08/07/2026
আসসালামু আলাইকুম
আলহামদুলিল্লাহ একটি কথা বলতে কখনোই দ্বিধা নেই যে রক্তরোগ বিষয়ে আমি সব কিছুই জানিনা।
আবার অনেক কিছু জানলেও প্র্যাক্টিকেল এপ্লিকেশনে গিয়ে অনেক সময়ই অনেক কিছু করা যায় না।
আবার নিজেকে কখনোই ভুল ত্রুটির উর্ধ্বেও দাবী করিনা। মানুষ মাত্রই ভুল করে। একজন সম্মানিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও মানবীয় ভুলের উর্ধ্বে নন।
উপরোক্ত তিনটি কারণের যে কোনটির জন্যই চিকিৎসাধীন একজন সম্মানিত রোগীর ক্ষতি এমনকি সর্বোচ্চ ক্ষতি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
একজন সম্মানিত চিকিৎসকের কাজকে বলা হয় প্র্যাক্টিস। উনি প্রতিদিনের চর্চায় নতুন করে শিখেন। সেই শেখা দিয়ে পরের রোগীকে আরও ভাল চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
অনেক সময় এমন সিচুয়েশন হয় যে রোগীর ওষুধ দিলেও বিপদ আর না দিলেও বিপদ। এসব ক্ষেত্রে প্রতিটা রোগীর জন্য ডিসিশন ভিন্ন হয়। ফলাফলও ভিন্ন হয়।
অনেক রোগী গ্যারান্টি চান যে রোগ ভাল হবে কিনা বা ওষুধ কাজ করবেই কিনা জানতে চান।
অনেকেই যেন একজন সম্মানিত চিকিৎসককে এভাবে স্রষ্টার আসনে বসাতে চান। গ্যারান্টিতো আল্লহ ছাড়া কেও দিতে পারেন না।
দিন শেষে একজন সম্মানিত চিকিৎসক একজন মানুষ। যেহেতু তিনি অনেক জ্ঞ্যান অর্জনের চেষ্টা করেছেন সেহেতু সম্ভবত তাঁর বেশিরভাগ রোগীরই কোন না কোন উপকার হয়।
কিন্তু ওই মূহুর্তের সর্বোচ্চ ও যথাসম্ভব সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা সত্বেও অনেক সময় বিপদও হয় যা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত।
এক্ষেত্রে এসব ক্ষতির জন্য যদি একজন সম্মানিত চিকিৎসককে একজন ক্রিমিনাল হিসেবে ট্রীট করার চেষ্টা করা হয় সেটা অবশ্যই সমাজের জন্য ক্ষতিকর। কারণ এক্ষেত্রে রোগীর চিকিৎসার জন্য আগ বাড়িয়ে যে আপ্রাণ চেষ্টা সেটা রিপ্লেস হয় নিজের ঘাড় বাঁচানোর বাস্তব চেষ্টায়।
ফলাফল স্বরূপ এখন রাত বিরেতে খারাপ রোগীদের জন্য ছুটে যাওয়ার আগ্রহ অনেক ক্ষেত্রেই কমে আসছে বলে মনে হয়।
চিকিৎসা কেবলমাত্র একজন সম্মানিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এর উপর নির্ভরশীল নয়।
সম্মানিত জুনিয়র চিকিৎসক, দক্ষ নার্স, পরিশ্রমী ল্যাবকর্মী, আয়া বুয়া সুইপার, হাসপালের অন্যান্য সকল সেক্টর ( আইটি, রিসেপশন,.....) এদের সবার সাথে সাথে রোগী নিজে, রোগীর পরিবার আত্মীয় স্বজনদের মনোভাব - অভ্যাস- জ্ঞ্যান- বাস্তবতাবোধ- ভদ্রতা সুচিকিৎসার জন্য জরুরি।
আপনার রাস্তা ভাংগা হলে একজন চিকিৎসক কোমর ব্যথা ভাল করে দিবেন এ আশা দূরাশা। বদধ বিল্ডিংএ কাচ্চি খেয়ে পুড়ে মরা বা অস্বাস্থ্যকর বিশাক্ত খাবারের জন্য হার্ট এটাক করে ফেললে বা কঠিন রোগ হলে চিকিৎসায় লাভ কমই হয়। উলটা পথে স্কুটার চালিয়ে নিজের আর অন্যের জীবন হানি করে আসার পর একজন সম্মানিত চিকিৎসক এর অনেক সময়ই আর কিছু করার থাকেনা।
বিপিএল উদযাপন বা সিগারেট খাওয়ার টাকা থাকলেও যখন ওষুধ কেনার টাকা থাকেনা তখন অসুস্থ্যতার দায় আসলে কার সেটা অবশ্যই ভাববার বিষয়। এমন অনেক অনেক বিষয় যেগুলোর সাথে একজন সম্মানিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কোনভাবেই ইনভলভড নন সেগুলো অনেক সময় চিকিৎসা ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
যাই হোক, ব্যক্তিগতভাবে নিজের দিক থেকে চিকিৎসার ভুল ত্রুটি ঠেকাতে রোগীকে সবসময় একাধিক মত নিতে উৎসাহিত করি। স্ট্রিক্টলি নিজের সাব্জেক্টের বাইরে চিকিৎসা দিই না। প্রয়োজন হলেই মেডিকেল বোর্ড করতে বলি। টেস্ট লাগলে করতে দেরি করিনা। রোগ না বুঝলে দ্রুত বলে দিই যে পারছিনা। রোগের আদ্যপান্ত সব বুঝিয়ে বলি। ১৫ - ২০ মিনিট বা বেশি সময় দিয়ে রোগী দেখি। গরীব রোগীদের সরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দিই।
এর বাইরে আর কি করতে পারি জানা নেই।
তবে চিকিৎসা যে অনেক কঠিন একটা বিষয় এটা যে অনেক রথী মহারথীদের বুঝে আসছেনা ;
আর সুচিকিৎসার জন্য যে সমাজের প্রতিটি সেক্টরের সহযোগিতা প্রয়োজন, সেটার অনুপস্থিতি চিকিসাকে যে আরও কঠিন করে ফেলছে এটা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
নাহলে দিন শেষে একজন রোগীই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।
চারিদিকে ফুড ভ্লগার, ক্রিকেট, রাজনীতি, সিনেমা, গান নাচ, সাংবাদিকতা, মানবাধিকার ব্যবসা, ফ্রি ল্যান্সিং, বিসিএস, পণ্যের ব্যবসা, আইন ব্যবসা, ধর্ম ব্যবসা অনেক কিছু করেই জীবন চলে যায়।
কিন্তু সমাজের টিকে থাকতে হলে ব্যাসিক হিসেবে কৃষি চিকিৎসা ও শিক্ষায় কোন খাদ থাকলে সমাজ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
মহান আল্লহ আমাদের সবাইকে সুস্থ্য ও নিরাপদ রাখুন।
ডা মু জামাল উদ্দিন তানিন
রক্তরোগ রক্তক্যান্সার থ্যালাসেমিয়া ও রক্তস্বল্পতা বিশেষজ্ঞ, চট্টগ্রাম।