04/08/2026
একটা প্রশ্ন করি। যদি সত্যিই একটা মেশিনে শুয়ে থাকলেই হার্টের ব্লক খুলে যেত, তাহলে ক্যাথ ল্যাব বানাতে কোটি কোটি টাকা কেন খরচ করা হয়?
কেন মেডিকেল সাইন্সে এত বছর ধরে Cardiology কেন পড়ানো হয়?কেন একজন কার্ডিয়াক সার্জন বুক কেটে বাইপাস করেন, যেখানে "আরামে শুয়ে থাকা"ই যথেষ্ট?
উত্তরটা সহজ — কারণ ব্যাপারটা এত সহজ না। যে মেশিনটার কথা বলা হচ্ছে, সেটা আসলে কী?
এই ধরনের ডিভাইসকে বলে External Counterpulsation। পায়ে-উরুতে কাফ লাগিয়ে হার্টের ডায়াস্টোলের সময় বাতাস ভরা হয়, যাতে করোনারি পারফিউশন প্রেশার সাময়িক বাড়ে। বিদেশে এটা ব্যবহার হয় refractory angina-এর রোগীদের উপসর্গ কিছুটা কমাতে, তাও শুধু তখনই যখন Angioplasty বা Bypass করার মতো অবস্থা থাকে না।
এটা ব্লক "খুলে" দেয় না। এটা ব্লক "সারায়" না। এটা শুধু সাময়িক flow বাড়ায় যা উপসর্গ কমাতে সাহায্য করতে পারে, চিকিৎসার বিকল্প নয়। যে বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছে "শুয়ে শুয়ে ব্লক ছেড়ে যাবে", সেটা বিজ্ঞানকে বিকৃত করে বিক্রি করা।
তো এই দাবির পক্ষে কথা বলছেন কে? একজন লাইফস্টাইল/ফুড কনটেন্ট ক্রিয়েটর, যার কাজ রেস্টুরেন্ট রিভিউ আর রেসিপি নিয়ে। মেডিসিনের কোনো একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, রোগ নির্ণয়ের প্রশিক্ষণ নেই। অথচ তিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে একটা life-threatening কন্ডিশনের "সমাধান" বাতলে দিচ্ছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল অ্যাক্ট অনুযায়ী, রেজিস্টার্ড চিকিৎসক ছাড়া কারো চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়া বা চিকিৎসা পদ্ধতির সুপারিশ করাটাই আইনত অপরাধ। কিন্তু ভিউজ আর স্পন্সরশিপের সামনে এই আইন কাগজে-কলমেই থেকে যায়।
এবার বলি, দেরি করলে বা এসব ভুয়া পদ্ধতিতে সময় নষ্ট করলে শরীরের ভেতরে আসলে কী ঘটে?
হার্ট ব্লক মানে করোনারি আর্টারির ভেতর চর্বি জমে একটা প্লাক তৈরি হওয়া। শুরুতে এটা স্থির থাকে, পরিশ্রমে বুকে ব্যথা হয়, বিশ্রামে কমে যায় (স্টেবল এনজাইনা)। কিন্তু সঠিক চিকিৎসা না নিলে এই প্লাক যেকোনো সময় ফেটে যেতে পারে। তখন সেখানে রক্ত জমাট বেঁধে পুরো নালীটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। আর এটাই হার্ট অ্যাটাক।
রক্ত বন্ধ হওয়ার ২০-৪০ মিনিটের মধ্যেই হার্টের মাংসগুলো মরতে শুরু করে। যত দেরি, তত বেশি মাংস মারা যায়। মেডিসিনে এটাকে বলে "Time is Muscle"। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালে পৌঁছানোরও আগে হৃদপিণ্ডের রিদম এলোমেলো হয়ে (Ventricular Fibrillation) আকস্মিক কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়ে যায়। বেঁচে গেলেও হার্ট ফেইলিউর বা কার্ডিওজেনিক শকের মতো জটিলতা থেকে যেতে পারে সারাজীবনের জন্য।
সবচেয়ে বড় বিপদ, এই "শুয়ে শুয়ে চিকিৎসা" আসল ব্লকটা কখনোই সরায় না। রোগী মনে করেন সুস্থ হয়ে গেছেন, ওষুধ বন্ধ করে দেন, ফলোআপে যাবেন না। ভেতরে ভেতরে প্লাক নীরবে অপেক্ষা করে যেকোনো মুহূর্তে ফেটে পড়ার। আর রোগী থাকবেন সম্পূর্ণ অসতর্ক।
টাকার হিসেবটাও একবার মিলিয়ে দেখুন —
সরকারি হাসপাতালে (জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল) সরকারি ভর্তুকির কারণে বাইপাস সার্জারি করানো যায় মোটামুটি ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যে। বেসরকারি হাসপাতালে খরচ পড়ে ৪-৫ লাখ টাকা।
আর শোনা যাচ্ছে, শুধু পায়ে বাতাস দেওয়ার এই ভুয়া "চিকিৎসা"র ফি-ই নাকি আড়াই লাখ টাকারও বেশি। যেখানে ব্লক আসলে সরেই না। যে টাকায় সরকারি হাসপাতালে আসল বাইপাস করিয়ে একটা জীবন বাঁচানো যায়, সেই টাকা বা তার বেশি খরচ করে মানুষ কিনছেন শুধু একটা মিথ্যা স্বস্তি।
আমাদের দেশের মানুষ বিশ্বাস করে কনফিডেন্স দেখে, প্রমাণ দেখে না।। আর এটাই সবচেয়ে বড় সুযোগ নেয় এই প্রতারকরা। প্রতারণার এই যুগে আপনার, প্রিয়জনের জীবনের সিদ্ধান্ত একজন ফুড ব্লগারের ভিডিও দেখে না, একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শে নিন।
সবাই সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন।
~ collect