27/07/2026
সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মুখের ঘা এর প্রকোপ অনেক বেড়েছে। প্রতিদিনই সরকারি এবং বেসরকারি হসপিটালে মুখের ঘা এর কারণে বাচ্চা একেবারে খেতে পারছে না এরকম রোগীদের নিয়ে অভিভাবকরা ভিড় করছে। মেডিকেলের ভাষায় মুখের ঘা এর এখনকার প্রধান কারণ হচ্ছে হারপেটিক জিঞ্জিভোস্টোমাটাইটিস (Herpetic Gingivostomatitis)
শিশুদের মুখে ঘা ও মাড়ির সংক্রমণ সম্পর্কে সহজ ভাষায় বলতে গেলে -
হারপেটিক জিঞ্জিভোস্টোমাটাইটিস হলো মুখ ও মাড়ির একটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ। এটি সাধারণত হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস টাইপ-১ (HSV-1) দ্বারা হয়। ছোট শিশুদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সে।
কীভাবে ছড়ায়?
-আক্রান্ত ব্যক্তির লালা (থুতু) থেকে
-একই গ্লাস, চামচ বা খেলনা ব্যবহার করলে
-মুখে বা ঠোঁটে থাকা হারপিসের ঘার সংস্পর্শে এলে
-চুম্বনের মাধ্যমে
লক্ষণ কী কী?
রোগের শুরুতে সাধারণত—
-হঠাৎ জ্বর (অনেক সময় ১০২–১০৪°F পর্যন্ত)
-শিশুর খিটখিটে মেজাজ
-খেতে না চাওয়া
-দুর্বলতা
এরপর মুখে দেখা যায়—
-মাড়ি লাল ও ফুলে যাওয়া
-মাড়ি থেকে রক্ত পড়তে পারে
-মুখ, জিহ্বা, ঠোঁট ও গালের ভেতরে ছোট ছোট ফোসকা, পরে সেগুলো ঘায়ে পরিণত হয়
-মুখে প্রচণ্ড ব্যথা
-লালা বেশি পড়া
-মুখে দুর্গন্ধ
-গলার লসিকা গ্রন্থি (গ্ল্যান্ড) ফুলে যাওয়া
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
মুখে ব্যথার কারণে অনেক শিশু খাওয়া ও পানি পান বন্ধ করে দেয়। ফলে শরীরে পানিশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন) হতে পারে, যা কখনও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কারণ হয়।
কী করবেন?
-শিশুকে বারবার অল্প অল্প করে পানি, ওরস্যালাইন বা তরল খাবার দিন।
-ঠান্ডা, নরম খাবার যেমন দই, ঠান্ডা দুধ, আইসক্রিম (পরিমিত), নরম ভাত বা স্যুপ খেতে দিতে পারেন।
-ঝাল, টক ও শক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।
-জ্বর ও ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল দিন।
-শিশুকে বিশ্রামে রাখুন।
অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের প্রয়োজন হয়?
হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে Acyclovir নামের অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ দেওয়া যায়। এটি রোগ শুরুর প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যে শুরু করলে সবচেয়ে ভালো কাজ করে। তবে নিজে থেকে এই ওষুধ শুরু করবেন না।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
-শিশু কিছুই খেতে বা পান করতে পারছে না
-প্রস্রাব কম হয়ে যাচ্ছে
-খুব বেশি ঝিমিয়ে পড়ছে
-জ্বর ৩–৫ দিনের বেশি থাকে
-চোখ লাল হয়ে যায় বা চোখে ব্যথা হয়
-শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম (যেমন ক্যান্সারের চিকিৎসা চলছে)
এটি কি বারবার হতে পারে?
হ্যাঁ। একবার সংক্রমণ হওয়ার পর ভাইরাস শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকে। পরে জ্বর, অতিরিক্ত রোদ বা মানসিক চাপের সময় অনেকের ঠোঁটে কোল্ড সোর (Cold sore) হিসেবে আবার দেখা দিতে পারে।
এটি কি বিপজ্জনক?
বেশিরভাগ শিশু ৭–১৪ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়। তবে পানিশূন্যতা বা চোখে সংক্রমণ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
প্রতিরোধের উপায়
-হাত ভালোভাবে ধোয়ার অভ্যাস করুন।
-আক্রান্ত ব্যক্তির গ্লাস, চামচ বা তোয়ালে ব্যবহার করবেন না।
-মুখে হারপিসের ঘা থাকলে শিশুদের চুমু দেওয়া এড়িয়ে চলুন।
-শিশুর ব্যবহৃত খেলনা ও জিনিসপত্র পরিষ্কার রাখুন।
মনে রাখবেন: মুখে ঘা মানেই অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না। হারপেটিক জিঞ্জিভোস্টোমাটাইটিস একটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো উচিত নয়।