27/09/2026
ডেঙ্গুর ভয়াবহতা দিন দিন যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
আজ সকালে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত একজন চিকিৎসক, মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার এবং ৪২তম বিসিএসের কর্মকর্তা ডা. আঁচল রায়কে আজ তাঁর নিজ বিভাগ থেকে বদলি করে ডেঙ্গু বিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু কী নির্মম পরিহাস আজই ডেঙ্গুতে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।
আর খবরটি দেখার পর হঠাৎ আমার নিজের বুকটাও কেঁপে উঠল।
কারণ প্রায় এক সপ্তাহ আগের একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল।
প্রায় এক সপ্তাহ আগে হঠাৎ আমার স্ত্রী আমাকে জানাল, তার জ্বর এসেছে। সঙ্গে শরীর ব্যথা। প্রায় দুই বছর আগে তার একবার ডেঙ্গু হয়েছিল। তাই এবারও উপসর্গগুলো শুনে আমার মনে স্বাভাবিকভাবেই ডেঙ্গুর কথা এসেছিল।
পরদিন তার ডেঙ্গু পরীক্ষা এবং CBC করানো হলো। রিপোর্টে ডেঙ্গু নেগেটিভ( অনেক সময় নেগেটিভ আসতে পারে) এবং CBC ও মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু জ্বর তখনও কমেনি। সাথে শরীর ব্যাথা।
এখন ওর ইন্টার্নশিপের শেষ দিকে। মেডিসিনে ইন্টার্নশিপ চলছে, আর প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগীদের দেখতে হচ্ছে। অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও ইন্টার্নশিপে ছুটি পাওয়া সহজ নয়। তাই পরদিনও সে দুপুরে ডিউটিতে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল।
আমিও সন্ধায় গিয়েছিলাম যাতে তাকে নিয়ে আসতে পারি।
ওর ডিউটির সময় একটি ডেঙ্গু রোগী এলো। রোগী তার যেসব উপসর্গের কথা বলছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই তার নিজের উপসর্গের সঙ্গে মিলে যাচ্ছিল।
একজন ডেঙ্গু রোগীর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের একই রকম উপসর্গের কথা মনে পড়ায় তারও খুব খারাপ লাগছিল।
এর মধ্যে আশেপাশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যু। ফলে শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি মানসিকভাবেও সে বেশ ভেঙে পড়ছিল।
পরে দুদিন বিশ্রাম নিল।
এরপর আবার CBC করানো হলো। এবার প্লাটিলেট কিছুটা কমেছে। যদিও রক্তের অন্যান্য প্যারামিটার তখনও ভালো ছিল। তারপরের CBC তে Platelet বাড়লো।
আর আজ ডা. আঁচল রায়ের মৃত্যুর খবরটি দেখার পর সবকিছু যেন আবার নতুন করে মনে পড়ল। ওর ও মন খারাপ।
একজন চিকিৎসক হিসেবে আমরা প্রতিদিন অসংখ্য রোগীর পাশে দাঁড়াই। ডেঙ্গু, বিভিন্ন সংক্রমণ রোগীর জন্য যে ঝুঁকি, অনেক সময় চিকিৎসকের নিজের জন্যও সেই ঝুঁকি থাকে।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো একজন চিকিৎসক নিজেই যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখনও অনেক সময় তাকে রোগীর সামনে দাঁড়াতে হয়।
আজ যে চিকিৎসক রোগী দেখছেন, তিনি নিজেও হয়তো জ্বরে কাঁপছেন।
আজ যে চিকিৎসক অন্য একজনকে সাহস দিচ্ছেন “ভয় পাবেন না, আমরা আছি” হয়তো তিনিও নিজের ভেতরে ভয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
চিকিৎসকদের জীবনটা অনেক সময় এমনই।
নিজে অসুস্থ হলেও রোগী দেখতে হয়। নিজের শরীর খারাপ হলেও ডিউটি করতে হয়। কারণ তাঁর অনুপস্থিতিতে হয়তো আরও অনেক রোগী চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবে।
আর আজকের ঘটনাটি যেন সেই কঠিন বাস্তবতাটাকেই আরও নির্মমভাবে চোখের সামনে এনে দিল যে দিনে একজন চিকিৎসককে তাঁর নিজের বিভাগ থেকে ডেঙ্গু বিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হলো, সেই দিনই তিনি ডেঙ্গুর কাছে হেরে গেলেন।
ডা. আঁচল রায়ের মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
সবাই সচেতন হোন। আর অবহেলা নয়।