04/02/2026
ইসলামের যে বার্তাটা মক্কাকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেছিল, কুরাইশদের যেটা একদমই সহ্য হচ্ছিল না—সেটা ছিল পরিবর্তনের বার্তা। আজও মুসলিমদের মধ্যে আমরা ঠিক সেই জায়গায় এসে দুইটা চরম অবস্থা দেখি। একদল আছে যারা শুধু নিয়ম নিয়েই পড়ে থাকে—দাড়ি কত লম্বা হবে, প্যান্ট কতটা উপরে থাকবে, কোন হেয়ারকাট জায়েয আর কোনটা না—এই খুঁটিনাটি তারা শেষহীনভাবে আলোচনা করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ন্যায়বিচার, চরিত্র, সততা, মানুষের হক—এই মৌলিক বিষয়গুলোর কোনো গুরুত্ব নেই। আরেকদল আছে ঠিক তার উল্টো, যারা বলে ইসলাম মানে শুধু নীতি আর মূল্যবোধ, নিয়মগুলোর কোনো দরকার নেই। অথচ কুরআন আমাদের এই দুই চরমতার কোনোটাই শেখায়নি।
আল্লাহ তাআলা কুরআন নাযিল করেছেন ২৩ বছরে। এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নাযিল হয়েছে মক্কায়, আর বাকি এক-তৃতীয়াংশ মদিনায়। মক্কার ইসলামের বার্তা আর মদিনার ইসলামের বার্তা বাস্তব প্রয়োগে একরকম ছিল না। মক্কায় ইসলাম মানে ছিল না কীভাবে পশু জবাই করতে হবে, হজ কীভাবে করতে হবে, রমজানে রোজা, পোশাকের নিয়ম বা উত্তরাধিকার আইন। টানা ১৩ বছর ধরে এই বিষয়গুলো ছিলই না। যদি কেউ মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করে হিজরার আগেই মারা যেত, তাহলে তার ইসলাম আজকের আমাদের চেনা ইসলামের মতো হতো না।
কুরআনের প্রতিটি সূরা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পূর্ণ বার্তা—এর শুরু আছে, মাঝখান আছে, শেষ আছে, আর একটা সম্পূর্ণ ধারণা আছে। ধরুন সূরা আর-রহমান। এতে আল্লাহর নেয়ামত, কিয়ামত, জাহান্নাম, জান্নাত—সবকিছুর কথা আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সূরা শুনে আল্লাহ মানুষকে কী পরিবর্তন করতে বলছেন? উত্তর একটাই—মীযান। ন্যায়বিচার। ওজনে কম দিও না, ন্যায়ের পাল্লা ঠিক রাখো, মানুষের হক নষ্ট করো না। এটা শুধু দোকানের ওজনের কথা না। কারো টাকা পাওনা থাকলে শোধ করা, কারো সম্পদ নষ্ট করলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া, অপরাধ হলে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা—সবই মীযানের অংশ। মীযান মানে জীবনের ভারসাম্য।
এই ন্যায়বিচারই মক্কাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। দাড়ি, পোশাক, নামাজ—এসব কারণে নয়। কুরাইশরা সহ্য করতে পারেনি এই ন্যায়বোধকে। কারণ এটা কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম না, এটা একটা সার্বজনীন নীতি। তুমি ডাক্তার হও, ব্যবসায়ী হও, ছাত্র হও, শাসক হও—এই নীতি সবার জন্য। নিয়ম সব সময় সবার জন্য প্রযোজ্য হয় না, কিন্তু নীতি সব সময়, সবার জন্য প্রযোজ্য।
এই নীতিগুলো মেনে চলা মানুষদের আল্লাহ কুরআনে বলেছেন ‘সাবিকুন’—আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী মানুষ। ভাবুন, তারা তখনো রোজা রাখে না, হজ করেনি, অনেক খাদ্য আইন জানে না, এমনকি তখনো মদ হারাম হয়নি—তবু তারা আল্লাহর সবচেয়ে কাছের বান্দা। আজ আমরা দেখি, ইউরোপ বা আমেরিকায় কেউ নামাজ পড়লে মানুষ বিরক্ত হয়। কিন্তু মক্কায় মানুষ কী দেখে ক্ষেপে গিয়েছিল? না দাড়ি, না পোশাক—সবাই একই রকম ছিল। তারা ক্ষেপেছিল ন্যায়ের কারণে।
এরপর মদিনায় এসে আল্লাহ নিয়ম নাযিল করলেন—ওজু, উত্তরাধিকার, তালাক, জাকাত, যুদ্ধের বিধান—সবকিছু স্পষ্ট করে দেওয়া হলো। কারণ তখন ভিত্তির ওপর ঘর তোলা হচ্ছিল। বিদায় হজে নবী ﷺ বললেন, “যে এখানে আছে, সে যেন যে নেই তাকে পৌঁছে দেয়—একটা আয়াত হলেও।” সেই বিশাল জনতার ৯৯ শতাংশই ছিল নতুন মুসলিম—কারো ইসলাম একদিনের, কারো এক সপ্তাহের। তারা কী প্রচার করবে? নিয়ম নয়—নীতি। কারণ কুরআনের এমন কোনো আয়াত নেই যেখানে নীতি নেই, কিন্তু অনেক আয়াত আছে যেখানে নিয়ম নেই।
নীতি হলো ভিত্তি, আর নিয়ম হলো তার ওপর দাঁড়ানো ঘর। ভিত্তি দুর্বল হলে তুমি যতই রং করো, জানালা লাগাও—সব ভেঙে পড়বে। আজ আমরা আবার সেই দুই চরমতায় ফিরে গেছি। একদল শুধু নিয়ম নিয়ে পড়ে থাকে, নীতি ভুলে যায়। আরেকদল নীতি নিয়ে কথা বলে, নিয়ম বাতিল করে দেয়। কুরআন বলছে—দুটোই দরকার, কিন্তু আগে ভিত্তি।
আজকের তরুণরা বলে, “সবকিছু হারাম, সব নিয়ম—আমি মুক্তি চাই।” ঠিকই তো। যদি শুরুতেই শুধু নিয়ম চাপানো হতো, কেউই মানত না। নীতি মানুষকে বিশ্বাস করায়, আর বিশ্বাস এলে নিয়ম আপনাতেই আসে। দাওয়াহ মানে নিয়ম নিয়ে তর্ক না, দাওয়াহ মানে নীতিগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কারণ নীতি ছাড়া নিয়ম মানে ভিত্তি ছাড়া ঘর। আল্লাহ আমাদের এমন একটি প্রজন্ম বানান, যারা মানুষকে আবার ইসলামের সেই মূল ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনে—যার ওপর এই সুন্দর দ্বীন দাঁড়িয়ে আছে।
(C)
নোমান আলী খান