11/06/2026
ব্যাথামুক্ত নরমাল ডেলিভারি নিয়ে কিছু কথা
পৃথিবীতে যতো ধরনের অসহনীয় মাত্রার ব্যাথা আছে তার মধ্যে নরমাল ডেলিভারির ব্যাথা অন্যতম। ব্যাথার যদি একটা স্কেল করা যায় এক থেকে দশ পর্যন্ত মার্কিং করে, তবে নরমাল ডেলিভারীর অবস্থান হবে আট থেকে দশের মধ্যে। সর্বশেষ সাউথ এশিয়ান গাইনোকলজিক্যাল কনফারেন্সে একজন বক্তা বলছিলেন যে, কোন এনেশথেশিয়া ছাড়া একটা আঙ্গুল শরীর থেকে কেটে ফেললে যেরকম ব্যাথা হয়, নরমাল ডেলিভারির এক একটি ব্যাথার এপিসোডে সে পরিমাণ ব্যাথা অনুভব করে একজন মা। নরমাল ডেলিভারির ব্যাথা যেহেতু থেমে থেমে আসে, সেহেতু ধরে নেয়া যায় প্রতিবার ব্যাথা উঠলে তিনি একটি তরতাজা আঙ্গুল এমপুট করার সমান ব্যাথা অনুভব করেন। আগের দিনে বহু নারী নরমাল ডেলিভারি প্রসেসে মারা যেতেন। এজন্য একবার নরমাল ডেলিভারি হওয়ার পরের জীবনকে তার দ্বিতীয় জীবন বলে ভেবে নেয়া হতো। এমনকি কোথাও কোথাও এটাকে মৃত্যু যন্ত্রণার সাথে তুলনা করা হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন সাধারণ মানুষের অন্যান্য সকল সহনশীলতার সাথে সাথে ব্যাথার সহনশীলতাও কমে গেছে, নরমাল ডেলিভারির রেটটাও কমতে শুরু করেছে। এক্ষেত্রে বেশীরভাগ মানুষ অবস্ট্রেটিসিয়ানদের দায়ী করলেও বাস্তবের মূলচিত্রটা কিন্তু ভিন্ন। এখনকার বেশীরভাগ মায়েরাই এই ব্যাথা সহ্য করতে চান না প্রথম থেকেই। যাও বা দু'চারজন বেশ সাহস নিয়ে শুরু করেন, একটা নির্দিষ্ট লেভেলের পর তারাও বেঁকে বসেন।
এখানে দুটো বিষয় আলোচনায় আসে। এক,সবার ব্যাথা সহনের মাত্রা এক না। সহনশীলতার মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে কেউই ব্যাথা সহ্য করতে পারেনা। দুই, একজন নিজের সহনশীলতা সম্পর্কে কনফিডেন্ট থাকলেও একটা পর্যায়ে গিয়ে আর সহ্য করতে পারেনা। এই ব্যাপারে একটা গল্প বলি। আমার প্রথম বাচ্চা নরমাল ডেলিভারি হওয়ার পরদিন আমার চাচী বলেছিলেন, বাচ্চা হওয়ার আগে সবার কাছে গল্প শুনেছি ব্যাথাটা এমন, ব্যাথাটা অমন। মনে মনে একটা কল্পনা করে রেখেছিলাম। কিন্তু নিজের না হওয়া পর্যন্ত কোনদিনই বোঝা যায় না, আসলে ব্যাথাটা কেমন! কথা কিন্তু এটাই। একবার নরমাল ডেলিভারির ব্যাথা সহ্য করার আগে পর্যন্ত কারো পক্ষেই এ ব্যাপারে ধারণা করা সম্ভব না। এই যেমন, আপনি জানেন মৃত্যুযন্ত্রণা খুবই ভয়ানক। কিন্তু আপনি কখনোই সে সম্পর্কে ধারণা পোষণ করতে পারবেন না। এর আগেও আমি এক জায়গায় উল্লেখ করেছিলাম, একটা নরমাল ডেলিভারিতে টোটাল যে পরিমাণ ব্যাথা হয় তা একসাথে বিশটা হাড় ভাঙার ব্যাথার সমতুল্য।
তো যা বলছিলাম, ব্যাথার কথা ভেবে অনেকেই নরমাল ডেলিভারির আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ফলে বেড়ে যাচ্ছে সিজারের ট্রেন্ড। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একটি অনন্য উপায় হচ্ছে, ব্যাথামুক্ত নরমাল ডেলিভারি। প্রচলিত অর্থে ব্যাথামুক্ত বলতে যেমন সম্পূর্ণ ব্যাথাবিহীন বোঝায়, ব্যাপারটা কিন্তু তা না। ব্যাথা এখানে থাকবে। তবে তা হবে সহনশীলতার সীমারেখার মধ্যে।
আসলে কি করা হয় এখানে? এ সম্পর্কে মানুষের ধারণা আসলে স্বচ্ছ্ব নয়। একজন গর্ভবতী যদি নরমাল ডেলিভারি করানোর জন্য সম্পূর্ণরূপে ফিট হন, তখন একজন এনেসথেশিয়ার ডাক্তারের মাধ্যমে কনফার্ম করা হয় যে তাকে এপিডুরাল এনেসথেসিয়া দেয়া যাবে কিনা। ওহ্,বলাই হয়নি। এখানে মূলতঃ নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট মাত্রায় এনেসথেসিয়া দেয়া হয়। এই নির্দিষ্ট সময়টা কখন? যখন একজন মা ব্যাথার সহ্যসীমা অতিক্রম করতে বসেন। অর্থাৎ যখন অতিরিক্ত ব্যাথা শুরু হয় যেটাকে আমরা একটিভ লেবার বলি, সে সময় একটা লেভেলে এসে ব্যাথা হয়ে যায় মাত্রাতিরিক্ত। এই মাত্রাতিরিক্ত ব্যাথাকে সহনীয় পর্যায়ে আনা হয় এপিডুরাল এনেসথেসিয়ার মাধ্যমে।
