14/04/2026
কার্টুন আমাদের সন্তানদের যে ক্ষতিটা করছে.....
সম্মানিত অভিভাবক,
একবার কি গভীরভাব ভেবে দেখেছেন, আপনার আদরের সন্তানটি যখন কার্টুনের রঙিন পর্দার সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বুঁদ হয়ে থাকে, তখন আসলে কী ঘটছে? সে কি স্রেফ বিনোদন নিচ্ছে?
না, মোটেও না।
সে আসলে শিখছে। প্রতিটা সংলাপে, প্রতিটা অঙ্গভঙ্গিতে সে একটি জীবনদর্শন গ্রহণ করছে। তার কচি মনে গেঁথে যাচ্ছে হাজারো অদৃশ্য মূল্যবোধ। তিলে তিলে গঠিত হচ্ছে তার আগামীর চরিত্র।
এখন নিজেকে একটি কঠিন প্রশ্ন করুন, এই চারিত্রিক বীজটা বপন করছে কে? তার আদর্শ কি হওয়ার কথা ছিল কোনো কাল্পনিক সস্তা চরিত্র, নাকি ইতিহাসের সেই মহানায়কগণ? আপনার সন্তানের অবচেতন মনের কারিগর কি কোনো ভিনদেশি এনিমেশন স্টুডিও, নাকি আপনি নিজে?
🫵 একটু চোখ মেলে দেখুন: আমাদের সন্তানদের আমরা কী দিচ্ছি আর তারা কী শিখছে?
আমরা আমাদের ব্যস্ততাকে আড়াল করতে সন্তানের হাতে বিনোদনের যে ‘প্রেসক্রিপশন’ তুলে দিচ্ছি, তাতে আসলে উপকারের চেয়ে বিষক্রিয়াই বেশি ঘটছে। একটু গভীরে গিয়ে ভেবে দেখুন তো:
🌳 টারজান : বনের পশুদের মাঝে বড় হওয়া এক অর্ধনগ্ন চরিত্র। আমরা ভাবছি এটা অ্যাডভেঞ্চার, অথচ শিশুর কোমল মনে প্রথম ধাক্কাটা লাগছে তার লজ্জাবোধে। যে লজ্জা ইমানের অঙ্গ, টারজান সেই লজ্জাকেই সেকেলে বা অপ্রয়োজনীয় বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করছে।
🌳 সিন্ডারেলা : রাত বারোটায় বাড়ি ফেরা, সম্পূর্ণ অপরিচিত এক পুরুষের সাথে নাচগান করা, একে আমরা বলছি রূপকথা! ভাবুন তো, আপনার কিশোরী মেয়েটি যখন একদিন অবলীলায় বলবে, আমি সিন্ডারেলার মত হতে চাই, সিন্ডারেলাও তো বাইরে রাত কাটিয়েছে, তাতে সমস্যা কী? আপনার কাছে কি তখন কোনো উত্তর থাকবে? আমরাই কি তাকে এই আধুনিকতার বিষ গেলাচ্ছি না?
🌳 আলাদিন : আলাদিন একজন পেশাদার চোর, অথচ সে গল্পের হিরো! কেন? কারণ সে দেখতে সুন্দর আর রাজকুমারীকে ভালোবাসে। বার্তাটা খুব ভয়ানক, যদি তুমি সুদর্শন হও আর স্মার্ট হও, তবে তোমার অসততাও সমাজ হিরোইজম হিসেবে মেনে নিবে। তাছাড়া বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক তো আছেই।
🌳 ব্যাটম্যান: আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, ট্রাফিক সিগন্যাল ভেঙে দুরন্ত গতিতে গাড়ি চালানো, এগুলোই ব্যাটম্যানের পরিচয়। আপনার সন্তান কি এখান থেকে শিখছে না যে, যার ক্ষমতা আছে তার জন্য দেশের আইন আলাদা? সে কি নিয়মের চেয়ে শক্তিকে বড় করে দেখতে শিখছে না?
🌳 রোমিও-জুলিয়েট : প্রেমের ব্যর্থতায় আত্মহত্যাকে এখানে মহান হিসেবে দেখানো হয়। কৈশোরের এই সময়ে যখন আবেগ তুঙ্গে থাকে, তখন এই বিষাক্ত গল্পগুলো তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয় যে প্রেমে ব্যর্থ হলে মরে যাওয়াই শ্রেষ্ঠ পথ। একবার ভেবেছেন, কতগুলো কিশোর প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে স্রেফ এই কাল্পনিক রোমান্টিসিজমের জন্য?
