19/03/2026
PLID তে ফিজিওথেরাপি নিলে ব্যথা কমে, কিন্তু ডিস্ক থেকে বের হয়ে যাওয়া জেলি কিভাবে ভিতরে যায়?
কিছুদিন আগে এক সার্জন আমার সিনিয়র কলিগ একজন অর্থোপেডিক সার্জনকে জিজ্ঞেস করেছে, স্যার, এইসব ম্যানুয়েল থেরাপি দিয়ে ব্যথা না হয় কমে, ডিস্ক কিভাবে জায়গায় যায়? এগুলি বিশ্বাস হয়? স্যার উত্তর দিলেন, ওরা বায়োমেকানিক্স বেসিস করে কাজ করে। আবার আমার এক ফলোয়ার ইলেক্ট্রো-ড্রাই নিডেলিং এর একটা ভিডিওর নিচে কমেন্ট করেছেন, এটা করে ডিস্ক ভেতরে যায়?
PLID তে ফিজিও রা ডিস্ক ভেতরে নিতে পারেন কিনা সেটা বুঝতে হলে আমাদের মেরুদন্ডের যেকোন একটা লেভেলকে উদাহারণ দিয়ে ডিস্ক প্রোলাপ্সটা বুঝতে হবে। সবচেয়ে কমন হলো, ট্রাই জয়েন্ট মডেল।
২০০৯ সালে কোরিয়ান বিজ্ঞানী ইয়ং-সু-চই তার একটা রিভিউতে বলেন, আমাদের ডিস্ক তিনটা জয়েন্টের সমন্বয়ে থাকে, একটা হলো দুইটা হাড় বা ভার্টিব্রার মাঝের জয়েন্ট, যার মাঝে ডিস্ক অবস্থান করে, আরেকটা হলো ডিস্ক এর উপরের ও নিচের স্তর (এন্ড প্লেট) এর সাথে উপরের ও নিচের ভার্টিব্রার জয়েন্ট (ডিসকো-ভার্টিব্রার জয়েন্ট) এবং ডিস্কের পেছনে ফ্যাসেট জয়েন্ট (সাইনোভিয়াল জয়েন্ট) যার নিচের ফুটো দিয়ে নার্ভ বের হয়ে পায়ের দিকে যায়। চই (Choi) PLID বা কোমর ব্যথার জন্য বিশ্বের শীর্ষ তিন বিজ্ঞানীদের একজন, প্রায় সব বড় বড় জার্নালে তার প্রকাশনা রয়েছে।
এবার আসি সুস্থ্য ডিস্ক কিভাবে কাজ করে, খাবার খায়, জায়গামত থাকে। ডিস্কের ভেতরের ৭০% জেলি (নিউক্লিয়াস পালপোসাস) হলো প্রোটিওগ্লাইকেন ও পানি, টাইপ ২ কোলাজেন ও ইলাস্টিনের সমন্বয়ে গঠিত তরল যা প্রেসার রেজিসট্যান্ট মানে উপর দিক থেকে তাকে যত প্রেসার দেন সে কুং ফু ফুটবলের গোলকিপারের মত হজম করে নেয়, কিন্তু গোল হতে দেয়না, মানে প্রেসার যাতে হাড়ে বা ফুটো দিয়ে যাওয়া নার্ভে লাগতে দেয় না। এখানে এগ্রিকেন নামক প্রোটিওগ্লাইকেনের ভূলিকায় জেলিটা অনেকটা 'কাইনেটিক সেন্ড' (বাচ্চাদের খেলার জন্য আটার মত কাদা যা কোথাও সেটে যায়না) এর মত আচরণ করে।
আবার এনুলাস ফাইব্রোসাস হলো টেনশন রেজিসট্যান্ট মানে সে টাইপ-১ কোলাজেন দিয়ে তৈরি যে ডিস্কের জেলি প্রেসার এবজর্ভ করতে গিয়ে এদিকে ওদিকে এয়ামিবার মত বা জোকের মত বা টার্মিনেটর মুভির ভিলেনের মত একটু আধটু যাওয়ার চেস্টা করলেও সে লিক হতে দেয় না বা জেলিকে বের হতে দেয়না।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এত কঠিন একটা জিনিস, খাবার পায় কোত্থেকে? ঐ যে থ্রি জয়েন্ট কমপ্লেক্স বললাম, ডিস্কো-ভার্টিব্রাল জয়েন্ট এ ভার্ট্রিব্রার হায়ালিন কার্টিলেজ আর এন্ড প্লেট এর এখানে রক্তনালী সাপ্লাই থাকে। সেখান থেকে ব্যাপন পদ্মতিতে রক্তনালী থেকে অক্সিজেন ও গ্লুকোজ এন্ড প্লেট হয়ে ডিস্কে পৌছায়। আর ডিস্কের বায়োলজিক্যাল মেটাবোলিজম চলে সাইটোকাইন, এনজাইম আর গ্রোথ ফ্যাক্টর এর আদান-প্রদানের মাধ্যমে।
