমস্তার স্বতন্ত্রক্রমের অভাব নয়, বরঞ্চ ভীতি। স্বতন্ত্র ছিন্নমস্তা উপাসনাকে আজও শাক্তরা ভয় পায়। তাই এই ক্রম শুরু থেকেই দেওয়া হয় না। সাধককে আগে গুরুগণ প্রস্তুত করেন মানসিক ও আধ্যাত্মিকভাবে, তারপর এই ক্রমোপাসনা দেন।
বিভিন্ন মহাবিদ্যার পথ ধরে ছিন্নমস্তায় আসা যায়। যে মহাবিদ্যার ক্রম ছিন্নমস্তায় প্রবেশ করে, সেখানে আর তদুত্তর দেবতার সাধনা নেই। অর্থাৎ ছিন্নমস্তা প্রাপ্তি হলে আলাদা করে মহাষোড়শী, বিদ্যারাজ্ঞী বা নির্বাণাদি মন্ত্রের আবশ্যকতা থাকে না। ছিন্নমস্তাতেই সকল মহাবিদ্যার বিলয় হচ্ছে বলে ধরা হয়। প্রচলিত পরম্পরাগুলিতে যা দেখা যায়, কালীক্রম, তারাক্রম, ত্রিপুরসুন্দরীক্রম এবং দুর্গাক্রমের মাধ্যমে ছিন্নমস্তায় প্রবেশাধিকার মেলে। অপরদিক ছিন্নমস্তার নিজস্বক্রমে অধিকার থাকলে আর সকল মহাবিদ্যা স্বতঃই চর্চিতা হন অঙ্গোপাঙ্গবিদ্যারূপে। ছিন্নমস্তার লয় বা সম্পূর্ণতা ছিন্নমস্তা নিজেই।
পঞ্চম মহাবিদ্যা লক্ষ্মীও অনুরূপভাবে স্বতন্ত্রা। এঁর তিনটি শাখাই বর্তমানে দেখা যায়।
গাণপত্যক্রম--যেখানে লক্ষ্মীসাধনা সিদ্ধিলক্ষ্মীতে লয়প্রাপ্ত হয়।
বৈষ্ণবক্রম--যেখানে লক্ষ্মীসাধনা পরালক্ষ্মীতে লয়প্রাপ্ত হয়।
শাক্তক্রম--এখানে লক্ষ্মীসাধনা সিদ্ধিলক্ষ্মী (কালসংকর্ষিণী)-তে লয়প্রাপ্ত হয়।
লক্ষ্মীর থেকে অজস্র মহাবিদ্যার উদয় হয়। বারাহী, প্রত্যঙ্গিরা, কালসংকর্ষিণী, সিদ্ধলক্ষ্মী, চণ্ডী, এমনকি দুর্গাও।
দুর্গার যদিও বা স্বতন্ত্রক্রম আছে। জয়দুর্গা বা জগদ্ধাত্রী কিংবা নবার্ণ সাধনা দিয়ে দুর্গাক্রম শুরু হতে পারে। তবে সেই দুর্গাক্রমও ষোড়শী শ্রীবিদ্যায় লয়প্রাপ্ত হয়। দুর্গার স্বতন্ত্র কোনো মূর্তি অন্তিমসাধনারূপে দেখা যায় না।
লক্ষ্মীক্রমে এই দুর্গাকে অঙ্গবিদ্যারূপে আমরা পাই। তারপর অন্যান্য বিভিন্ন মহাবিদ্যাকে অতিক্রম করে শেষে লক্ষ্মীকেই ষোড়শীরূপে আমরা পাই। কাশ্মীরক্রমে আবার লক্ষ্মীকে আমরা সিদ্ধলক্ষ্মীরূপে দেখতে পাই।
যদিও সেখানেও অন্তিমে ওই পরাষোড়শী অবস্থান করছেন।
সহজভাষায় লক্ষ্মীক্রমের সাধনা দুর্গা, সিদ্ধলক্ষ্মী হয়ে শ্রীবিদ্যার পথ ধরে অন্তিমে সেই পরালক্ষ্মীতে গিয়ে শেষ হয়।
এইভাবে আমরা দেখি যে, দশমহাবিদ্যার ক্রমোপাসনা মূলত পাঁচভাগে বিভাজিত। এই পাঁচভাগ আসলে শাক্তদের পঞ্চ আম্নায়--
লক্ষ্মী পূর্বাম্নায়, কালী দক্ষিণাম্নায়, তারা পশ্চিমাম্নায়, ছিন্নমস্তা উত্তরাম্নায় এবং শ্রীবিদ্যা ঊর্ধ্বাম্নায়।
এর বাইরে অধরাম্নায়ে যক্ষিণীগণ এবং অনুত্তরাম্নায়ে নির্বাণ সাধনা হয়ে থাকে। সেগুলিতে প্রবেশাধিকার এই উপরে উক্ত আম্নায়ক্রমগুলির সম্পূর্ণতায় লাভ করা যায়।
যদিও এই আম্নায়বিভাজনে অজস্রে মতান্তর ও ভেদ দেখা যায়। সেগুলি মূর্তিভেদে পরিবর্তিত হতে থাকে। যদিও এই পঞ্চবিদ্যার ক্রমাধিপত্যের প্রত্যব্যয় দেখা যায় না।
এর অর্থ এই নয় যে, কারো ইষ্ট দুর্গাদি অঙ্গদেবতা হলে তাদের সাধনা ব্রহ্মত্বদায়ক বা স্বতন্ত্র নয়। বা তারা মরণান্তে দুর্গাকে নয় অন্য কোনো অবাঞ্ছিত মহাবিদ্যাকে দেখবে।
ক্রম আর ভাব এক নয়। ইষ্ট ভাবময়।
