15/03/2025
পিএমএস (PMS) বা প্রিমেন্সট্রুয়াল সিনড্রোম (Premenstrual Syndrome):
-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-
প্রতি মাসে মেন্সট্রুয়েশন বা পিরিয়ড শুরু হবার আগে আগে প্রায় সব নারীই কম-বেশি বিভিন্ন ধরনের লক্ষন বা উপসর্গ অনুভব করে থাকেন। এসকল শারীরিক, মানসিক এবং আচরণগত উপসর্গগুলোকে একত্রে প্রিমেন্সট্রুয়াল সিনড্রোম বলা হয়। সামান্য কিছু লক্ষণ একই রকম হলেও প্রত্যেক নারীর ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো আলাদ আলাদা এবং বিচিত্র। এমনকি একই নারীর প্রত্যেক মাসের লক্ষণগুলোও সবসময় একই রকম হয় না।
পিএমএস (PMS) কখন হয়ঃ
=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=
সাধারনত পিরিয়ড শুরু হবার ১ – ২ সপ্তাহ আগে থেকেই লক্ষনগুলো প্রকাশ পেতে থাকে। তবে শুরুর ঠিক ৭/৮ দিন আগে থেকে লক্ষনগুলোর তীব্রতা বেশি অনুভূত হয়। আবার পিরিয়ড শুরু হবার ৩-৪ দিন পরেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আপনা-আপনি ঠিক হয়ে যায়।
মানসিক এবং আচরনগত প্রিমেন্সট্রুয়াল সিনড্রোমসমূহঃ
=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-
• মুড সুইং – এটি সবচেয়ে বেশি কমন। হুটহাট করে মুড বা মেজাজের পরিবর্তন, অকারনেই হাসি, কান্না, রাগ; এক মুহূর্তে আনন্দ আবার পরমুহূর্তেই বিষাদ ইত্যাদি। এটি চাইলেও সব সময় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না,
• মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকা,
• হুট করে রেগে যাওয়া,
• মন খারাপ বা বিষাদগ্রস্ততা, কান্নাকাটি করা,
• অকারন অস্থিরতা,
• মানসিক অবসাদ, হতাশা,
• হুটহাট কোন একটি খাবারের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষন বা খুব খাওয়ার ইচ্ছে হওয়া, খাবারের রুচি এবং ক্ষুধার পরিবর্তন,
• যে কোন ব্যাপারে মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা, কাজের মান খারাপ হওয়া, কাজে ভুল হওয়া, যথাসময়ে কাজ শেষ করতে না পারা,
• মানুষজন এড়িয়ে চলতে চাওয়া বা একা থাকতে চাওয়া,
• শারীরিক সম্পর্কের আগ্রহে পরিবর্তন ইত্যাদি।
শারীরিক প্রিমেন্সট্রুয়াল সিনড্রোমসমূহঃ
-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=
• মাংসে বা গিঁটে ব্যথা,
• ঘুম কম হওয়া,
• শারীরিক অবসাদ বা ক্লান্তি,
• পেটে গ্যাস হওয়া এবং পেটে ব্যথা,
• কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া,
• মাথা ব্যথা,
• স্তনে ব্যথা,
• ব্রন বা একনি দেখা দেয়া ইত্যাদি।
পিএমএসের কারনঃ
-=-=-=-=-=-=-=-=-=-
• হরমোনালঃ
-------------------
এই সময়টায় নারীদেহে বিভিন্ন ধরনের হরমোনের রিয়েকশন, ইন্টারএকশনসহ খুব জটিল খেলা চলতে থাকে, এরাই মূলতঃ দায়ী। এর প্রভাব সামলাতে সকল নারীকেই হিমশিম খেতে হয়। তাই সারা জীবন জুড়ে প্রতি মাসে একই ঘটনা ঘটার পরেও এতে কেউ-ই পুরোপুরি অভ্যস্ত হতে পারে না, একে নিয়ন্ত্রনের কোন পদ্ধতিও কারো জানা নেই।
• রাসায়নিকঃ
--------------------
হরমোনাল প্রভাবের কারনে এই সময়ে নারীদের মস্তিষ্কেও বেশ কিছু রাসায়নিক পরিবর্তন হয়। এই দুই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে গিয়ে প্রতিটি নারীই নিরবে যুদ্ধ করে যান।
• পারিপার্শ্বিকঃ
----------------------
এই সময়টায় নারীদের কেউই বুঝতে চায় না। পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে সব খানেই মুখ বুজে তাদেরকে প্রতিদিনকার দায়িত্ব পালন করে যেতে হয়। এ সময়টায় সবাই একটু সহানুভূতি বা মানসিক সাপোর্ট আশা করে। সেটা তো তারা পানই না, উলটো তারা ঢং করছেন, নাটক করছেন, এক্সট্রা সুবিধা নিতে চাইছেন – এমন ধরনের চিন্তাধারার কারনে তারা আরো বেশি মানসিক চাপে থাকেন এবং সমস্যা হলেও কাউকে জানান না বা সাহায্য নিতে স্বাছন্দ্যবোধ করেন না। ফলে এর প্রভাব শরীরেও পড়ে।
সমাধানঃ
-=-=-=-=-
সাদা চোখে এর কোন সমাধান নেই। পরিমিত সুষম খাবার এবং ব্যয়ামের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমান বিশ্রাম নিতে হবে। পছন্দের গান শোনা, মুভি দেখা বা ঘুরতে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা এবং অফিস কলিগরা যদি এই সময় নারীকে একটু স্পেস দেন, মানসিকভাবে সাপোর্ট করেন এবং একটু বুঝে চলেন তাহলে এই অবদানটুকুই নারীর মনে অনেক বড় পজিটিভ প্রভাল ফেলতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে পিএমএস খুবই মারাত্মক আকার ধারন করে এবং তখন চিকিৎসকের পরামর্শই শ্রেয়। আশেপাশের অনেকেই বলবে এসব আবার এমন কি, সবারই তো হয়, আমাদের কি হয় নি, যত্তসব নাটক – কিন্তু এসব কানে তোলা যাবে না। পিএমএস মারাত্মক পর্যায়ে চলে গেলে সেটা খুবই ক্ষতিকর এবং এই অসুখকে প্রিমেন্সট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিজঅর্ডার (PMDD) নামে অভিহিত করা হয়। অবশ্যই এর চিকিৎসা প্রয়োজন।
উপসংহারঃ
-=-=-=-=-=-
প্রতিটি নারীর নিজেকে বুঝতে হবে। শরীর বিশ্রাম চাইলে তাকে বিশ্রাম দিতে হবে, মন আদর চাইলে তাকে আদর করতে হবে। আপনার খারাপ লাগা, ভাল লাগা নিকটজনদের সাথে ভাগাভাগি করে নিন। পরিবারের অন্যান্যরাও নারীদের একটু সহানুভূতির চোখে দেখুন। তারা সংকোচ করলেও আপনারা তাদের খবর নিন, কোন সাহায্য লাগলে এগিয়ে যান। নারী মানেই সব পারি, নারী মানেই সুপারওম্যান, ব্যাপারটা সবসময় এমন নয়। তাই এই নাজুক সময়ে তার প্রতি খেয়াল রাখুন।
ভাল রাখুন, ভাল থাকুন!
ডা. যোসেফা এলিজাবেথ
=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-