নরমাল মুভমেন্ট বা লাফালাফি বা সামনে ঝুকলে ডিস্কের কোন ক্ষতি হয়না বা প্রোলাপ্স হয়না কারন ডিস্কের turgor of the nucleus pulposus নামক ক্ষমতা থাকে, এর ফলে খুব সুক্ষ্ম একটা ম্যাকানিজম হয় যাতে স্পাইনের তিনটা জয়েন্টের সমন্বয়ে মোশন সেগমেন্ট আর ডিস্কের টার্গর প্রোপার্টিজ সমন্বিতভাবে কাজ করে।
ডিস্ক প্রোলাপ্স বা PLID হটাৎ করে হয়না, মানে এমন না যে ঝুকলাম বা ভারী কিছু নিলাম, আর ঠাস করে ডিস্কের জেলি বের হয়ে গেলো। আমরা যখন সামনে ঝুকি তখন ঐ মোশান সেগমেন্টের ভর সামনের দিকে যায়, ফ্যাসেট উন্মুক্ত হয় ও নার্ভের রাস্তায় ফাকা বেশি হয় কিন্তু ডিস্কের ভেতরে এ জেলির স্থিতিস্থাপকতা আর টার্গর প্রোপার্টিজ প্রাসার নিয়ে নেয় ও কোন সমস্যা হয় না।
সমস্যা হয়, কখন? ওয়েল, এটা খুব নীরবে হয়, আপনি টের পান বা অনেক সময় পান না।
(১) শুরুতে ডিস্কের নিউট্রিশান (গ্লুকোজ), অক্সিজেন কমে, কখনো মুভমেন্ট কম করার ফলে মেটাবোলিজম কমে যার ফলে গ্রোথ ফ্যাক্টর সহ সকল মেটাবোলিক ফ্যাক্টর কমে।
(২) এনুলাস ফাইব্রোসাস এর বাইরের লেয়ার ক্ষয়ে যায়, ফলে কিছু ফাইবার ছিড়ে যায়, অনেকটা বাধ এর মত, একটা একটা নেয়ার ধংস হয়। তখন এর টেনশন এবজর্ব করার ক্ষমতা নস্ট হয়।
(৩) এনুলাস ফাইব্রোসাস এর টেনজাইল স্ট্রেংথ কমে গেলে নিউক্লিয়াস পালপোসাস এর প্রোসার এবজর্ব করার ফোর্সের জন্য ডিস্ক বালজ হয় ও পেছনে ডুরাল স্লিভে বা নার্ভে চাপ দিতে পারে না ও পারে। এরপর একসময় এনুলার ফিসার (বাইরের লেয়ার ফুটো) হয়ে যায় ও জেলি বের হয়ে প্রোট্রুশন হয় এবং যথারীতি নার্ভে চাপ দেয়।
(৪) শরীর কিন্তু নিজেই এ ফুটো বা ধংস হওয়া ডিস্ক মেরামত করে। ডিস্কের কনড্রোসাইট matrix metalloproteinases (MMPs), a-disintegrin and metalloproteinase (ADAMS)5-7 এর প্রভাবে ছোট ছোট টুকরায় বিভক্ত হয়ে এনুলাস ফাইব্রোসাস এর ফুটা বন্ধ করে ও বাধ দেয়। এ বাধ দেয়ার পদ্ধতির কিছুটা শরীর বুড়া হয়ে গেলে ক্ষয় পুরনের প্রচেস্টার মত।
(৫) PLID ব্যথা হবার কারন দুইটা। প্রথম কারন প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন। এ যে ডিস্কে ইঞ্জুরি হলো এর জন্য প্রদাহ হয় ও কোমরে ব্যথা হয়। আর দ্বিতীয় কারন নার্ভ কমপ্রেশন, ডিস্ক এর জেলি বের হয়ে ফ্যাসেটের নিচ দিয়ে যাওয়া নার্ভে চাপ দেয়, ফলে অল্প চাপে ব্যথা, বেশি চাপে ঝিঝি, অবশ, আরো বেশি চাপে পায়ে দূর্বলতা চলে আসে। আর নার্ভের কাভারিং নস্ট হওয়া বা ইস্কেমিয়ার জন্য জ্বলাপোড়া করে।