কারো ইষ্টদেবতা যদি মনসা হয়, সে অধরাম্নায়ের অধীন। ক্রমানুসারে সে মনসা থেকে সাধনা শুরু করে তারা মহাবিদ্যার সাধনায় প্রবেশ করবে। কারণ মনসার সম্পূর্ণতা তারা মহাবিদ্যাতেই হয়ে থাকে। পশ্চিম আর অধরাম্নায়ের যুগপৎ সাধনা হয়।
একইভাবে, কারো ইষ্টদেবী রেণুকা হলে, সে পশ্চিমাম্নায়ের অধীন। তার সাধনা রেণুকা থেকে শুরু করে ছিন্নমস্তায় গিয়ে শেষ হবে।
এক্ষেত্রে মনসারই সর্বোচ্চমূর্তি তারা, রেণুকারই সর্বোচ্চমূর্তি ছিন্নমস্তা। অংশ ও অংশীভাব। বস্তুত ভেদ নেই।
শাক্তমতের সকল মহাবিদ্যাই--এমনকি উর্বশী তথা মধুমতী যক্ষিণী কিংবা মহাসতী অরুন্ধতী অথবা দ্রৌপদী, সকলেই পরাশক্তিবাচ্যা। সকলেই স্বতন্ত্র উপাসনা ও ভক্তির দাবীদার। এখানে উচ্চনীচ ভেদ নেই।
কিন্তু এই অনন্ত মহাবিদ্যা, সিদ্ধবিদ্যা, উপবিদ্যাগণ মুখ্যত পঞ্চশক্তির প্রকাশ। যাবতীয় শাক্ত মন্ত্রক্রমের সাধনা ওই ওই মহাবিদ্যাতেই সমাপ্ত হয়ে যায়। আলাদা করে সবার ক্রম হয় না। হলেও তা ওই ওই বিদ্যা থেকে শুরু করে সেই মুখ্য পাঁচ মহাবিদ্যায় সম্পূর্ণতা পায়।
এই পাঁচ মহাবিদ্যার সাধনা যখন প্রত্যক্ষ পঞ্চমকারে নীলাধারে বা চীনাধারে হবে, তখন তা কালীকুল।
আর যখন এই পাঁচ মহাবিদ্যার সাধনা পরোক্ষ পঞ্চমকারে মূর্তিতে বা যন্ত্রে হবে, তখন তা শ্রীকুল।
দুই কুলেই এই পাঁচ মহাবিদ্যা আরাধিতা হবেন। এখানে দেবী বা ক্রম বা আম্নায়ভেদে কুলভেদ হয় না।
স্বাভাবিকভাবেই তারাকুল, ছিন্নমস্তাকুল, ধূমাকুল, দুর্গাকুল, সরস্বতীকুল ইত্যাদি অজস্র কুলের ধারণাও কল্পিত বা অতিশয়োক্তিমাত্র। শাস্ত্রীয় নয়।
অত্যাশ্চর্যভাবেই এই পাঁচমহাবিদ্যায় পঞ্চদেবতার প্রকাশ আমরা পাই।
লক্ষ্মীর মৌলিক দার্শনিক ভিত্তি বৈষ্ণবীয়, তাই তিনি বিষ্ণুপ্রধানা।
কালীর মৌলিক দার্শনিক ভিত্তি শৈব, তাই তিনি শিবপ্রধানা।
তারা ও ছিন্নমস্তার মৌলিক দার্শনিক ভিত্তি বৌদ্ধ ও গাণপত্যমিশ্রিত। তাই উভয়েই মহাচীন বা উচ্ছিষ্টপ্রধানা।
শ্রীবিদ্যার মৌলিক দার্শনিক ভিত্তি সম্পূর্ণভাবে শাক্ত। শক্তিসর্বস্বমত।
এইরূপে শৈব, বৈষ্ণব, গাণপত্য, বৌদ্ধ এবং শাক্তমতও এই পঞ্চমহাশক্তিপ্রধান।
সৌরদর্শনের কোনো দেবীই স্বতন্ত্র মন্ত্রক্রমে থাকতে পারেননি। গায়ত্রী সম্পূর্ণ হয়েছেন ভুবনেশ্বরীতে। আর ভুবনেশ্বরী ষোড়শীতে।
আর হয়তো এইকারণেই সৌরসম্প্রদায় লয়প্রাপ্ত হয়েছে। কারণ সৌরগণ শাক্তসিদ্ধান্তের সঙ্গে আপোষ করতে পারেনি। আর সকল সম্প্রদায় কোনো না কোনো ভাবে শাক্তমতকে গ্রহণ করে টিকে গেছে।
মহামায়ার এই প্রকৃতিরূপকে অগ্রাহ্য করে পুরুষরূপের কোনো সাধনাই স্বতন্ত্রভাবে বেঁচে থাকতে পারবে না।
আর তাছাড়া, শক্তিগণ নিশাচরী। তাঁরা চাঁদের আলোয় নিশিযাপন করেন। সূর্যের প্রখর শাসন শক্তিগণ মেনে নিতে পারেন না।
হয়তো এইকারণেই ঊষা বা নিশা কাউকেই সূর্য নিজের পাশে পায় না। সংজ্ঞাকেও পেতে গেলে সূর্যকে পশু হয়ে আসতে হয়।
সৌরমত তাই শাক্তমতের অঙ্গ হয়ে টিকে গেছে। বাকি মতসকল শক্তির আধিপত্য স্বীকার করে শক্তিকে অর্ধাঙ্গিনী করে আজও প্রভুত্ব করছে বিশ্বের কোনো না কোনো প্রান্তে।