19/08/2026
গ্রাম্য একটি ভুল সংস্কৃতি যা আজও বাবা-মা দের মধ্যে বিদ্যমান, শিশু যত মোটা নাদুশ নুদুশ গলু-মুলু ততই নাকি বাচ্চা "হেলদি"। "মোটা" এবং "স্থুলতা" এই দুইটি শব্দের সাথে "হেলদি" বা "সুস্থতার" কোনই সম্পর্ক নেই। দাদা-দাদি বা নানা-নানির যুগ বা তারও আগে থেকে এই প্রচলন চলে আসছে যে, যার শরীর যত ফোলা বা মোটা, যার "খান্দানি ভূরি আছে সে নাকি তত স্বাস্থ্যবান! রাজা- জমিদারী আমলে আমাদের পূর্ব পুরুষরা দেখেছেন ধনী বেক্তিরা সাধারণ মানুষের তুলনায় মোটা, মানে এটি সম্পদ শালি হবার একটি বাহ্যিক পরিচয় হিসেবে ধরে নেয়া হইত। এছাড়াও তাঁদের সময়ে মহামারী এবং দুর্ভিক্ষ এই দুইটি কমন বিষয় ছিল। তাই দেখা যেত ধনী বেক্তি ছাড়া সবাই দেখতে "রোগা" বা হাল্কা পাতলা গড়নের। এই "রোগা" থেকেই ধারনা চলে আসছে যে হাল্কা পাতলা মানে অসুস্থ আর মোটা ফোলা শরীর মানে হেলদি এবং সুস্থ! বাঙ্গালী সমাজের সব বিষয়ই যে উল্টো, বা এক ধাপ বেশি বুঝে, এটি তার সুন্দর একটি উদাহরণ। এই বিষয় গুলো যেমন একটি ইতিহাস এর অংশ, ঠিক তেমনি এই বিজ্ঞান প্রজুগতির যুগে হাজার লক্ষ বার প্রমানিত হয়েছে যে "মোটা" বা "স্থুলতা" এই দুটি শব্দ "হেলদি" বা "সুস্থতার" সমার্থক নয়, বরং "অপুষ্টি" এবং "রোগ" এর সমার্থক। কিভাবে? ধরুন, আপনি এক বালতি পানি মেশানো পাতলা দুধ খেলেন। এতে পেট ভরে যাবে ঠিকই, কিন্তু শরীরে কোনো শক্তি তথা পুষ্টি পাবেন না। অন্যদিকে, মাত্র এক গ্লাস খাঁটি ঘন দুধ খেলে তা শরীরে আসল পুষ্টি ও শক্তি দেবে। কেউ যদি এক গামলা সাদা ভাত আর সামান্য আলুভর্তা খায়, তবে তার পেট অনেক বেশি ভরবে, সে দিন দিন মোটা হবে ঠিকই, কিন্তু তার হাড় ও পেশি দুর্বল থেকে যাবে। আপনার চামড়ার নীচে আছে হাড়, মাংস এবং চর্বি। আপনার খাবার পুষ্টি গুণ সম্পন্ন না হইলে আপনার ভূরি বা চর্বিই শুধু বাড়বে, কিন্তু মাংস আর হাড় সময়ের সাথে পুষ্টির অভাবে ক্ষয় হইতে থাকবে। কারন এই ভাত বা আলু ভরতার মধ্যে ডিম, মাছ বা মাংস বা শাকসবজির মতো সব ধরনের ভিটামিন, প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামের উপস্থিতি নেই। আপনি যদি ভাত আলু বাদ দিয়েও, খাবারের পরিমাণ কম হলেও নিয়মিত ডিম, মাছ বা মাংস বা শাকসবজির মতো খাবার খান, তারপরওঁ আপনার শরীরের সমস্থ পুষ্টি পূরণ হয়ে যাবে। শরীর সব ধরনের ভিটামিন, প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম পাবে। হাড় শক্ত এওং মজবুত হবে, মাংস পেশি সুঠাম হবে। সুতরাং খান্দানি ভূরি আসলে অসুস্থতা বা পুষ্টির অভাবের লক্ষণ, যা আপনাকে ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্ত চাপ, ফ্যাটি লিভার, কিডনি সমস্যা, ক্যান্সার ইত্যাদি উপহার দিবে।
শিশু প্রসঙ্গে আসি, শিশুর স্বাস্থ্য কেমন হবে তা পুরোটাই বাবা মার গাইডেন্স এর উপর নির্ভরশিল। বিশেষ করে শিশু যখন মায়ের দুধ পান করে, তখন মায়ের দুধ যদি পুষ্টি গুণ সম্পন্ন না হয়, তাহলেই শিশুটি হবে মোটা নাদুশ নুদুশ গলু-মুলু ! মোটা নাদুশ নুদুশ বলতে সুনতে ভালও লাগলেও, আসলে বিজ্ঞান বলেন, ডাক্তার বলেন, পুষ্টিবিদ বলেন সবার চোখেই "বড় একটি সমস্যা" বা অসুস্থতার লক্ষণ। