08/10/2026
দুনিয়া কোথায় যাচ্ছে....! বয়স ২৬!
মেয়ে।
স্টুডেন্ট।
কিছুদিন ধরে ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব আর তলপেটে ব্যাথা- এসব নিয়ে হাসপাতালে এসেছিল। মাসিকও অনিয়মিত। ডাক্তার তাকে Whole Abdomen USG করতে দিয়েছেন।
প্রোব হাতে নিয়ে তলপেটে স্ক্যান শুরু করতেই চোখ আটকে গেল।
তলপেটজুড়ে যেন রক্তের বন্যা।
সন্দেহ হলো। তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
-প্রেগনেন্সি টেস্ট করিয়েছেন?
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর-আমি অবিবাহিত।
আমি আর কিছু বললাম না। শুধু স্ক্যান চালিয়ে গেলাম।
রক্তের সেই বিশাল collection-এর গতিপথ অনুসরণ করতে করতে দেখলাম, তলপেট পেরিয়ে রক্ত উঠে গেছে উপর পেট পর্যন্ত।
আর ডানদিকে ovary-এর পাশে tube-এর মধ্যে দেখা গেল ectopic pregnancy-এর চিহ্ন।
রক্তের বন্যা দেখে ধারণা পরিষ্কার হলো যে সেই tube-টি rupture করেছে।
অর্থাৎ, জরায়ুর বাইরে, ডানদিকের fallopian tube-এ থাকা pregnancy rupture হয়ে গেছে এবং পেটের ভেতরে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
আমি দ্রুত স্ক্যান শেষ করে তাকে বললাম,
-আপনি অবিবাহিত, এটা আপনার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু আমার কাছে কোনো history লুকাবেন না। আপনার অবস্থা এখন অত্যন্ত আশংকাজনক। দ্রুত β-hCG test করিয়ে রিপোর্টটা আমাকে দেখান।
প্রায় এক ঘণ্টা পর সে ফিরে এলো।
হাতে β-hCG positive রিপোর্ট।
তাকে খুব শান্তভাবে বুঝিয়ে বললাম-
-আপনার pregnancy আছে। কিন্তু pregnancy-টা জরায়ুর ভেতরে নেই। জরায়ুর বাইরে, tube-এর মধ্যে ছিল। সেই tube rupture করেছে। আপনার পেটের ভেতরে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এটা একটি acute emergency case। এখনই USG এবং β-hCG রিপোর্ট নিয়ে ইমার্জেন্সিতে যেতে হবে।
কিন্তু সে গেল না।
আমার রুমেই বসে রইল।
আমি এর মধ্যে আরও কয়েকজন রোগী দেখলাম।
আর সে চুপচাপ, ঝিম মেরে বসে রইল।
কিছুক্ষণ পর খুব ধীরে ধীরে বলল- তার একজন কাজিনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। পরিবার কিছুই জানে না।
তারপর প্রশ্ন করলো—
-এটা কি কোনোভাবে অপারেশন ছাড়া ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা যায় না? আমি কোনোভাবেই পরিবারকে জানাতে পারব না।
আমি বললাম,
-কিছু নির্দিষ্ট ectopic pregnancy-তে medication দিয়ে চিকিৎসার সুযোগ থাকে। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে tube rupture-এর সঙ্গে significant internal bleeding-এর evidence আছে। এটা সেই পরিস্থিতি নয় যেখানে বসে থেকে অন্য কোনো option খোঁজার সময় আছে। আপনার জীবন এখন ঝুঁকিতে। আরো বেশিক্ষন এভাবে বসে থাকলে পেটের ভিতর রক্তের বন্যা বাড়বে। তারপর আপনি শকে চলে যাবেন।
তাকে আরও বললাম,
-এই মুহূর্তে সামাজিক বা পারিবারিক ভয়- কোনোটাই আপনার জীবনের চেয়ে বড় নয়। অন্তত এমন একজন মানুষকে জানান, যিনি আপনাকে এই কঠিন মুহূর্তে পাশে থাকবে।
তারপরও সে গেল না।
চুপ করে বসে রইল।
আমি আরও কয়েকজন রোগী দেখলাম।
কিছুক্ষণ পর আবার সে বলল—
-রিপোর্টটা কি একটু change করে দেওয়া যায়?
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম—
-কীরকম change?
সে খুব নিচু গলায় বলল,
- Pregnancy-এর ব্যাপারটা কি বাদ দিয়ে রিপোর্ট দিতে পারবেন?
