06/06/2022
৬ মাস থেকে ২৪ মাস বয়সী শিশুদের বিকাশের স্তরসমূহ বনাম সম্ভাব্য ঝুঁকি---
শিশুরা এই বয়সে সাধারণত ৪ টি মূল স্তরে শিশুরা বিকাশ লাভ করে থাকেঃ
১. বুদ্ধিমত্তার/জ্ঞানীয় বিকাশ (Cognitive Development): এটি বাচ্চাদের শিক্ষণ (Learning) স্তর। এ স্তরে বাচ্চারা তাদের চিন্তাশক্তির প্রয়োগ, সমস্যার সমাধান এবং স্মৃতিশক্তিকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষণ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়। বাবা, মা, পরিবারের আত্নীয়স্বজন, প্রতিবেশীর সাথে যোগাযোগ, সময় কাঁটানো, কথা বলা, তার প্রয়োজনগুলোর পূর্ণতা, তার নির্ভরতা ও স্বস্তি, নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা, বাব-মায়ের মধ্যে বোঝাপড়া ও সুস্থ সম্পর্ক, স্বাস্থ্যসম্মত জীবন-যাপন, খাদ্য ও পুষ্টির পরিপূর্ণতা ইত্যাদি বিষয়গুলো তার বুদ্ধিমত্তার বিকাশকে প্রভাবিত করে। উপরোক্ত বিষয়গুলো যতটা ভারসাম্যপূর্ণ, সমন্বিত ও সহজাত হবে শিশুর বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ততটাই উন্নত হবে।
২. ভাষাগত বিকাশ (Language Development): এই স্তরে শিশুরা প্রথমে আওয়াজ করে, তারপর শব্দ বলে এবং তারপর ধীরে ধীরে বাক্য গঠন করে মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে। যেমন- প্রথমে উ, আ, উম্ শব্দ করে আওয়াজ করে। ধীরে ধীরে এক অক্ষর বিশিষ্ট শব্দ যেমন, “মা” শব্দটি বলে এবং তারপরে দুই অক্ষর বা শব্দ বিশিষ্ট বাক্য যেমন, “ভাত খাবো”, “এটা দাও” বলে বাক্য গঠন করে।
৩. পেশীর সঞ্চালন (Motor Development): এটি হচ্ছে শিশুদের নড়াচড়া এবং সমন্বয় করার প্রক্রিয়া। এটা দুই অংশে অন্তর্ভূক্ত। সুক্ষ পেশীর সঞ্চালন এবং সামগ্রিক পেশীর সঞ্চালন।
ক. সুক্ষ পেশীর সঞ্চালন (Fine Motor Development): এক আঙ্গুল দিয়ে ধরার চেষ্টা করা কিংবা দুই আঙ্গুল দিয়ে কোনো কিছু ধরতে চাওয়া। তবে, কোনো কিছু ধরতে চেষ্টা করার শুরুর দিকে শিশুরা তাদের সবগুলো আঙ্গুল দিয়ে যেকোন জিনিস ধরতে চায় বা নড়াচড়া করে যেমন - কোনো জিনিস ধরা, ছেড়ে দেয়া, ফেলে দেয়া এবং কিছু কাজ করা যেমন-আঁকাআঁকি করা, লিখতে চেষ্টা করা ইত্যাদি ।
খ. সামগ্রীক পেশীর সঞ্চালন (Gross Motor Development): বড় পেশীর ব্যবহার করে কাজ করা যেমন-হাঁটা, খেলাধুলা করা, দৌঁড়ানো, লাফ দেয়া ইত্যাদি।
৪. সামাজিক-আবেগীয় বিকাশ (Social-Emotional development): যদিও এই বয়সের আগেই তারা তাদের কিছু অনুভ‚তি প্রকাশ করে থাকে, যেমন-- অস্বস্তি বা আরাম, আনন্দ বা দুঃখ প্রকাশ করে থাকে হাসি কিংবা কান্না করার মাধ্যমে। ৬ মাস বয়সের আগে শিশুর এ’ধরনের আচরণ অনেকটা প্রতিবর্ত ক্রিয়ার (Reflex Action) মতোই। তথাপিও, এ স্তরে (৬ মাস বয়স থেকে) শিশুদের আবেগের কিছুটা প্রস্তুতিমূলক বিকাশ ঘটতে থাকে যার মাধ্যমে তারা তাদের অনুভূতি প্রকাশ করে থাকে এবং নিয়ন্ত্রণ করারও ক্ষমতা অর্জন করতে থাকে। যেমন-রাগ, দু:খ, ভয়। অন্যদের সাথে সঠিকভাবে যোগাযোগ এবং ভাবের আদান প্রদান করার চেষ্টা করে, যেমন-বন্ধুত্ব তৈরী, বাবা মা এবং শিক্ষকদের সাথে শান্ত এবং ভদ্র আচরণ করা ও অন্যদের সামনে শান্ত এবং ভদ্র হয়ে থাকার চর্চা করা।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোন থেকে বলা যায় যে, শিশুদের মধ্যে যদি তাদের সামাজিক সম্পর্ক ও আবেগীয় যোগাযোগের কোনো লক্ষনীয় মাত্রার অস্বাভাবিকতা দেখা দেয় তাহলে অবশ্যই চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীর শরণাপন্ন হওয়া উচিত। ভাষাগত বিকাশ বাধাগ্রস্ত হলে অবশ্যই ৩ বছরের মধ্যে তা গভীরভাবে খেয়াল করা উচিত। এক্ষত্রে, বাবা-মা বা পরিবারের সদস্যরা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই অনেক বেশী দেরী করে চিকিৎসা নিতে আসেন--যেটি উচিত নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা মনে করেন যে, বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে। যদিও কিছু কিছু শিশুদের ক্ষেত্রে বড় হবার সাথে সাথে ঠিক হয়েও যায়, তবে সব শিশুর ক্ষেত্রে সেটি হয় না বলেই ঝুঁকি থেকে যায়। অতএব, ভাষাগত বিলম্বিত বিকাশের ক্ষেত্রে বুঝতে পারার শুরুতেই স্পীচ থেরাপিস্টের কাছে যাওয়া উচিত। তবে, অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের মধ্যে সম্পর্কের জটিলতা, কলহ-বিবাদ, শারিরীক প্রহার, বিবাহ-বিচ্ছেদ ইত্যাদি কারণেও শিশুদেও ভাষাগত বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত বা বাঁধাগ্রস্ত হয়। এরকম হলে অবশ্যই চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীর সাহায্য নেওয়া জরূরী।
মোহাম্মদ মিজানুর রহমান খান
চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী