�…রক্তদান সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য…�
√ রক্তের প্রয়োজন যাদেরঃ-
১] দূঘর্টনাজনিত রক্তক্ষরণ - দূঘর্টনায় আহত রোগীর জন্য দূঘর্টনার ধরণ অনুযায়ী রক্তের প্রয়োজন হয়।
২] দগ্ধতা - আগুন পুড়া বা এসিডে ঝলসানো রোগীর জন্য পাজমা/রক্তরস প্রয়োজন। এজন্য ৩-৪ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন।
৩] অ্যানিমিয়া - রক্তে R.B.C. এর পরিমাণ কমে গেলে রক্তে পযার্প্ত পরিমাণ হিমোগোবিনের অভাবে অ্যানিমিয়া রোগ হয়। হিম
োলাইটিক অ্যানিমিয়াতে R.B.C. এর ভাঙ্গন ঘটে ফলে
৪] থ্যালাসেমিয়া - এক ধরনের হিমোগোবিনের অভাবজনিত বংশগত রোগ। রোগীকে প্রতিমাসে ১-২ ব্যাগ রক্ত দিতে হয়।
৫] হৃদরোগ - ভয়াবহ Heart Surgery এবং Bypass Surgery এর জন্য ৬-১০ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন।
৬] হিমোফিলিয়া - এক ধরনের বংশগত রোগ। রক্তক্ষরণ হয় যা সহজে বন্ধ হয় না, তাই রোগীকে রক্ত জমাট বাধার উপাদান সমৃদ্ধ Platelete দেয়া হয়।
৭] প্রসবকালীন রক্তক্ষরণ - সাধারণত প্রয়োজন হয় না তবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে ১-২ বা ততোধিক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়।
৮] ব্লাড ক্যান্সার- রক্তের উপাদানসূমহের অভাবে ক্যান্সার হয়। প্রয়োজন অনুসারে রক্ত দেয়া হয়।
৯] কিডনী ডায়ালাইসিস - ডায়ালাইসিস-এর সময় মাঝে মাঝে রক্তের প্রয়োজন হয়।
১০] রক্ত বমি - এ রোগে ১-২ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়।
১১] ডেঙ্গু জ্বর - এ রোগে ৪ ব্যাগ রক্ত হতে ১ ব্যাগ Platelete পৃথক করে রোগীর শরীরে দেয়া হয়।
১২] অস্ত্রপচার - অস্ত্রপচারের ধরণ বুঝে রক্তের চাহিদা বিভিন্ন।
√ রক্তদানের যোগ্যতাঃ-
সাধারনত একজন সুস্থ ব্যাক্তি চার মাস অন্তর অন্তর রক্তদান করতে পারেন। এবার দেখে নেয়া যাক রক্তদানের যোগ্যতাসমূহ-
১] বয়স – ১৮-৫৭ বছর।
২] ওজন - ১০০ পাউন্ড বা ৪৭ কেজির উর্ধ্বে।
৩] তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ( অনুচক্রিকা , রক্তরস ) ওজন ৫৫ কেজি বা তার উর্ধ্বে। রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকলে।
৪] রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ৭৫% বা তার উর্ধ্বে থাকলে। সম্প্রতি ( ৬-মাস ) কোন দূঘর্টনা বা বড় ধরনের অপারেশন না হলে।
৫] রক্তবাহিত জটিল রোগ যেমন-ম্যালেরিয়া, সিফিলিস , গনোরিয়া, হেপাটাইটিস , এইডস, চর্মরোগ , হৃদরোগ , ডায়াবেটিস , টাইফয়েড এবং বাতজ্বর না থাকলে।
৬] কোন বিশেষ ধরনের ঔষধ ব্যবহার না করলে।
৭] চার মাসের মধ্যে যিনি কোথাও রক্ত দেননি।
৮] মহিলাদের মধ্যে যারা গর্ভবতী নন এবং যাদের মাসিক চলছে না।
৯] তাকে পরিপূর্ণ সুস্থ হতে হবে। জন্ডিস, ম্যালেরিয়া জাতীয় কোনো অসুখ না হয় এবং তিনি যদি রক্ত সংক্রান্ত কোনো অসুখে না ভোগেন তাহলেই রক্তদান করতে পারবেন।
১০] রক্তদাতার রক্তদানের সময় রক্তচাপ অবশ্যই স্বাভাবিক থাকতে হবে। এসব ঠিক থাকলেই কেবল একজন ব্যক্তি রক্তদান করতে পারে।
√ রক্তদান ও রক্ত দানের পরঃ-