প্রশ্ন আসতে পারে,সম্পূর্ণ ব্যাথা কমানো হয় না কেন? কারণ, পুরো ব্যাথা কমিয়ে দিতে হলে কোমর থেক নীচের অংশ পুরো অবশ করতে হবে যেমনটা করা হয় সিজারে। ফলে কি হবে বুঝতেই পারছেন। রোগীর একদিকে যেমন ব্যাথা চলে যাবে,তার পুশিং একশনও চলে যাবে। বন্ধ হয়ে যাবে লেবার প্রসেস।
সুতরাং, নরমাল ডেলিভারি করাতে হলে ব্যাথা সহ্য করার মানসিকতা আপনাকে তৈরী করে রাখতে হবে শুরু থেকেই। অনেককেই দেখেছি, প্রেগন্যান্সির শুরু থেকেই হোমিওপ্যাথি খায় নরমাল ডেলিভারি করানোর জন্য। এটা একেবারেই ভ্রান্ত ধারণা যে, হোমিও ওষুধ খেলে নরমাল ডেলিভারি হয়। যদিওবা কারো হয়, ওটা অনেকটা ঝড়ে বক পড়ার মতো। মাঝখান থেকে হোমিওপ্যাথির কেরামতি বাড়ে আর কি!
তাহলে আপনি কি করবেন? প্রথম থেকেই নিয়মিত চেকআপ করে নিজে সুস্থ থাকুন, পেটের বাচ্চাসহ। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটাহাঁটি এবং হালকা ব্যায়াম করুন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করুন ডেলিভারি ব্যাথা সহ্য করার জন্য। এরপর তো আমরা আছিই। আপনার মাত্রাতিরিক্ত ব্যাথা সহনশীল পর্যায়ে নিয়ে এসে আপনাকে নরমাল ডেলিভারিতে সাহায্য করার জন্যই এই বিশেষ ব্যাথামুক্তির ব্যবস্থা এখন এভেইলেবল করা হচ্ছে সর্বত্র।এক্ষেত্রে আপনার খরচ হবে সিজারের মতোই। ধৈর্য্য রাখতে হবে বেশি। তবে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আপনি বেঁচে যাবেন অস্ত্রপাচারের হাত থেকে।
জটিলতা কি হতে পারে? অন্যান্য নরমাল ডেলিভারিতে যেসকল জটিলতা হতে পারে সেগুলো ছাড়া এনেসথেসিয়া দেয়ার জন্য যেটা হতে পারে তা হল, ডেলিভারিতে বিলম্ব। এটা মূলতঃ পুশিং ইফেক্ট কমে যাওয়ার কারণে। ওই একই কারণে ইনস্ট্রুমেন্টাল ডেলিভারি করতে হতে পারে। তবে সুবিধা হচ্ছে এজন্য আলাদা কোন অবশ করার ব্যবস্থা নিতে হবেনা। এমনকি কোন কারণে সিজার লাগলে ওই একই এনেসথেসিয়াকেই এপিডুরাল ক্যাথেটারের মাধ্যমে প্রলম্বিত করে অপারেশন শেষ করা সম্ভব। তবে হ্যাঁ, এনেসথেসিয়ার কারণে পরবর্তীতে মাথাব্যাথা বা কোমরে ব্যাথার মত জটিলতাও হতে পারে যা অনেকটা সিজার পরবর্তী জটিলতার মতোই।
শেষ দুটো কথা বলে ইতি টানি। প্রথমতঃ প্রথম থেকেই শারীরিক, মানসিক, আর্থিক সবদিক থেকে নিজেকে প্রস্তুত রাখুন ডেলিভারির জন্য। শুধু নরমাল ডেলিভারি বা শুধু সিজারের জন্য নয়। মনে রাখবেন, সিজারের জন্য প্রস্তুত মানুষেরও হুট করে নরমাল ডেলিভারি হয়ে যেতে পারে। আবার সব ঠিক থাকার পরেও অনেক সময় নরমাল ডেলিভারি প্রসেস থমকে যায়। শেষ মুহূর্তে সিজার করতে হয় বাচ্চা কিংবা মায়ের স্বার্থে। দ্বিতীয়তঃ একজন অবসট্রেটিসিয়ানের তত্ত্বাবধানে থাকুন শুরু থেকেই। বারবার ডাক্তার পাল্টানো মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। নিজের ডাক্তারের উপর আস্থা রাখুন। অবশ্যই তিনি আপনার জন্য সর্বোত্তম পন্থা অবলম্বন করবেন।
সুস্থ থাকুন মা, সুস্থ থাকুক আপনার সন্তান,সুস্থ থাকুক জাতি।
ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা
এমবিবিএস, এফসিপিএস (গাইনী এন্ড অবস)
ফিগো ফেলো (ইটালী)
গাইনী কনসালটেন্ট,
পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বগুড়া।