04/09/2026
গল্পের নাম: অচেনা ঠিকানায় মন (পর্ব ২)
হাতে সেই বেনামী চিঠিটা নিয়ে রফিক এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নূরু মিয়ার বড় ছেলে আরিফ শহরের একটা ছোট চাকরি করত। রফিকের কাছেই সে শেষবার এসে বলেছিল, "কাকু, বড় একটা বিপদে পড়েছি। শহরে টিকতে পারছি না। তবে আমি ঘুরে দাঁড়াবোই, মাকে বলো না যেন কোনো কষ্ট পায়।"
কিন্তু সেই ঘুরে দাঁড়ানো আর হলো না। গত মাসেই কাজের সূত্রে ঢাকা যাওয়ার পথে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে গেছে। আরিফের বন্ধুরা খবরটা গ্রামে পৌঁছাতে দেয়নি পাছে বৃদ্ধা মা পাগল হয়ে যান, কিন্তু এমন একটা চিঠি হঠাৎ কীভাবে এল? খামের ভেতর তাকাতেই রফিকের চোখ গেল ডাকটিকিটের ওপর—চিঠিটা তো গত মাসেই পোস্ট করা হয়েছিল, ঠিক মৃত্যুর দু'দিন আগে! হয়তো যাওয়ার আগে শেষবারের মতো মায়ের জন্য লিখে কোথাও ফেলে গিয়েছিল, যা আজ এসে পৌঁছাল পোস্টমাস্টারের হাতে।
সামনে বসা বৃদ্ধা রহিমা বেগম ততক্ষণে রফিকের মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন। কাঁপাকাঁপা গলায় তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, "বাবা রফিক, কিসের চিঠি গো ওইটা? আমার খোকার কোনো খবর আছে কি না একটু পড়ে শোনাও না বাবা! আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করছে।"
রফিকের গলা দিয়ে আর স্বর বের হচ্ছিল না। সত্যটা এত কঠিন, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি। এই বয়সে একমাত্র ছেলের মৃত্যুর খবর শুনলে মানুষটার বেঁচে থাকাটাই দায় হয়ে যাবে। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে কৃত্রিম একটা হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল। খামটা বুক পকেটে লুকিয়ে রেখে রফিক মিথ্যে সান্ত্বনার সুরে বলল, "না মা, ভয়ের কিছু নাই। আরিফ ভালো আছে। সে বলেছে পেটের দায়ে দূরে আছে ঠিকই, কিন্তু খুব শীঘ্রই টাকা পাঠাবে আর নিজে ছুটি নিয়ে বাড়ি আসবে।"
ছেলের কথা শুনে বৃদ্ধার মুখটা খুশিতে চকচক করে উঠল। তিনি দুই হাত তুলে রফিকের জন্য দোয়া করতে লাগলেন, "আল্লাহ তোমার ভালো করুক বাবা! আমার বুক খালি হোক আল্লাহ চায় না। আমার খোকা ঠিক চইলা আসবে।"
বৃদ্ধার এই বুকভরা আশা দেখে রফিকের বুকটা আরও বেশি দুমড়ে-মুচড়ে গেল। সে মিথ্যা বলে সান্ত্বনা দিল বটে, কিন্তু মনের ভেতর এক অদ্ভুত অপরাধবোধ তাকে কুড়ে কুড়ে খেতে লাগল। মিথ্যে কতদিন টিকবে? আর এই গোপন সত্য কি চিরকাল লুকিয়ে রাখা সম্ভব?
[চলবে... আগামী পর্বে দেখুন, রফিকের এই মিথ্যে কি শেষ পর্যন্ত টিকবে, নাকি অন্য কোনো মোড় নেবে এই গল্প?]