রক্তদানের আগে প্রতিটি রক্তদাতাকে তার স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কিছু ব্যক্তিগত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জিজ্ঞাসা করা হয়। সেগুলোর সঠিক উত্তর দিতে হবে। রক্তদাতার শারীরিক তাপমাত্রা, রক্তচাপ, নাড়ীর গতি পরীক্ষা করা হয় এবং রক্তদাতার রক্ত জীবানুমুক্ত কি না তা জানার জন্য সামান্য রক্ত নেয়া হয়। এছাড়া এই রক্তের মাধ্যমে রোগী রক্তদাতার রক্তের মধ্যে কোন জমাটবদ্ধতা সুষ্টি হয় কি না তাও পরীক্ষা করা হয় (ক্রসম্যাচিং)। রক্ত পরীক্ষার পর কারও রক্তে এইডস, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস -সি, সিফিলিস বা অন্য কোন জীবানুর উপস্থিতি ধরা পরলে তাকে (রক্তদাতা) প্রয়োজেনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের পরামর্শ দেয়া হয়।সূঁচের অনুভূতি পাওয়ার মাধ্যমে রক্তদান প্রক্রিয়া শুরু হয়। এতে সময় লাগে সবোর্চ্চ ১০ মিনিট। রক্তদানের পূর্বে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে- যথেষ্ট বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা।রক্তদাতা প্রয়োজন মনে করলে বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারে।রক্তদানের সময় মাথা- শরীর সমান্তরাল থাকতে হবে। দূর হতে রক্ত দিতে এলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে হবে। রক্ত দান করার পরে অবশ্যই নুন্যতম ৫ মিনিট শুয়ে থাকতে হবে। [রক্তের প্রবাহ সমগ্র শরীরে স্বাভাবিক হবার জন্য এটা অতীব জরুরী]। সাধারণত রক্তদান করার পর অতিরিক্ত দামী খাবার গ্রহনের প্রয়োজন নেই। তবে রক্তদানের পর সপ্তাহ খানেক স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি অন্যান্য সময়ের দ্বি-গুণ পানি পান করতে হবে। কেননা একজন রক্তদাতা যেটুকু রক্ত দান করেন [সাধারণত ১ পাউন্ড] তার প্রায় ৬০ ভাগ ঐ সময়ের মধ্যে পূরণ হয়। শুধু লোহিত রক্ত কণিকা পূরণ হতে ১২০ দিন বা ৪ মাস সময় নেয়। রক্তদানের পর অবশ্যই তারিখ মনে রাখতে হবে।
বেশিরভাগ রক্ত দাতাই রক্তদানের পর কোন সমস্যা অনুভব করেন না। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে রক্তদাতা তলপেটে ব্যাথা, দূবর্লতা, মাথা ঘোরা, সূঁচ প্রবেশের স্থানে ক্ষত লালচে দাগ এবং ব্যাথা অনুভব করতে পারেন। সামান্য কিছু ক্ষেত্রে রক্তদাতা জ্ঞান হারাতে পারে বা মাংসপেশীতে খিচুনি ধরতে পারে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব সমস্যা ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ঠিক হয়ে যায়, কোন ঔষধের প্রয়োজন হয়না।
√ রক্তদানের সুবিধাঃ-
১] প্রতি ৪ মাস অন্তর রক্ত দিলে দেহে নতুন BLOOD CELL সৃষ্টির প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
২] দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকগুন বেড়ে যায়।
৩] নিয়মিত রক্তদানে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে বলে হৃদপিন্ড বিশেজ্ঞরা মনে করেন।
৪] স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে আপনি জানতে পারেন আপনার শরীর রক্তবাহিত মারাত্মক রোগ যেমন-হেপাটাইটিস-বি, এইডস, সিফিলিস ইত্যাদির জীবাণু বহন করছে কিনা।
৫] স্বেচ্ছায় রক্তদানে মানসিক প্রশান্তি আসে।
৬] রক্তদানের মাধ্যমে একটি জীবন বাঁচানো পৃথিবীর সবোর্চ্চ সেবার অর্ন্তভুক্ত।
৭] একজন ব্যক্তি রক্ত দান করলে একজন মানুষের জীবন বাঁচে। তাছাড়া রক্তদাতারও অনেক উপকার হয়।
√ ধর্মে রক্তদানে কোনো বাধা নেইঃ-
রক্তদানের ব্যাপারে ইসলামে কোনো ধরনের বিধি-নিষেধ নেই। তবে রক্ত বিক্রি বৈধ না হলেও বিনামূল্যে রক্ত না পেলে রোগীর জন্য রক্ত কেনা বৈধ। এক্ষেত্রে রক্ত বিক্রেতা গোনাহগার হবেন। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের কেউ তার আপন ভাইয়ের উপকার করতে সক্ষম হলে সে যেন তা করে’ (মুসলিম)। ‘একজন মানুষের জীবন রক্ষা করা সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করার মতো মহান কাজ’। (সূরা মায়েদা : ৩২)।