13/07/2026
েকে_২০২৬:
আমার যত কথা,
আমার যত গান।
এখনতো আর উর্দি পরতে হয় না,
অনেক দিন ধরেই আমি সাবেক।
আজ থেকে ঠিক ৪৬ বছর আগে, এই দিনে, প্রথম রমজানে, আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন প্রাপ্ত হই, তবে খুব বড় কোন আশা নিয়ে নয়।
সেই যে পথচলা,
তা আজও চলছে,
জানিনা আর কতোদিন !
পেছনে ফিরে তাকালে দেখি এক দূর্গম এবং রোমাঞ্চকর পথ। এই দীর্ঘ যাত্রায় জীবন আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। আজকে আপনাদের আমার কিছু গভীর উপলব্ধি শেয়ার করবো ।
আজকাল লিখতেও ভয় করে। অনেকেই মনে করেন বুঝি AI ম্যাডাম লিখে দিয়েছেন। আসলে তা নয় ভাইজান। বন্ধুদের পাকা হাতের পেদানো খাইতেও আমি সদা প্রস্তুুত। স্রেফ আমার হৃদয়ের আঙ্গিনায় বসে বৃষ্টি ভেজা আষাঢ়ের রাতে লেখা, তবে 'আষাঢ়ে গল্প' নয়, শুধুই জীবন থেকে নেয়া।
৮০-র দশকে যখন সেনা ক্যারিয়ার শুরু করি, তখন ঢাকা সি এম এইচএ রুগী থাকতো বড়জোড় ১২৫ জন। তখন দেশে আল্ট্রাসনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, লেজার কিংবা এআই (AI) - র মতো প্রযুক্তির ব্যবহার আমরা শুনিনি। আর আজ এই বিস্ময়কর প্রযুক্তিগুলো চিকিৎসকদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু প্রযুক্তি যতটা এগিয়েছে, আমাদের মনস্তাত্ত্বিক নৈতিকতা ঠিক ততটাই পিছিয়েছে।
তিনটি বিশেষ অভিজ্ঞতা আমার জীবনকে সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ করেছে। শৈশবের স্কাউটিং, যা আমার মাঝে সেবার মানসিকতা তৈরি করে।মেডিকেল ছাত্রাবস্থায় তাবলীগ জামাতের সংশ্লিষ্টতা আমাকে আধ্যাত্মিকতা, নম্রতা ও মহান আল্লাহর উপর আস্হা রাখা শিখিয়েছে। আর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কঠিন প্রশিক্ষণ ও কঠোর শৃংখলা আমাকে যেকোনো পরিস্থিতিতে টিকে থাকার শক্তি জুগিয়েছে। এর পাশাপাশি জীবনের প্রতিটি মোড়ে পাশে পাওয়া বন্ধু, রুমমেট, পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, দেশে- বিদেশে চলার পথে চেনা- অজানা অসংখ্য মানুষের সান্নিধ্য ও আমার পরিবার আমাকে আজকের আমিতে পরিণত করেছে।
সার্জারি অত্যন্ত ডাইনামিক (গতিশীল) এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি বিষয়। বিগত চার দশকে আমি এই চিকিৎসা জগতের আমূল পরিবর্তন দেখেছি। যে প্রোটোকল আজ সচল, কাল তা বদলে নতুন প্রযুক্তির আগমন ঘটছে। এই ডাইনামিক পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলা, প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা ছিল এক ভীষণ চ্যালেঞ্জ। তাই প্রতিনিয়ত শেখার মানসিকতা না থাকলে এই পেশায় টিকে থাকা অসম্ভব।
আমার পরম শ্রদ্ধেয়, ব্যতিক্রমধর্মী বড় ভাই মরহুম আবদুল গফুর সাবের (সাবের সাহেব বলে সুপরিচিত) ১৯৭৩ সালে আমি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়ায় আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি সেকালের টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। তাতে লিখা ছিল "Congratulations. You have become a life long student" - এর মাজেজা আমি প্রতিদিনই উপলব্ধি করছি।