সেই মুহূর্তে সত্যিই কী বলব বুঝতে পারছিলাম না।
শেষ পর্যন্ত শুধু বললাম—
-আপনি যদি বাঁচতে চান, দয়া করে এখনই গাইনি ইমার্জেন্সিতে চলে যান। কারণ বিপদে শুধু আপনি একা না, আমিও আছি আপনার সাথে। আমি রিপোর্ট থেকে ruptured ectopic- এর কথা বাদ দিয়ে দিলে হয়তো আপনার কাছে বিষয়টা কিছুক্ষণের জন্য সহজ মনে হবে, কিন্তু তাতে আপনার জীবন বাঁচবে না। পরবর্তীতে আপনার কোন অঘটনার জন্য সর্বপ্রথম আমার রিপোর্ট নিয়ে এনালাইসিস হবে এবং ব্লেইম দেয়া হবে আমাকে যে কেন আমি ভুল রিপোর্ট দিলাম!
তারপরেও মেয়েটা যায়না। রুমে বসে রইলো।
খানিক পর তাকে এবার বললাম-
- দেখেন যা করেছেন তা অনেক বড় একটা গুনাহ। এখন যদি এটার কারণে আপনার মৃত্যু হয়, তাইলে তো আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ারও সুযোগ পাবেন না। তাই বসে না থেকে দ্রুত ইমার্জেন্সিতে চলে যান প্লিজ।
এরপর সে খুব ধীরে ধীরে আমার রুম থেকে বের হয়ে গেল।
মেয়েটি একই সঙ্গে দুটো ভয়াবহ সংকটের মধ্যে আটকে গিয়েছিল- একটি শারীরিক, আরেকটি সামাজিক।
একদিকে ভয়- পরিবার জানলে কী হবে।
অন্যদিকে সামাজিক stigma।
তার ওপর নিজের সিদ্ধান্তের পরিণতির আতঙ্ক।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার শরীরের ভেতরে ঘটে চলেছে life-threatening internal bleeding।
কী ভয়ংকর এক অসহায়ত্ব!
সেদিন মেয়েটিকে দেখে অনুভব করছিলাম- একটি অবৈধ কাজ কিভাবে জীবনকে এক গভীর অন্ধকার খাদ আর উত্তাল সাগরের মাঝখানে দাঁড় করাতে পারে!
শেষ খবর পাওয়া অব্দি, মেয়েটা হাসপাতালে ভর্তি হয়। তার ইমার্জেন্সি অপারেশনও হয় এবং সে এখন শংকামুক্ত।
©️
পরিশেষে বলবো ইসলামিক অনুশাসন মেনে চলুন, একটা অবৈধ সম্পর্কের পরিণতি অত্যন্ত ভয়ানক! হয়তোবা এই মেয়েটির ইমারজেন্সি অপারেশন হওয়ায় মেয়েটি বেঁচে গিয়েছে কিন্তু সবার ক্ষেত্রে তেমন নাও হতে পারে ভয় সংশয় সব কিছুর কারণে দেখা গেল ঠিকমতো হসপিটালে না গেলে মাঝ রাস্তায় মেয়েটি মারাও যেতে পারতো। কেননা Rupture ectopic pregnancy রোগী খুব দ্রুত চলে যায় না ফেরার দেশে।
আমার কাছে ইতিপূর্বে এরকম কয়েকজন পেশেন্ট এসেছিলেন অবশ্য তারা বিবাহিত ছিলেন তাই যখন তাদের হাজবেন্ডকে জানানো হয় তারা ২ মিনিটও দেরি করেননি দ্রুত অপারেশনের ব্যবস্থা করেছেন এবং রোগীরা সুস্থ অবস্থায় বাসায় ফিরে গিয়েছেন। বিয়ে একটি সামাজিক বন্ধন, পারিবারিক বন্ধন। স্বামী ভাল নয় এমন মানুষ আমি কমই পেয়েছি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পেয়েছি স্বামীরা স্ত্রী দের প্রতি যথেষ্ট যত্নশীল, আমার এতো বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি এ কথা গুলো। অন্তত যে কোন মেয়ের অপারেশন এর সময় আমি দেখেছি যে তাদের প্রত্যেকের স্বামী কতোটা দ্বায়িত্ব পরায়ন।
তাই আবারো বলছি ইসলামিক অনুশাসন মেনে চলুন, কখনোই অবৈধ সম্পর্কের জড়াবেন না! জীবন তো একটাই এটাকে বি*ষাক্ত করে ফেলার কোন প্রয়োজন আছে কি?