06/05/2026
হাম (Measles) একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শ্বাসতন্ত্রকে আক্রমণ করে। এটি ছোট শিশুদের জন্য বিশেষভাবে বিপজ্জনক হতে পারে, তবে সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিলে এটি প্রতিরোধ এবং ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব।
নিচে হামের প্রধান লক্ষণ এবং এর চিকিৎসার ঘরোয়া ও সাধারণ নিয়মাবলী বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
হামের লক্ষণ (Symptoms of Measles):
হামের লক্ষণগুলো সাধারণত ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৮ থেকে ১২ দিন পর দেখা দিতে শুরু করে। লক্ষণগুলো কয়েকটি ধাপে প্রকাশ পায়:
১. প্রাথমিক পর্যায় (সর্দি-কাশির মতো লক্ষণ):
প্রথম ৩-৫ দিন রোগী সাধারণ ঠান্ডা বা ফ্লুর মতো অনুভব করে।
উচ্চ জ্বর: জ্বর দ্রুত ১০৪° ফারেনহাইট (৪০° সেলসিয়াস) বা তার উপরে উঠে যেতে পারে।
কাশি: অনবরত শুষ্ক কাশি।
সর্দি: নাক দিয়ে পানি পড়া।
চোখ লাল হওয়া: চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং চোখ দিয়ে পানি পড়া (Conjunctivitis)।
কপলিক স্পট (Koplik's Spots): জ্বর শুরু হওয়ার ২-৩ দিন পর মুখের ভেতরের দিকে (গালের ভেতরের অংশে) ছোট ছোট সাদাটে দাগ দেখা দেয়, যার চারপাশে লালচে ভাব থাকে। এটি হামের একটি বিশেষ লক্ষণ।
ক্লান্তি ও গায়ে ব্যথা: শরীর অত্যন্ত দুর্বল লাগে এবং পেশিতে ব্যথা হতে পারে।
২. ফুসকুড়ি বা দানা ওঠার পর্যায় (Rash Stage):
প্রাথমিক লক্ষণগুলো দেখা দেওয়ার ৩-৫ দিন পর শরীরে লালচে দানা বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়।
শুরু: ফুসকুড়ি সাধারণত মুখমণ্ডল (কানের পেছনে এবং চুলের রেখা) থেকে শুরু হয়।
ছড়িয়ে পড়া: এরপর এটি ধীরে ধীরে ঘাড়, বুক, পিঠ, হাত এবং অবশেষে পায়ে ছড়িয়ে পড়ে।
ধরণ: এই দানাগুলো প্রথমে ছোট লাল দাগ হিসেবে থাকে, পরে বড় হয়ে একে অপরের সাথে মিশে যেতে পারে।
জ্বর বৃদ্ধি: ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার সময় জ্বর আরও বেড়ে যেতে পারে।
৩. সেরে ওঠার পর্যায়:
কয়েক দিন পর ফুসকুড়িগুলো ধীরে ধীরে কালচে হয়ে যায় এবং চামড়া ওঠে (খুসকির মতো) ঝরে যেতে শুরু করে। জ্বরও কমে আসে।
হামের চিকিৎসা (Treatment of Measles)
হামের জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ঔষধ নেই। চিকিৎসা মূলত লক্ষণগুলো উপশম করা এবং জটিলতা প্রতিরোধ করার ওপর নির্ভর করে।
১. ঘরোয়া এবং সহায়ক চিকিৎসা:
বিশ্রাম: রোগীকে পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে যাতে শরীর ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে পারে।
তরল খাবার: প্রচুর পরিমাণে পানি, ফলের রস, স্যুপ এবং ডাবের পানি খাওয়াতে হবে যাতে শরীর পানিশূন্য (Dehydration) না হয়ে পড়ে।
জ্বর নিয়ন্ত্রণ: জ্বর এবং শরীর ব্যথা কমানোর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল (Paracetamol) জাতীয় ঔষধ খাওয়ানো যেতে পারে। মনে রাখবেন: শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন (Aspirin) জাতীয় ঔষধ দেওয়া উচিত নয়, কারণ এটি রেই সিনড্রোম (Reye's syndrome) নামক বিরল কিন্তু গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
চোখের যত্ন: চোখ পরিষ্কার ও ভেজা রাখার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে আই ড্রপ ব্যবহার করা যেতে পারে এবং উজ্জ্বল আলো থেকে চোখকে দূরে রাখা ভালো।
কফ ও কাশির উপশম: কাশির জন্য হালকা গরম পানি বা চিকিৎসকের পরামর্শে কাশির সিরাপ ব্যবহার করা যেতে পারে।
ভিটামিন-এ (Vitamin A): হামে আক্রান্ত শিশুদের জটিলতা কমানোর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরপর দুই দিন নির্দিষ্ট মাত্রায় ভিটামিন-এ খাওয়ানোর পরামর্শ দেয়। এটি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দিতে হবে।
২. চিকিৎসকের পরামর্শ কখন নেবেন:
যদিও হাম সাধারণত নিজে থেকেই সেরে যায়, তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর জটিলতা (যেমন- নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, মস্তিষ্কের প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস) তৈরি করতে পারে। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে:
যদি শ্বাস নিতে কষ্ট হয় বা দ্রুত শ্বাস পড়ে।
🛑 যদি জ্বর অনেক বেশি হয় এবং না কমে।
🛑 যদি প্রচণ্ড মাথাব্যথা বা ঘাড় শক্ত হয়ে যায়।
🛑 যদি রোগী বিভ্রান্ত বা অচেতন হয়ে পড়ে।
🛑 যদি কানে প্রচণ্ড ব্যথা হয়।
প্রতিরোধ (Prevention)
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা দেওয়া।
বাংলাদেশে শিশুদের ইপিআই (EPI) কর্মসূচির আওতায় ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ হাম-রুবেলা (MR) টিকা দেওয়া হয়।
এই দুই ডোজ টিকা প্রায় ৯৭% ক্ষেত্রে হাম প্রতিরোধ করতে সক্ষম।
হামের লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে অন্য সুস্থ ব্যক্তি এবং বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের থেকে আলাদা রাখা অত্যন্ত জরুরি।