এই দীর্ঘ পথটা মোটেও মসৃন পাইনি। রাজপথের মতো সোজা কিংবা কার্পেটে মোড়ানো ছিল না। কত ঝড়-ঝাপটা এসেছে, কত প্রতিকূলতা গ্রাস করতে চেয়েছে। জীবনের কঠিনতম সময়ে বহুবার হোঁচট খেয়ে পড়েছি। এমনও সময় গেছে যখন মনে হয়েছে আর বুঝি ওঠার শক্তি নেই। কিন্তু প্রতিটি পতন আমাকে আরও শক্ত করে গড়ে তুলেছে। আমি দমে যাইনি। প্রতিবার বুকভরা আত্মবিশ্বাস ও দ্বিগুন শক্তি নিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি। নিজের স্বপ্নের দিকে বিরামহীন ভাবে হেঁটে গেছি- কখনও ক্লান্তি আমাকে স্পর্শ করেনি।
যে গানটি তখন উদ্দীপ্ত করতো - ” আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি, আমায় আর কান্নার ভয় দেখিয়ে কোন লাভ নেই,আমি আগ্নেয়গিরির কাছে জ্বলতে শিখেছি, আমায় আর জ্বালানোর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই"।
আজ চারিদিকে শুধু প্রযুক্তির চাকচিক্য, অথচ আমাদের স্বভাব চরিত্রের দ্রুত অবনতি ঘটছে। মানবতা আজ যেন হিমাগারে ! রোগীরা চিকিৎসকদের অতি মানবিক রূপে দেখতে চান- আমরাও তা-ই চাই। কিন্তু যে সমাজে মানবতা পদদলিত, গুনীরা পদে পদে অপমানিত এবং টাকা দিয়ে সবকিছুই করা যায় - সেখানে মানবিক চিকিৎসক তৈরি করাও দূরুহ ব্যাপার! কেননা "অনেকগুলো কাকের মাঝে একটি কোকিল থাকতে পারে না"। বিশেষ করে যুবসমাজের মোবাইল আসক্তি, মাদক, মাস্তানী আর মব কালচার আজ এক ভয়ংকর মহামারীর রূপ নিচ্ছে যা নিয়ন্ত্রণে না আনলে দেশ আবারও পিছিয়ে যেতে পারে!
শুধু সমাজ নয়,পরিবারিক শিক্ষা , সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি এবং বিশ্বরাজনীতি আজ এক হিংস্র রূপ ধারণ করেছে। যুদ্ধ আজ একটা লাভজনক ব্যবসা। সর্বত্র চলছে মানুষ মারার নিষ্ঠুর প্রতিযোগীতা। পুরো পৃথিবীটাই যেন একটা জুয়ার ক্যাসিনো। এমন ভাবলে মন ভারি হয়ে উঠে, আগামীর বিশ্ব কেমন হবে?
২০১৬ সালে অবসরের পর থেকে আমি চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা, মাইজদী ও ফেনীতে প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসা দিতে মাসে চার দিন গ্রামে থাকি। আমার অনেক বন্ধুরা মনে করেন আমি শুধুই টাকার পেছনে ঘুরছি। আসলে তা নয়। এই সরল প্রান্তিক মানুষদের গায়ের গন্ধে আমি আমার মা- নানির চিরচেনা ঘ্রাণ খুঁজে পাই। আর যেটা না বললেই নয়- কুমিল্লার ছন্দু হোটেলের মাসকলাই'র ডাল, চৌমুহনীর মোগল রেস্টুরেন্টের গরম লইট্যা মাছের ভর্তা আর চৌদ্দগ্রামের ডলি রিসোর্টের কচি লাউ শাকের চচ্চড়ি আমাকে ভীষন টানে। এই ভালোবাসার টান কখনো টাকা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।
ভবিষ্যৎ তৈরি করতে স্ত্রীর ভূমিকা অতুলনীয়। মায়ের কোলে বসে আমি হয়তো এমবিবিএস পাস করেছি, কিন্তু ৪১ বছর ছায়ার মতো পাশে থেকে সুখে- অসুখে, জয়ে-পরাজয়ে সাহস জুগিয়েছেন আমার স্ত্রী। তাঁর পিঠে ভর করেই আমার সব সাফল্য আর অর্জন।
জয়ে যেমন আনন্দ আছে,পরাজয়েরও সুফল আছে। পরাজয় আমাদের আরও শক্তিশালী করে। সংকটের মাঝে হতাশ হতে চাই না। আমি প্রায়ই কিছু অলৌকিক ঘটনা ও এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ভাবি। আপাতদৃষ্টিতে যা অমঙ্গল মনে হয়েছে, পরে দেখেছি তা ভালোর জন্যই হয়েছে। এখন আমার বিশ্বাস - সামনে যত কঠিন পরিস্থিতিই আসুক, শেষ পর্যন্ত ভালো কিছুই হবে।
