21/08/2026
আমাদের শিশুরা কি এমন একটি পরিবেশে বড় হচ্ছে, যা তাদের অসুস্থ করে তুলছে ?
প্রতিটি বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় চাওয়া সন্তান সুস্থ থাকুক, ভালোভাবে বেড়ে উঠুক, পড়াশোনা করুক, খেলাধুলা করুক এবং আনন্দে থাকুক। আমরা সন্তানের জন্য ভালো স্কুল খুঁজি, ভালো বই কিনে দিই, ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করি।
কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি আমাদের শিশুর চারপাশের পরিবেশটি আসলে কতটা স্বাস্থ্যকর?
একবার একটি স্কুলের আশেপাশে দাঁড়িয়ে একটু লক্ষ্য করলেই বিষয়টি বোঝা যায়। স্কুল ছুটির সময় বাচ্চাদের হাতে চিপস, বিস্কুট, কেক, চকলেট, কোমল পানীয়, ভাজাপোড়া কিংবা বিভিন্ন ধরনের ফাস্টফুড। স্কুলের গেটের আশেপাশে খাবারের দোকান, আর এসব খাবার শিশুদের কাছে খুব সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে, অনেক শিশুর খেলাধুলার সুযোগ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। স্কুল, কোচিং, পড়াশোনা শেষ করে বাড়ি ফিরে মোবাইল, ট্যাব, কম্পিউটার কিংবা টেলিভিশনের সামনে দীর্ঘ সময় কাটানো এখন অনেক শিশুর দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
অর্থাৎ একদিকে অস্বাস্থ্যকর খাবারের সহজলভ্যতা ।অন্যদিকে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার সুযোগ কমে যাওয়া।
জনস্বাস্থ্যের ভাষায় এমন পরিবেশকে বলা হয় obesogenic environment যে পরিবেশ মানুষকে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ এবং কম physical activity এর দিকে ঠেলে দেয় এবং obesity এর ঝুঁকি বাড়ায়।
শিশুদের obesity এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা
শিশু-কিশোরদের overweight ও obesity এখন আর কোনো একটি দেশের সমস্যা নয়। WHO এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে ৫–১৯ বছর বয়সী ৩৯ কোটিরও বেশি শিশু ও কিশোর Overweight ছিল এবং প্রায় ১৬ কোটি Obesity নিয়ে বসবাস করছিল।
কয়েক দশকের মধ্যেই এই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে।
বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।
আমাদের দেশে অপুষ্টি এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। কিন্তু তার পাশাপাশি বিশেষ করে শহরাঞ্চলে শিশু-কিশোরদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও Obesity ও ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠছে।
অতিরিক্ত ওজন (Obesity) শুধু শারীরিক গঠনের বিষয় নয় ; এর সঙ্গে বাড়ছে ভবিষ্যতে Diabetes, Hypertension, Fatty liver এর মতো ঝুঁকিও।
বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক অল্প বয়সীদের ভিতরেও ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচা্ ফ্যাটি লিভার, কোলেস্টেরলের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এর মূল কারণ হচ্ছে হবে স্থুলতা (Obesity)।
আর এই Obesity এর কারন হচ্ছে ; খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, processed ও ultra-processed food এর সহজলভ্যতা, মিষ্টি পানীয়, sedentary lifestyle, screen time এবং physical activity।
আজকের শিশুদের খাবারে আমরা একটি বড় পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি।বাড়ির তৈরি স্বাভাবিক খাবারের পরিবর্তে processed, ultra-processed এবং refined food আমাদের খাদ্যতালিকায় বেশি জায়গা করে নিচ্ছে।
চিপস, বিভিন্ন packaged snacks, biscuits, cakes, confectionery, sugary drinks এবং নানা ধরনের Ready to eat খাবার এখন শিশুদের কাছে খুব সহজলভ্য। এর পাশাপাশি refined flour, refined grains, অতিরিক্ত চিনি ও লবণযুক্ত খাবারের ব্যবহারও বেড়েছে।
এসব খাবারের সমস্যা শুধু ক্যালরি বেশি হওয়া নয়। অনেক ক্ষেত্রে এগুলোতে added sugar, sodium, saturated fat ইত্যাদি বেশি থাকতে পারে এবং শিশুর খাদ্যতালিকায় স্বাভাবিক ও পুষ্টিকর খাবারের জায়গা কমিয়ে দিতে পারে।
তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত অতিরিক্ত processed, ultra-processed এবং refined food এর ব্যবহার কমানো এবং তার পরিবর্তে whole ও minimally processed খাবারকে শিশুর খাদ্যতালিকার ভিত্তি করা।
আমাদের ঘরের পরিচিত খাবার—ভাত, রুটি, ডাল, মাছ, ডিম, শাকসবজি, ফল, ছোলা, বাদাম; এসব দিয়েই একটি শিশুর স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।
অর্থাৎ প্রশ্ন শুধু বাচ্চা কতটুকু খাচ্ছে? প্রশ্ন হওয়া উচিত;“বাচ্চা প্রতিদিন কী ধরনের খাবার খাচ্ছে?”