🌳 হ্যারি পটার : কোটি কোটি শিশু হ্যারি পটারের জাদুকরী দুনিয়ার ভক্ত। অথচ কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট নির্দেশ হলো জাদুবিদ্যা কুফরি। জাদুর লাঠি দিয়ে সব সমাধান করে ফেলার এই ফ্যান্টাসি শিশুকে আল্লাহর ওপর ভরসা করার পরিবর্তে এক অলীক শক্তির পেছনে ছুটতে শেখাচ্ছে।
🌳 ডোরেমন : নোবিতা একজন চরম ফাঁকিবাজ, অলস, যে পরীক্ষায় কম পায় আর মিথ্যা বলে। কিন্তু ডোরেমন তার পকেট থেকে গ্যাজেট বের করে সব মুশকিল আসান করে দেয়। আপনার সন্তান এটি দেখে শিখছে, পরিশ্রম না করলেও চলে, কোনো না কোনো শর্টকাট বা ডোরেমন ঠিকই চলে আসবে।
🌳 টম অ্যান্ড জেরি ও মটু-পাটলু : একজন আরেকজনকে মারছে, ইলেকট্রিক শট দিচ্ছে, আকাশ থেকে ফেলে দিচ্ছে সবই চলছে হাসিমুখে। শিশু যখন বাস্তবেও কাউকে আঘাত করে, সে বুঝে উঠতেই পারে না যে এটি অপরাধ। কারণ কার্টুনে সে সহিংসতাকে কমেডি হিসেবে দেখে অভ্যস্ত হয়েছে।
🌳 স্পাইডারম্যান : স্পাইডারম্যান দেয়াল বেয়ে ওঠে, বহুতল ভবন থেকে লাফ দেয়। অবুঝ শিশু যখন নিজেকে 'স্পাইডারম্যান' ভাবতে শুরু করে, তখন সে বাস্তব জীবনের বিপদকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। অনেক শিশু এই হিরো সাজতে গিয়ে ছাদ বা জানলা থেকে লাফ দিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করতে পারে। এর চেয়ে বড় বিষয়, এখানে শেখানো হচ্ছে সুপারপাওয়ার থাকলেই আপনি হিরো, অথচ ইসলাম শেখায় চরিত্র আর তাকওয়াই হলো আসল সুপার পাওয়ার।
🌳 বেন টেন (Ben 10 ): একটি ঘড়ির মাধ্যমে বিভিন্ন দানব বা এলিয়েনে রূপান্তরিত হওয়া, এই ফ্যান্টাসি শিশুকে অদৃশ্য শক্তির ভুল ধারণা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এখানে এমন সব অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রদর্শন করা হয়, যা স্রষ্টার গুনাগুণের সাথে সাংঘর্ষিক। শিশু শিখছে যে, কোনো একটা যন্ত্র বা এলিয়েনই তার সমস্ত সমস্যার সমাধানকারী।
🌳 বার্বি (Barbie ): বার্বি শুধু একটা পুতুল নয়, এটি একটি লাইফস্টাইল। এটি মেয়ে শিশুদের শেখায়, সুন্দর হওয়া মানেই হলো ফর্সা হওয়া, স্লিম হওয়া আর দামী দামী মেকআপ-পোশাক পরা। এই বডি শেমিং আর উপভোগবাদ (Consumerism) শৈশব থেকেই তাদের মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করে। তারা নিজেদের স্বাভাবিক গড়ন নিয়ে অসন্তুষ্ট হতে শিখে।
🌳 সুপারম্যান : সুপারম্যানের ক্ষমতাকে এমনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় যে সে অমর, সে সবকিছু করতে পারে। এই 'গড-লাইক কমপ্লেক্স' শিশুদের মনে তাওহীদি চেতনার বদলে এক ধরনের শিরকি ধ্যান-ধারণার জন্ম দেয়। তারা মনে করে দুনিয়া বাঁচাতে কোনো একজন সুপারম্যান আসবে, অথচ রিজিকদাতা এবং রক্ষাকারী একমাত্র আল্লাহ।
আসলে তালিকার শেষ নেই। আমরা যেগুলোকে স্রেফ শৈশবের মজা বা রঙিন কার্টুন মনে করি, তার গভীরে ঢুকলে দেখা যায় সেগুলো আমাদের অজান্তেই শিশুদের মনস্তত্ত্বে এমন কিছু বীজ বুনে দিচ্ছে, যা আমাদের নৈতিকতা ও বিশ্বাসের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
🔍 আসলে দায়টা কার?
আমরা প্রায়ই আফসোস করি, ইদানীং বাচ্চারা কথা শোনে না কেন? সারাক্ষণ জেদ করে কেন? কেন তারা এত অলস?
আমরা দোষ দিই যুগকে, দোষ দিই সমাজকে। কিন্তু কখনো কি নিজের দিকে তাকিয়ে দেখেছি?
আসুন, একটু নির্মোহভাবে নিজেকে প্রশ্ন করি:
❓ট্যাবলেট কি শান্ত রাখার ওষুধ?
যখন আপনি নিজের ফোনে স্ক্রল করতে ব্যস্ত কিংবা ড্রয়িংরুমে বসে আড্ডায় মগ্ন, তখন বাচ্চা যেন বিরক্ত না করে সেজন্য আপনিই তার হাতে ডিজিটাল বিষ তুলে দিচ্ছেন। আপনি ভাবছেন সে শান্ত হয়ে আছে, আসলে তার মগজ তখন কার্টুনের রঙিন কাল্পনিক জগতে হাইজ্যাক হয়ে গেছে। আপনি তাকে সাময়িক শান্ত রাখতে গিয়ে তার দীর্ঘমেয়াদী চারিত্রিক বিনাশ ডেকে আনছেন।
❗অজুহাত যখন ব্যস্ততা:
সারা দিন কাজ করে ফিরি, একটু তো বিশ্রাম চাই! এই অজুহাতে আমরা কার্টুন চালিয়ে দিয়ে শিশুকে পর্দার সামনে বসিয়ে দেই। সম্মানিত অভিভাবক, আপনি যে কয়েক ঘণ্টা কার্টুনের বিনিময়ে বিশ্রাম কিনছেন, তার মূল্য হিসেবে আপনি আপনার সন্তানের নৈতিকতা আর লজ্জা বিসর্জন দিচ্ছেন। আপনি তাকে সময় দিচ্ছেন না বলেই সে পর্দার ভেতরের সেই ভিনদেশি সংস্কৃতিকে আপন করে নিচ্ছে।
__________
|| কার্টুনের ক্ষতি ||
পর্ব ০১
জাহিদ হাসান
#রৌদ্রময়ী