23/05/2026
আমার সামনের চেয়ার দুটিতে এক ভদ্রলোক ও তার মা বসে আছেন৷ ভদ্রলোক মিডল ইস্টে ছোটখাটো চাকরি করেন, ফ্যামিলি চট্টগ্রামেই থাকে৷ কয়েক বছর পর দেশে এসেছেন৷ এসে মাকে নিয়ে গিয়েছিলেন ডাক্তারের কাছে, ডাক্তার পাঠিয়ে দিলেন আমার শুক্রবারের চট্টগ্রাম পাঁচলাইশ এপিক হেলথকেয়ার চেম্বারে৷
আমি ভদ্রলোকের দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম,
- আপনার বয়স কতো?
- স্যার ৪৪ হবে
- তাহলে আপনার মায়ের বয়স ৪৮ লিখেছেন কেন সব কাগজপত্রে?
লোকটা একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে বললো,
- তাহলে মনে হয় আরেকটু বেশি হবে স্যার
- কতো হবে?
- ৫০ এর মতো হবে স্যার!
- আপনার বয়স ৪৪ হলে আপনার মায়ের বয়স কিভাবে ৫০ হয়?
- স্যার আপনি যাই বলেন, ৫২ এর বেশি হবে না৷
পাশে বসা ভদ্রমহিলা একেবারে থুরথুরে বুড়ি৷ সামনের দাঁত নাই একটাও, চামড়া কুঁচকে গেছে, গাল ভিতরে গুজে গেছে৷
আমার প্লাস্টিক সার্জনের চোখ বলে উনার বয়স কম করে হলেও ৭২, আর উনার ছেলের ৪৭-৪৮ হতে পারে৷
এর মাঝেও ভদ্রমহিলা হাসিখুশি, দুই চোখে মোটা করে কাজল লাগিয়ে এসেছেন, মিটিমিটি হেসে পান চাবাচ্ছেন৷
বয়স নিয়ে যখন বার্গেইনিং একেবারে চরমে, তখনই ভদ্রমহিলা মুখ খুললেন,
- ও ফুঁত, আর বয়স ৪৬, ইতের বয়স ৩০! ইতে কিচ্চু ন জানের!
মানে উনার বয়স ৪৬ আর উনার ছেলের বয়স ৩০! উনার ছেলে কিছুই জানেনা!
বলে উনি মিটিমিটি হাঁসছেন৷
তো উনারা আমার কাছে এসেছেন উনার মায়ের হাতে একটা ঘা নিয়ে৷ উনি ছোট থাকতে উনার মা রান্না করার সময় কাপড়ে আগুন লেগে যায়৷ হাতের কবজি থেকে কনুই পর্যন্ত পুড়ে যায়৷ একদম লাল টকটকে ঘা হয়৷ টাকার অভাবে হাসপাতালে আনতে পারেনা, কিন্তু গ্রামে এক বাবা থেকে তাবিজ নেয় এবং সেটাতেই উন্নতি শুরু হয়৷ তাবিজের গুনে ধীরে ধীরে কয়েক মাস পর ঘা শুকায়, কিন্তু হাতটা একটু শক্ত আর বেঁকে যায়৷
এই জীবন উনি মেনে নিয়েছিলেন৷ মেনে না নিয়ে উপায়ও ছিলো না৷ কারণ কয়েকবছর পর উনি স্বামীকেও হারান৷ চার ছেলেমেয়েকে বড় করেন৷ ছেলেরা বড় হওয়ার পর এতোদিনে কিছুটা আর্থিক স্বচ্ছলতার মুখ দেখেছেন৷
কিন্তু এখন সমস্যাটা হলো, গত দুই বছর ধরে এই ৪০ বছর আগে শুকিয়ে যাওয়া চামড়ায় ঘা হয় আর চুলকায়৷ এতোদিন ঘা ওষুধ দিলে শুকালেও গত চার মাস ধরে আর শুকাচ্ছে না!
আমি ঘায়ের চেহারা দেখে বুঝতে পারলাম যে এটা মার্জোলিন্স হয়ে স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা হওয়ার পথে৷ মানে এক ধরনের ক্যান্সার যা পুরাতন স্কারে হয়৷
আমি অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে বললাম, অপারেশান করতে হবে৷ বৃদ্ধা কান্নাকাটি করে বললেন,
" তোয়ারে আই ফুঁত মাতসি, ওষুদ দি টিক করি দসোনা! এইল্লা ক্যান করস! "
মহিলা রাগ করে চেম্বারের বাইরে চলে গেলেন৷ উনার ছেলে চুপচাপ বসে আছেন৷ আমি ঠান্ডা মাথায় বললাম, এটা সম্ভবত স্কিন ক্যান্সার অপারেশান না করালে এটা ছড়িয়ে পড়বে৷ এখনও খুবই ভালো স্টেজে আছে৷ এটা সম্পূর্ণ নিয়ে আসা সম্ভব৷
এর এক সপ্তাহ পর ছেলে ঠিকই মাকে রাজি করে নিয়ে এসেছিলো৷ বায়োপসিতে আসলো Invasive Squamous Cell Carcinoma Grade 1... All peripheral & deep margin Free from cancer...
রিপোর্ট দেখার পর ছেলে আমার হাত ধরে কাঁদো কাঁদো হয়ে অনেক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো৷
আমিও মনে মনে ভদ্রলোককে ধন্যবাদই বলছিলাম৷ ধন্যবাদ বলছিলাম, কারণ উনি যেভাবে তার মায়ের কেয়ার করলেন এতোটুকু আমাদের প্রত্যেকের মা ডিসার্ভ করেন৷ কিন্তু আমরা সবাই কি সবসময় পারি?
উনি পেরেছেন, তাই উনাকে ধন্যবাদ...