23/08/2026
সাদিকের বোনের বিয়ে বাড়ি থেকে এইমাত্র বাসায় ফিরলাম। কিন্তু মনে হচ্ছে, আমি যেন একটা মৃত্যুপুরী থেকে ফিরে এসেছি।
বিয়েটা ছিল আমার বন্ধুর বোনের।
সকাল থেকে সবকিছুই সুন্দরভাবে চলছিল। বাড়িভর্তি মানুষ, আত্মীয়-স্বজনের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে আর দশটা বিয়ের মতোই একটা উৎসবমুখর পরিবেশ।
আমার বন্ধুর পরিবার বংশীয় পরিবার। সামাজিকভাবে যতেষ্ট সম্মানিত মানুষ উনারা। শুধু আর্থিক সামর্থ্যটা খুব বেশি নয়।
পাত্রপক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সর্বোচ্চ একশ জন মেহমান আসবেন। সেই হিসাব করেই কমিউনিটি সেন্টারে খাবারের আয়োজন করা হয়েছিল। নিজেদের আত্মীয়-স্বজন মিলিয়ে যতটা সম্ভব ভালোভাবেই আয়োজন করার চেষ্টা করেছিল মেয়ের পরিবার।
কিন্তু যোহরের পর যখন বরযাত্রী আসতে শুরু করল।
একবার খাবার গেল। আবার খাবার গেল। দুই দফায় পাত্রপক্ষের প্রায় একশ জনকে খাওয়ানো শেষ হওয়ার পরও দেখা গেল, আরও অন্তত একশ জনের মতো মানুষ খাবারের অপেক্ষায়।
মেয়ের পরিবারের লোকজন অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে পাত্র পক্ষকে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করলেন। ভদ্রতার সাথেই বলা হলো, “আমাদের আয়োজনটা আপনাদের কথামতো একশ জনের হিসাবেই করা ছিল। আপনারা যদিও বেশি এসেছেন নো প্রব্লেম। একটু সময় দেন, আমরা বাইরে থেকে খাবার এনে হলেও সবাইকে খাওয়াব।”
মাত্র এক ঘণ্টা সময় চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সামান্য কথাতেই যেন পাত্রপক্ষের আগুনে ঘি পড়ল। পাত্রের বাবা-চাচারা ক্ষেপে গেলেন। শুরু হলো তর্ক, ঝগড়া, চিৎকার চেচামেচি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই চারপাশের মানুষ জড়ো হয়ে গেল। এর মধ্যেই হঠাৎ খবর এলো—উপরের তলায় পাত্রপক্ষের কিছু মেহমান খাবার দিতে দেরি হওয়ায় কমিউনিটি সেন্টারে ভাঙচুর শুরু করেছেন।
স্টাফদের সঙ্গে হাতাহাতি। অকথ্য গালিগালাজ। বিয়ের অনুষ্ঠান মুহূর্তেই পরিণত হলো বিশৃঙ্খলায়। আমি স্পষ্ট দেখছিলাম, মেয়ের বাবা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য পাত্রের বাবার হাত-পা পর্যন্ত ধরছিলেন।
একজন বাবা আরেকজন বাবার কাছে অনুনয় করছিলেন—“ভাই, আমার মেয়েটার জীবনটা নষ্ট করবেন না। এক ঘণ্টা সময় দেন। বাইরে থেকে খাবার এনে সবাইকে খাওয়াব।”
ভাবুন একবার।
যে বাবা কয়েক ঘণ্টা আগেও মেয়ের বিয়েতে হাসিমুখে অতিথি আপ্যায়ন করছিলেন, সেই বাবা নিজের মেয়ের ভবিষ্যৎ বাঁচানোর জন্য মানুষের পা ধরে কাঁদছেন।
কিন্তু পাত্রপক্ষের মন গলল না। বরং একপর্যায়ে তারা ঘোষণা দিল—বিয়ে করবে না। জামাই নিয়ে বাড়ি চলে যাবে।
মেয়ের বাবা হার্টের রোগী। এসব কথা শুনে তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল। আমরা দ্রুত তাকে বাসায় নিয়ে এলাম।
এদিকে অতি দেমাগি পাত্রপক্ষ সত্যিই বিয়ে শেষ না করেই চলে গেল।
একটা মেয়ে, যার হাতে হয়তো কিছুক্ষণ আগেও মেহেদির রং শুকাচ্ছিল—সে শুনল, তার বর তাকে বিয়ে না করেই চলে গেছে। খবরটা শোনার পর মেয়েটা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
পুরো বাড়িটা যেন এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আরও ভয়ংকর একটা ঘটনা ঘটল। মেয়েটার দোতলার একটা রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। কেউ বুঝে ওঠার আগেই সে আ*ত্মহ*ত্যার চেষ্টা করে। দরজা ভেঙে আমরা কোনোভাবে তাকে উদ্ধার করি।
আর এসবের খবর যখন তার বাবা শুনলেন—তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন।
আমরা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ডাক্তারের কাছে কাছে নিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও গুরুতর বলে মনে হলো। হাসপাতালে ভর্তি করা হলো সাদিকের আব্বুকে।
উনাকে ডাক্তার দেখানো শেষ করে, এইমাত্র হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরলাম।
বাসায় এসে বন্ধুকে ফোন দিলাম। ওপাশ থেকে শুধু একটা কথাই শুনলাম—“ভাই, আপুকে কিছুতেই সামলাতে পারছি না।” কথাটা শুনে বুকটা কেমন জানি কেঁপে উঠল।
একটা বিয়ের জন্য একটা পরিবার কত স্বপ্ন দেখে! একটা ফ্যামিলি কতদিন ধরে তার মেয়ের বিয়ের প্লানিং করে। একজন বাবা, ভাই কত কষ্ট করে টাকা জমায়।
আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই সব স্বপ্ন কীভাবে যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে গেল। শুধু খাবার দেরি হয়েছিল।তা-ও আবার পাত্র পক্ষের ভুলের কারণেই।
সেই সমস্যার সমাধান কি ছিল না? ছিল। একটু ধৈর্য বা মানবিক হলেই হতো।
আজ যার মেয়ের বিয়ে, কাল সেই মেয়ের জায়গায় আমার নিজের মেয়েও তো থাকতে পারে। একটা বিয়েতে খাবার কম পড়া লজ্জার হতে পারে।
কিন্তু খাবারের জন্য একটা মেয়ের পুরো ফ্যামিলিকে অপমানের মধ্যে ঠেলে দেওয়া—এটা কতটা কষ্টের বুঝানো যাবেনা।
এই অসভ্য, ইতরদের বিচার আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিলাম। তিনি যেনো দুনিয়ায় তাদের কৃতকর্মের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেন।
মুহাম্মদ এনাম