24/07/2026
চিকিৎসা বিজ্ঞান কেবল রোগের উপশম নয়, এটি মানবদেহ ও প্রকৃতির এক নিগূঢ় সত্যকে অনুধাবন করার সাধনা। আর এই সাধনার দুর্গম পথে যখন একজন সত্যিকারের পথপ্রদর্শকের সন্ধান পাওয়া যায়, তখন একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর জীবনও অসামান্য আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।
আজ বিশ্ববিখ্যাত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক, এই যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা-বিজ্ঞানী এবং আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু প্রফেসর জর্জ ভিথুলকাস-এর জন্মদিন। এই শুভলগ্নে, তাঁর একজন অতি নগণ্য অথচ গর্বিত ছাত্র হিসেবে শ্রদ্ধা ও স্মৃতিরোমন্থনে হৃদয়ের কিছু কথা আজ না বললেই নয়।
ফিরে যাই ২০১৩-১৪ সালের দিনগুলোতে, যখন হোমিওপ্যাথির সাথে আমার পথচলার সূচনা। শুরু থেকেই এই শাস্ত্রের প্রতি আমার ভেতরে এক অদম্য অনুরাগ কাজ করত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সে সময় আমার অনেক সহপাঠীর চোখেমুখে আমি এক ধরনের গভীর হতাশা দেখেছি। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় অনেকেই তখন বিসিএস, ব্যাংকিং বা অন্যান্য সম্মানজনক সরকারি চাকরির পেছনে ছুটতে শুরু করেছেন। অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু আমাকেও সেই পথে হাঁটার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এমনকি, এক বন্ধু তো বিদ্রুপ করেই বলেছিলেন, আমি হোমিওপ্যাথির প্রতি যতই অনুরাগী হই না কেন, সর্বোচ্চ আমাদের কলেজের দু-একজন সফল চিকিৎসকের সমান হতে পারব, এর বেশি কিছু হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
সেদিন তাঁর কথায় আমি রাগ করিনি, বরং নীরবে নিজের লক্ষ্যে স্থির থেকেছি। আজ আমি সগর্বে অনুভব করি, প্রফেসর জর্জ ভিথুলকাস স্যারের মতো এক কিংবদন্তীর পরোক্ষ সান্নিধ্য ও শিক্ষা আমাকে হয়তো সেই সীমাবদ্ধতার গণ্ডি পেরিয়ে আরও বহুদূর যাওয়ার সাহস ও সক্ষমতা জুগিয়েছে।
ইন্টার্নশিপ শেষে যখন বাস্তব জীবনে প্র্যাকটিস শুরু করি, তখন এক চরম অন্তর্দ্বন্দ্বে পড়ি। আমাদের হোমিওপ্যাথির সংবিধান 'অর্গানন অফ মেডিসিন'-এর নিখুঁত তাত্ত্বিক আলোচনার সাথে বাস্তব চিকিৎসাক্ষেত্রের যেন এক বিস্তর ফারাক পাচ্ছিলাম, সমন্বয় করতে পারছিলাম না। অনেক রোগী সাময়িকভাবে উপশম পেলেও, রোগ যেন পুনরায় ফিরে আসত। এই ব্যর্থতা আমাকে গভীরভাবে হতাশ করে তুলত।
ঠিক সেই ঘোর অমানিশায় আমার জীবনে আলোকবর্তিকা হয়ে আসেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত ক্লাসিক্যাল হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক শ্রদ্ধেয় ডা. ধীমান রায় স্যার। তাঁর মাধ্যমেই আমি প্রথম মহাত্মা জর্জ ভিথুলকাস এবং তাঁর যুগান্তকারী দর্শনগুলোর সাথে পরিচিত হই।
ভিথুলকাস স্যারের কালজয়ী সৃষ্টি 'লেভেলস অফ হেলথ' (Levels of Health) এবং 'সায়েন্স অফ হোমিওপ্যাথি' (Science of Homeopathy)-এর নিগূঢ় জ্ঞান আমার চিন্তার জগৎকে আমূল পালটে দেয়। আমি যেন হোমিওপ্যাথিকে এক নতুন আলোয়, নতুন মাত্রায় চিনতে ও শিখতে শুরু করি।
আমাদের সমাজের একটি বড় অংশের (প্রায় ৯৫-৯৮%) বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যে, হোমিওপ্যাথি অত্যন্ত ধীরগতিতে কাজ করে এবং জটিল বা জরুরি অবস্থায় এটি একেবারেই অকার্যকর। এমনকি অনেক হোমিওপ্যাথি অনুরাগী পরিবারও ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা দীর্ঘস্থায়ী জটিল রোগের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত অ্যালোপ্যাথির ওপরই নির্ভর করেন। কিন্তু ভিথুলকাস স্যারের আদর্শ ও নিখাদ বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি অনুসরণ করে আজ আমি অত্যন্ত দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারি গুরুতর সংক্রামক ও ক্রনিক ব্যাধিও হোমিওপ্যাথিতে অত্যন্ত সফলভাবে নিরাময় করা সম্ভব। স্যারের 'লেভেলস অফ হেলথ' তত্ত্বটি আমাকে শিখিয়েছে কেন একজন রোগী আরোগ্য লাভ করেন না, এবং ঠিক কোন বৈজ্ঞানিক নিয়মে তাঁকে প্রকৃত আরোগ্যের পথে ফিরিয়ে আনতে হয়।
আমি অত্যন্ত গর্বের সাথে তাঁর আন্তর্জাতিক ই-লার্নিং কোর্সটি সম্পন্ন করেছি। আজ যদি এই কিংবদন্তী চিকিৎসকের অমূল্য জ্ঞান আমি না পেতাম, তবে হয়তো সাধারণ মানুষের মতো আমিও একসময় বিশ্বাস করতে শুরু করতাম যে, হোমিওপ্যাথি কেবলই একটি 'প্লাসিবো' বা নিছক মগজ ধোলাইয়ের কোনো চিকিৎসা। তিনি হোমিওপ্যাথির বিজ্ঞানভিত্তিক ভিত্তিকে সারা বিশ্বের সামনে যে অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরেছেন, তা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অমর অধ্যায় হয়ে থাকবে।
আজ এই মহান শিক্ষাগুরুর জন্মদিন। পরম করুণাময়ের কাছে আমার বিনীত প্রার্থনা, তিনি যেন মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও হোমিওপ্যাথির বৃহত্তর কল্যাণে প্রফেসর জর্জ ভিথুলকাস স্যারকে দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য দান করেন।
শ্রদ্ধাবনত,
ডা. মো. মহিউদ্দিন