চরম বিপদের দিনগুলোই আসল মানুষ চিনিয়েছে। বিপদে না পড়লে বন্ধু অথবা কমরেড কাউকেই চেনা যায় না। মনে পড়ে সেই গানটি, যা হৃদয়ের কথা বলে-
"আপন মানুষ চিনা বড়ই দায়রে,
আপন মানুষ বুঝা বড়ই দায়"।
জীবন এক কঠিন ও দীর্ঘ লড়াইয়ের নাম। অলসতার এখানে কোনো স্হান নেই। তরুনদের বলি পরিশ্রমী হও। পথ চলায় কোন পরিশ্রমীর পরাজয় আমি দেখিনি। শুধু ভালো লেখাপড়া করেই বড় হওয়া যায় না। কর্মজীবনে উঁচুতে উঠতে হলে সততা,অদম্য সাহস, ঝুঁকি নেওয়া, কাজের সদিচ্ছা এবং বড় স্বপ্ন দেখতে হয়। পরশ্রমী ও সজাগ থেকে এই ভজনটি শুনুন- " ডাগার হ্যায় মুশকিল - কঠিন সফর হ্যায়, মাগার মুসাফির জাগা নেহি "।
আমরা যা চাই, তার সবকিছু পাবো- এর কোন নিশ্চয়তা নেই। অনেক স্বপ্ন হয়তো অপূর্ণ রয়ে যায়, কিন্তু তাতে জীবন থেমে যায় না। এক গভীর সমবেদনা নিয়ে মনকে শান্ত করে যে সুর-
"হার এক খোয়াব, মোকাম্মেল হো জরুরী তো নাহি"( প্রতিটি স্বপ্নই যে পূর্ণতা পাবে, এটা জরুরী নয়)। কিছু অপূর্ণতাও জীবনের সৌন্দর্য্য।
২০১৬ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে আসি। কিন্তু চাকুরি জীবন থেকে অবসর নিলেও, মানুষের সেবা করে চলছি। হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব প্রাপ্ত হওয়া ছিল এক সুবর্ন সুযোগ। আমার অভিজ্ঞতা ও মানবিকতা হবু চিকিৎসকদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার এক বিরল সুযোগ করে দিয়েছিল।
আজকের এই দিনে এতগুলো কথা ভাগ করে নেওয়ার কারন একটা-ই - আমি মনে করি, "Knowledge has no value in the graveyard" ( কবরস্থানে জ্ঞানের কোন মূল্য নেই)। আমার যৎসামাণ্য অভিজ্ঞতা, প্রান্তিক মানুষের কাছ থেকে অর্জিত শিক্ষা এবং সমাজ ভাবনা আপনাদের সাথে শেযার করে তৃপ্তি পাচ্ছি।
পরিশেষে একটি মৌলিক বিষয়ে গুরুত্ব দিতে চাই:
সুস্বাস্থ্য একটি অমূল্য সম্পদ। মনে রাখবেন - আপনিই আপনার স্বাস্থ্যের সিইও ( CEO)। তাই নিজেকে ভালোবাসুন, এর যত্ন নিন। টাকা থাকলে অনেক কিছু পাওয়া গেলেও "সূস্থ্যতা" কেনা যায় না, এটি প্রতিদিনের নিয়মানুবর্তিতা দিয়ে অর্জন করতে হয়।
প্রিয় অণুজেরা,
জীবন একটা বিশাল ক্যানভাস, আর গান হলো সেই ক্যানভাসের সবচেয়ে সুন্দর রং। তোমরা যারা জীবনের নতুন পথ খুঁজছো, লক্ষ্য পানে ছুটছো, তাদের উদ্দেশ্যে আমার একটা ছোট্ট উপলব্ধি - সুরের কোনো সীমানা কিংবা ভাষা নেই। গান কেবল বিনোদন নয়, গান জীবনের শিক্ষক, পরম আশ্রয় ও জাদুকরী ঔষধ। জীবনের কঠিন সময়ে যখন কেউ পাশে থাকে না, তখন একটা গানই পারে মনের ক্ষত সারিয়ে তুলতে।
১৯৭০ সালে মা'কে বাড়িতে রেখে যখন ঢাকায় পড়তে আসি তখন "সন্তান" ছবির একটা গান শুনলেই মনে হতো এইটা সব মা'দেরই গান - "খোকন সোনা বলি শোনো
থাকবে না আর দু:খ কোনো
মানুষ যদি হতে পারো"।
গানটির আবেদন আজও আমাকে জড়িয়ে থাকে।
আমার জীবনের দীর্ঘ ডায়েরির পাতাগুলো আজ এই ফেসবুক পোস্টে জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠুক, এ আমার প্রত্যাশা। শৃংখলা, পেশা,জীবনসঙ্গী, দর্শন এই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ গুলির প্রতি সচেতন ও যত্নবান হই।
এই দীর্ঘ পথচলায় যারা পাশে ছিলেন, সবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা।
সবাইকে ধন্যবাদ।
আগামীর পৃথিবী ও আমাদের সবার সুস্বাস্থ্য অর্জিত হোক।