10/09/2026
# #
কখনো কি চিন্তা করেছেন, আল্লাহ তাআলা কেন একথা বললেন না যে "প্রতিটি প্রাণীই মারা যাবে"? বরং তিনি বলেছেন, ”প্রতিটি প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে”।
মৃত্যু কি কোনো খাবার বা পানীয় যে, আমাদের তার স্বাদ নিতে হবে?
আমরা কোরআনের এই আয়াতটি প্রায়ই পড়ি। কিন্তু খুব কম মানুষই (ذَائِقَةُ) বা 'স্বাদ গ্রহণ' শব্দটিতে থেমে একটু গভীরভাবে চিন্তা করেন। আল্লাহ কেন সাধারণ ভাষায় 'আমরা মরে যাব' বা 'ধ্বংস হয়ে যাব' না বলে 'স্বাদ নেওয়া' শব্দটি বেছে নিলেন?
এর পেছনে এমন এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক রহস্য লুকিয়ে আছে, যা নিয়ে ভাবলে বাস্তবেই কলিজা কেঁপে ওঠে!
আপনি যখন কোনো খাবার মুখে দেন, তার স্বাদ কিন্তু এক সেকেন্ডেই গায়েব হয়ে যায় না। বরং তা আপনার পুরো অনুভূতিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং আপনি তা অনুভব করতে থাকেন।
আল্লাহ তাআলা এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন এটা বোঝানোর জন্য যে, মৃত্যু হঠাৎ করে নিভে যাওয়া বা 'সুইচ অফ' হয়ে যাওয়ার মতো কিছু নয়! এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া। ধীরে ধীরে রূহ টানা হতে থাকে এবং মানুষ তার প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে মৃত্যুর প্রতিটি মুহূর্তকে সজ্ঞানে 'উপলব্ধি' করে।
মানুষ তখন ফেরেশতা এবং অদৃশ্যের ওই জগত দেখতে শুরু করে, যা সে দুনিয়াতে ভুলে ছিল।
আল্লাহ বলেন,"আমি তোমার ওপর থেকে পর্দা সরিয়ে দিয়েছি, আজ তোমার দৃষ্টি বড়ই প্রখর!" (সূরা ক্বাফ: ২২)
রূহ একবারে বের হয় না; বরং পায়ের আঙুল থেকে বের হতে শুরু করে ধীরে ধীরে কণ্ঠনালিতে এসে পৌঁছায়।
কোরআনে বলা হয়েছে,
"কখনো নয়! যখন প্রাণবায়ু কণ্ঠনালিতে পৌঁছাবে... আর সে বুঝতে পারবে যে, এটাই বিদায়বেলা!"(সূরা কিয়ামাহ: ২৬-২৮)
যে মুহূর্তে রূহ শরীর ছেড়ে যায়, মানুষের চোখ তখন আসমানের দিকে সেটার পিছু নেয়।
যেমনটা নবীজি (সা.) বলেছেন: "নিশ্চয়ই রূহ যখন কবজ করা হয়, দৃষ্টি তখন তার পিছু নেয় (তাকিয়ে থাকে)।" (সহিহ মুসলিম)
কেন 'স্বাদ' শব্দটিই বেছে নেওয়া হলো?
আল্লাহ কেন বললেন না যে, প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুকে 'দেখবে' বা 'শুনবে'?
আপনি কোনো ভয়ংকর দৃশ্য দেখলে চোখ বন্ধ করতে পারেন, কটু শব্দ শুনলে কানে আঙুল দিতে পারেন, গরম কিছু ছুঁয়ে ফেললে হাত সরিয়ে নিতে পারেন।
কিন্তু 'স্বাদ'? মুখে কোনো কিছু চলে গেলে আর জিভে লাগলে, আপনি কিছুতেই তার স্বাদ থেকে পালাতে পারবেন না! সেই অভিজ্ঞতা আপনার 'ভেতরে' প্রবেশ করে এবং আপনার অস্তিত্বের অংশ হয়ে যায়।
মৃত্যু এমন কোনো ঘটনা নয় যা আপনি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখবেন। বরং মৃত্যু আপনার শিরা-উপশিরায়, কোষের ভেতরে ঢুকে যাবে। আপনি চান বা না চান, এর স্বাদ আপনাকে পেতেই হবে।
যেহেতু মৃত্যুকে 'আস্বাদন' করতে হবে, তাই নিশ্চিতভাবেই এর একটা স্বাদ আছে। খাবারের যেমন আলাদা স্বাদ থাকে, তেমনি আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক আর আমলের ওপর ভিত্তি করে মৃত্যুর স্বাদও একেকজনের জন্য একেক রকম হবে।
নবীজি (সা.) বলেছেন: "পানির পাত্র থেকে যেভাবে সহজে পানি গড়িয়ে পড়ে, মুমিনের রূহ ঠিক সেভাবেই সহজে বেরিয়ে আসে।" (মুসনাদে আহমাদ)
এটি এমন এক স্বাদ, যা প্রশান্তি আর জান্নাতের সুসংবাদে ভরপুর।
নবীজি (সা.) বলেছেন, "ভেজা পশমের ভেতর থেকে কাঁটাযুক্ত লোহার শিঁক যেভাবে টেনে বের করা হয়, (পাপীর) রূহকে ঠিক সেভাবেই টেনে-হিঁচড়ে বের করা হয়।" (মুসনাদে আহমাদ)
সারকথা হলো, মৃত্যু এমন এক পেয়ালা, যা সব মানুষের হাতে হাতে ঘুরছে। আমরা সবাই এই পেয়ালার পানীয় পান করব। তবে কেউ এর স্বাদ পাবে প্রশান্তি আর জান্নাতের সুবাসে, আর কেউ পাবে চরম ভয় আর আক্ষেপের তিক্ততায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সুন্দর মৃত্যু নসিব করুন। মৃত্যুকে আমাদের জন্য সমস্ত অকল্যাণ থেকে মুক্তির উপায় বানিয়ে দিন। আমিন।
Salman farsi
- উর্দূ থেকে অনূদিত