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর মা যদি শুধু ভাত আলুর উপর নির্ভরশীল হন, জাঙ্ক ফুড/ফাস্ট ফুড বেশি খান, যেমন ধরুন চিপস, পেকেট জুস, কেক, বিস্কুট, মুরি, চানাচুর, শামুছা, সিঙ্গারা, পুরী, পরোটা, কাবাব, আইসক্রিম বা কোমল পানীয় ইত্যাদি, তবে বুকের দুধের গুণমান কমে যায় এবং শিশুর স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। শিশু হয়ত দেখতে বিশাল দেহি মনে হবে, কিন্তু বিষয়টা হবে, শূনও কলশী বাজে বেশির মতো ব্যাপার। উচ্চমাত্রার চিনি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও লবণ থাকা খাবারের কারনে, মায়ের শরীরে প্রদাহ ও বিপাকীয় সমস্যা তৈরি করবে। এই উপাদানগুলো বুকের দুধে প্রতিফলিত হয় বা মিশে যায়, ফলে শিশুর শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি ও অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট জমে। গবেষণায় দেখা গেছে, মায়ের অতিরিক্ত আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড (UPF) খাওয়া শিশুর মাইক্রোবায়োম পরিবর্তন করে, যা স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। মা যদি শুধু ডাল-ভাত বা অপুষ্টিকর খাবার খায়, তবে তার বুকের দুধে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এবং প্রয়োজনীয় ফ্যাট বা চর্বি কম থাকবে। বাচ্চা পেট ভরে শুধু পানিযুক্ত পাতলা দুধই খাবে, কিন্তু শরীর গঠনের আসল উপাদানগুলো পাবে না। বুকের দুধের প্রথম অংশ সাধারণত একটু পাতলা ও পানিযুক্ত হয় (তৃষ্ণা মেটানোর জন্য), আর শেষের দিকের দুধে আসল পুষ্টি ও ফ্যাট থাকে। বাচ্চা যদি প্রতিবার অল্প একটু টেনে ছেড়ে দেয় বা মায়ের দুধের কোয়ালিটি ভালো না হয়, তবে বারবার খাওয়ানোর পরও বাচ্চার সঠিক পুষ্টি হবে না। একটা বেলুনে বেশি বাতাস বা পানি ঢোকালে সেটা দেখতে অনেক বড় ও মোটা লাগে, কিন্তু সামান্য আঘাতেই ফেটে যায়। একইভাবে, অতিরিক্ত মোটা বা চর্বিযুক্ত বাচ্চা দেখতে সুন্দর লাগলেও ভেতর থেকে তারা অত্যন্ত দুর্বল হতে পারে। এটি বড় হয়ে ডায়াবেটিস, থাইরয়েড এবং ফ্যাটি লিভারের মতো মারাত্মক রোগ ডেকে আনে। একজন ১-২ বছরের শিশুরও ডায়াবেটিস ধরা পরতে পারে।
বাচ্চার পেট ভরানো আর বাচ্চার শরীর গঠন করা এক জিনিস নয়। মায়ের সুষম খাবার খাওয়া এবং বাচ্চার সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করাই আসল কাজ, তাকে জোর করে মোটা বানানো নয়।বাচ্চার ভেতরের শক্তি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই আসল স্বাস্থ্য, শরীরের চর্বি বা অতিরিক্ত ওজন নয়। মোটা নাদুশ নুদুশ গলু-মুলু শিশু নড়াচড়া কম করে, দ্রুত হাঁপিয়ে ওঠে, অলস বসে থাকে। ভারী শরীরের কারণে বসতে, হামাগুড়ি দিতে বা দাঁড়াতে দেরি হয়। ঘন ঘন ঠাণ্ডা-কাশি বা পেটের সমস্যায় ভুগতে পারে। কথা দেরীতে শিখবে, হাড় এবং পেশী হবে দুর্বল। এই জন্য অনেকে পেরাসিটামল বা অ্যান্টিবায়টিক এর উপর নির্ভরশীল হয়ে পরেন। কিন্তু পেরাসিটামল বা অ্যান্টিবায়টিক দীর্ঘ মেয়াদে শিশুর শরীর আরও নষ্ট করে দিবে, পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে আরও বড় রোগের আবির্ভাব ঘটাবে।
Md. Elhamur Rahman
(FM-CNS, FM-CPT, FM-COPT)
Internationally Certified Nutrition Specialist (USA)
Certified Holistic Health & Wellness Coach (USA)
Certified Diet & Nutrition Coach (USA)
Diploma in Sports Nutrition (USA)
Internationally Certified Personal Fitness Trainer (USA)
Diploma in Advanced Fitness (USA)