ঔষধ ইনফ্লামেশন বা প্রদাহ কমায় আর সার্জারি করে ডিস্কের বাইরের লেয়ার টা বের করে নার্ভে ডিকমপ্রেশন করে। কিন্তু ডিস্কের অংশ কেটে ফেললে, ভার্টিব্রাল মোশন সেগমেন্ট এর নরমাল প্যাথোফিজিওলজি থাকে না, ডিস্কের মাঝে নারমাল হাইট বলে কিছু থাকেনা। এতদিন ডিস্ক ম্যাটেরিয়াল নার্ভে চাপ দিত আর এখন ডিস্ক স্পেস কমে ফ্যাসেটের ফুটো সরু হয়ে নার্ভ চিপা খায়, ফলে যাহা বায়ান্ন তাহাই তিপান্ন।
তাহলে ফিজিওথেরাপির এ ব্যায়াম করে, থেরাপি 'ডলে মলে!', 'ম্যাসাজ করে!' ডিস্ক কি পজিশনে যায়? ফিজিওথেরাপিস্টের কাজটা এনাটমিকাল, ফিজিওলজিকাল আর বায়োমেকানিক্স এর প্রিন্সিপালে চলে।
(১) আমরা শুরুতে প্রদাহ কমাই POLICE প্রিন্সিপালে। বরফ সেক, ম্যাকেঞ্জিতে সঠিক নার্ভ ডিকমপ্রেশন পজিশন, ঔষধ আর রেস্টের মাধ্যমে। আমরা শুরুতে চাই নার্ভে যা প্রেসার আছে আর না বাড়ুক। এর মধ্যে যদি নিউরোলজিকাল সিম্পটম থাকে তবে সে অনুযায়ী নিউরো-প্রোটেকটিভ এপ্রোচে ব্যবস্থা নিয়ে নার্ভকে ড্যামেজ হতে দেই না।
(২) দুই সপ্তাহেই প্রদাহ কমে যায়, আমরা তখন ধীরে ধীরে মাসলের এডাপটিভ চেঞ্জ এড্রেস করি- ট্রিগার্ড মাসলে ইসকেমিক কমপ্রেশান বা নিডল, স্পাজম বা ওভার কন্ট্রাকশন থাকা মাসলে স্ট্রেচিং, দূর্বল মাসলে এক্টিভেশান => মাসল সেটিং=> আইসোমেট্রিক => কনসেন্ট্রিক=> ইসেন্ট্রিক এক্সারসাইজ করি।
(৩) সরাসরি মোশান সেগমেন্টে চিকিৎসা করি মেইটল্যান্ড বা মুলিগান এপ্রোচে। উদ্দেশ্য ডিস্কের ডিকমপ্রেশন, নরমাল লাম্বো-পেলভিক রিদম আনা যাতে ডিস্ক আবার আগের মত খাবার পায় ও তার টেনজাইল ও প্রেসার এডাপ্টেশন ক্যাপাসিটি বাড়ে।
(৪) ধীরে ধীরে মুভমেন্ট পেসিং পদ্ধমতিতে আনি, যাতে রোগী ৬-১২ সপ্তাহের মধ্যে সামনে ঝুকা, পেছনে যাওয়া, হাটা, জার্নি, বসা সহ সকল কাজ করতে পারে। ডিস্ক স্ট্যাবল করতে আমরা কোর ও পেলভিক মাসলের শক্তি বাড়াই।
(৫) কিছু রোগীর ডিস্ক ডিকমপ্রেশনের পরো নার্ভে দীর্ঘমেয়াদে কমপ্রেশনের জন্য ইসকেমিয়া থাকে। তাদের জন্য নিউরোডায়নামিক্স ও নিউরো-মডুলেশন এপ্রোচে কাজ করি।
আমাদের মনে রাখতে হবে PLID তে ফিজিওথেরাপি শুধু ব্যথার চিকিৎসা করে না, ডিস্ক এর পরিপূর্ণ হিলিং ও ফাংশনালি স্ট্যাবল করি যাতে নরমালি ডিস্ক যে নিউট্রিশন পায়, বায়োমেকানিক্স ফলো করে তার সবটুকুই হয়।
আর যে জেলি বের হয়ে গেলো, সেটা কি ভেতরে যায়? নাহ, এটি চামড়া ফেটে বের হওয়া রক্তের মত বাইরে থাকে ও শরীরের রক্তনালী থেকে রক্তকনিকা মাইগ্রেট করে বের হয়ে এটাকে ফরেন বডি হিসেবে খেয়ে ফেলে। এ খাওয়ার প্রকৃয়া সাধারণত ৯ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত চলে। যদি এ বের হওয়া জেলি নার্ভে চাপ না দেয়, যদি পুনপৌনিক প্রদাহ না করে, এটি নিয়ে চিন্তা করে আর MRI দেখে হা-হুতাশ করে আর্তনাদ করার কিছু নেই। আপনি বিশ্বাস করেন আর না করেন, আপনি সুস্থ্য।
আমি গবেষণা দুইটি মূল পোস্টের কমেন্টে দিচ্ছি।