17/08/2026
আমার খুব কাছের এক বড়ভাই মারা গেলেন। উনার নাম সানাভাই। আসল নাম লুৎফুল কবির সানা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হতে এমবিবিএস পাস করেছেন।
মেডিকেলের হলে যখন ছিলাম, প্রায় সারাটাদিন উনার রুমেই কাটাতাম বলা যায়। একসাথে রাতে ঘুরতে বের হতাম। সারা পুরাতন ঢাকা ঘুরে পলাশী মোড়ে এসে পরোটা, সবজি আর ডিম দিয়ে বানানো 'চাইনিজ' নামের একটা খাদ্য খেয়ে হলে চলে আসতাম।
সানাভাইয়ের রুমে একটা পুরনো আমলের কম্পিউটার ছিল। সেই কম্পিউটার মনিটরকে তিনি টিভিতে রূপান্তর করেছিলেন। সেটায় আমরা টিভি দেখতাম অনেক রাত পর্যন্ত।
হ্যাঁ, সানা ভাইয়ের পাশ করতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। তিনি যখন পাস করেন, ততদিনের তাঁর ব্যাচমেটরা মেডিকেলের বিভিন্ন সাবজেক্টের এসিসট্যান্ট প্রফেসর পর্যন্ত হয়ে গিয়েছিলেন।
মানুষের জীবন লিনিয়ার চলে না সর্বদা। উত্থান-পতন থাকেই। সানাভাইয়ের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। মেডিকেলের একটা পরীক্ষা- 'ফার্স্ট প্রফ' পাস করার পর কোনো এক কারণে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন তিনি।
বিদেশ থেকে বহুদিন পর ফিরে এসে আবারও পড়াশোনায় মনোনিবেশ করলেন। প্রায় একবারেই সবগুলো পরীক্ষা পাস করে ডাক্তার হয়ে গেলেন। আর হবেননই বা কেন, তাঁর সময়ে দেশের সেরা ছাত্রদের একজন ছিলেন তিনি। ময়মনসিংহ বোর্ডস্ট্যান্ড করা ছাত্র, জীবনে কোনো পরীক্ষায় দ্বিতীয় হননি।
এরপরও ডাক্তার হতে এত দেরি হলো কেন তাঁর?
ওইযে বললাম, মানুষের জীবন সর্বদা লিনিয়ার চলে না। সবার জীবনে কিছু না কিছু বাঁক থাকে। কারও কারও জীবনের বাঁকগুলো একটু বেশিই জটিল। ফলে অন্যদের চাইতে তাঁদের পথটা আরও বেশি দুর্গম হয়ে ওঠে।
নিজের জীবন দিয়ে অন্যের জীবনকে জাজ করা যায় না কখনো।
যাইহোক, সানা ভাই পাস করে চলে গেলেন ময়মনসিংহের ওদিকে। প্রাক্টিস শুরু করে দিলেন। উনার কোনো পোস্টগ্রাজুয়েশন করা হলো না। ফলে উনি কোনো স্পেশালিস্ট হতে পারলেন না। বাংলাদেশের মেডিকেলের একটা সিস্টেম হলো- বয়স ৪৫+ হয়ে গেলে আর কোনো পোস্টগ্রাজুয়েশন পরীক্ষায় বসা যায় না। গেলে সানাভাইয়ের ওটাও আটকাত না, আমার বিশ্বাস।
ও হ্যাঁ, বলা হয়নি- ছাত্রাবস্থায়ই সানাভাই বিয়ে করেছিলেন। সেখানে ফুটফুটে এক মেয়ে আছে। জীবনের জটিল চক্রে পড়ে তাঁর স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল তাঁর। ফিরে এসে যখন আবার এমবিবিএস পড়া শুরু করলেন, তখন একদিন মেয়েকে দেখতে গিয়েছিলেন সানাভাই। জানি না, এই অপরাধেই কি না, তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী তাঁর নামে কি এক মামলা ঠুকে দিলেন। সে মামলায় জেলে গেলেন সানাভাই।
জানি না, কতটা অপরাধ করেছিলেন সানাভাই, কিংবা বিনা অপরাধেই প্রায় এক বছরের মতো জেলে চলে গেলেন তিনি।
এইসময়টা কেউ দেখতে যেত না তাঁকে। কেরানীগঞ্জের নির্জন জেলের শিক ধরে নিঝুম দুপুরে সানাভাই দূরে কোথায় যেন তাকিয়ে জীবনের হিসেব মেলাতেন, কিসব ভাবতেন, মাঝে মাঝে বিড়বিড় করতেন।
আজ হতে তিনদিন আগে সিভিয়ার অসুস্থ হয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হলেন তিনি।
তাঁর দুটো কিডনিই বিকল হয়ে গিয়েছিল, সাথে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস।
ডায়ালাইসিস চলাকালে কার্ডিয়াক এরেস্টে মারা গেলেন আমার সানাভাই।
বিশ্বাস করবেন কি না, জানি না- একসময়ের বাংলাদেশের সেরা ছাত্রদের একজন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা (একটু দেরিতে হলেও) আমাদের সানাভাই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটা বিছানাও পাননি থাকার জন্য। তাঁর স্থান হয়েছিল মেঝেতে।
মৃত্যুর আগে সানাভাই এভাবে আবারও দূরে কোথায় যেন তাকিয়েছিলেন, বহুদিন আগে ঠিক এভাবেই কারাগারের জানালার শিক ধরে যেমন করে তাকিয়েছিলেন দূরে, বহুদূরে...
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে- এভাবে দূরে কী দেখেন আমার সানাভাই, চোখে চোখে, অন্তরে অন্তরে কার সাথে কথা বলেন, কী বলেন আমার সানাভাই!
Dr Humayun Kabir
Dhaka Medical College