27/08/2026
চেম্বারে ঢোকার সময় মেয়েটার মুখ ওড়না দিয়ে ঢাকা ছিল। বসতেই যখন ওড়না সরালো, আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলাম। গাল দুটো জ্বলে লাল, কপালে চামড়া উঠে গেছে, আর নাকের পাশে ছোট ছোট ফোস্কার মতো দাগ।
"ম্যাডাম, তিনদিন ধরে এমন। প্রথমে একটু চুলকাচ্ছিল, এখন জ্বালাপোড়া করে, রাতে ঘুমাতে পারি না।"
জিজ্ঞেস করলাম, "নতুন কিছু ব্যবহার করেছিলে?"
একটু ইতস্তত করে বলল, "একটা রীলস দেখেছিলাম, ম্যাডাম। মেয়েটা বলছিল বেকিং সোডা দিয়ে নাকি এক রাতেই ত্বক উজ্জ্বল হয়ে যায়, ব্ল্যাকহেডস চলে যায়। পানির সাথে মিশিয়ে মুখে মেখে বসেছিলাম পনেরো মিনিট।"
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এই গল্প আমি প্রতি মাসে অন্তত কয়েকবার শুনি।
মিতুকে বুঝিয়ে বললাম আসল কারণটা—
আমাদের ত্বকের একটা প্রাকৃতিক pH ব্যালেন্স আছে, যা সাধারণত ৪.৫ থেকে ৫.৫-এর মধ্যে থাকে, সামান্য অম্লীয়। এই অম্লীয় স্তরটাই একটা প্রতিরক্ষা দেয়াল হিসেবে কাজ করে, যাকে আমরা বলি "acid mantle"। এটা ত্বককে ব্যাকটেরিয়া, জীবাণু আর দূষণ থেকে রক্ষা করে।
বেকিং সোডা মানে সোডিয়াম বাইকার্বোনেট—এর pH প্রায় ৯, মানে জোরালোভাবে ক্ষারীয়। যখন এটা সরাসরি মুখে লাগানো হয়, তখন সেই প্রতিরক্ষা দেয়ালটা মুহূর্তেই ভেঙে যায়। ত্বক হয়ে পড়ে অরক্ষিত।
এরপর যা ঘটে তা ধাপে ধাপে বললাম—
প্রথমত, ত্বকের ন্যাচারাল অয়েল আর ময়েশ্চার ব্যারিয়ার নষ্ট হয়ে যায়, ফলে ত্বক শুকিয়ে টানটান হয়ে যায়, খসখসে হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, বেকিং সোডার দানাগুলো বেশ রুক্ষ, স্ক্রাব করলে মাইক্রো-টিয়ার তৈরি হয়—চোখে দেখা যায় না এমন ছোট ছোট ক্ষত, যেগুলো দিয়ে জীবাণু সহজে ঢুকে ইনফেকশন তৈরি করতে পারে।
তৃতীয়ত, বারবার ব্যবহারে ত্বকের নিজস্ব তেল উৎপাদন ব্যবস্থা এলোমেলো হয়ে যায়—কারো ত্বক অতিরিক্ত তেলতেলে হয়ে যায়, কারো আবার চিরস্থায়ী শুষ্কতা তৈরি হয়।
চতুর্থত, সেনসিটিভ স্কিন বা যাদের একজিমা, রোজেসিয়া বা অ্যাকনে-প্রবণ ত্বক, তাদের ক্ষেত্রে এই ক্ষতি আরও দ্রুত আর তীব্র হয়—লালচেভাব, জ্বালাপোড়া, ফুসকুড়ি, এমনকি কেমিক্যাল বার্নের মতো অবস্থাও তৈরি হতে পারে, যেমনটা মিতুর হয়েছিল।
আর দীর্ঘমেয়াদে বারবার এই ক্ষারীয় ধাক্কা খেতে খেতে ত্বকের প্রাকৃতিক নিরাময় ক্ষমতা কমে যায়, দাগ বসে যায়, আর কোলাজেন স্তরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—যা বয়সের আগেই বলিরেখা ডেকে আনে।
মিতুকে বললাম, "সোশ্যাল মিডিয়ার রীলসে যেটা 'ঘরোয়া টোটকা' বলে দেখানো হয়, তার পেছনে কোনো ডার্মাটোলজিক্যাল রিসার্চ থাকে না। যার ত্বকে হয়তো কাজ করেছে বলে মনে হয়েছে, তার ত্বকের ধরন আর তোমার ত্বকের ধরন এক নয়। একজনের জন্য যেটা নিরাপদ মনে হচ্ছে, সেটা আরেকজনের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।"
তাকে ট্রিটমেন্ট দিলাম ব্যারিয়ার রিপেয়ারের জন্য, আর বললাম আগামী কয়েক সপ্তাহ কোনো অ্যাক্টিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট, স্ক্রাব বা ঘরোয়া টোটকা একদম বন্ধ রাখতে।
যাওয়ার আগে মিতু বলল, "ম্যাডাম, এরপর থেকে কিছু ট্রাই করার আগে …. "ওকে থামিয়ে দিলাম।কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে একটা হাসি দিয়ে মেয়েটা বেরিয়ে গেলো।
ত্বক একটাই। রীলসের ভিউ বাড়ানোর জন্য বানানো "কিউরিওসিটি হুক" কনটেন্ট দেখে নিজের ত্বক নিয়ে পরীক্ষা করা উচিত না। কোনো কিছু ব্যবহারের আগে অবশ্যই একজন ডার্মাটোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া দরকার—কারণ ত্বক সুস্থ রাখা যতটা সহজ, নষ্ট হওয়া ত্বক ঠিক করা ততটাই কঠিন ও সময়সাপেক্ষ।