আর শিশুর খাবারের শুরু কিন্তু বাড়ি থেকেই;
শুধু স্কুলের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। শিশুর খাদ্যাভ্যাসের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ হলো তার নিজের বাড়ি।
শিশু বাসায় কী খাচ্ছে সেটিও আমাদের দেখতে হবে।
বাবা-মায়ের ব্যস্ততা, কর্মজীবনের চাপ কিংবা সময়ের অভাবে অনেক সময় packaged food বা fast food শিশুর নিয়মিত খাবারের অংশ হয়ে যায়।
তাই সম্ভব হলে বাবা-মায়ের উচিত বাড়িতে তৈরি খাবার দিয়ে শিশুর টিফিন তৈরি করা এবং সেই টিফিনে যেন স্বাস্থ্যকর ও বৈচিত্র্যময় খাবার থাকে, সেদিকে নজর দেওয়া।
স্বাস্থ্যকর টিফিন মানেই দামি বা বিদেশি খাবার নয়। ডিম, রুটি, চিঁড়া, ছোলা, ডাল, সবজি, মৌসুমি ফল, বাদাম—আমাদের পরিচিত খাবার দিয়েই ভালো টিফিন তৈরি করা যায়।
কারণ শিশুর খাবারের অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই তৈরি হয়।
বাড়িতে স্বাস্থ্যকর খাবার যত বেশি স্বাভাবিক হবে, শিশুর কাছেও স্বাস্থ্যকর খাবার তত বেশি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।
অন্য দেশের উদ্যোগ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাঃ
এই সমস্যার গুরুত্ব বুঝে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ স্কুলের food environment নিয়ে কাজ করছে।
ভারতের Food Safety and Standards Authority of India (FSSAI) স্কুলের খাবারে High Fat, Sugar and Salt বা HFSS food নিয়ে নীতিমালা তৈরির দিকে এগিয়েছে। স্কুলের ক্যান্টিনে এসব খাবারের availability এবং শিশুদের সামনে অস্বাস্থ্যকর খাবারের exposure কমানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এমনকি নির্দিষ্ট fat, sugar ও salt এর মাত্রার ভিত্তিতে খাবারকে চিহ্নিত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
এটি আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
শিশুকে শুধু স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিতে বললেই হবে না; তার সামনে কোন খাবার সহজে পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র school meal এ added sugar ও sodium কমানোর জন্য নতুন nutritional standards চালু করছে।
জাপানে school lunch শুধু খাবার নয়; এটি food and nutrition education এরও একটি অংশ।
ফিনল্যান্ডে বহু দশক ধরে শিশুদের জন্য free school meal এর ব্যবস্থা রয়েছে।
অর্থাৎ দেশগুলো ভিন্ন হলেও চিন্তাটি একই;শিশুর স্বাস্থ্য শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়; স্কুল ও সমাজের পরিবেশও এর অংশ।
কিন্তু খাবারের পাশাপাশি আরেকটি বড় প্রশ্ন; শিশুরা খেলবে কোথায়? Childhood obesity নিয়ে কথা বললে শুধু খাবারের কথা বললে হবে না। একটি শিশুর সুস্থ বেড়ে ওঠার জন্য physical activity অপরিহার্য।
কিন্তু আমাদের শহরগুলোতে খেলার মাঠের সংখ্যা কমছে। অনেক শিশুর বিকেল কাটছে কোচিং, পড়াশোনা কিংবা screen-এর সামনে।
আমরা শিশুকে বলি; খেলাধুলা করো কিন্তু তাকে খেলার জায়গা দিচ্ছি তো?
একটি শিশুর স্বাভাবিক দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা ও physical activity-এর সুযোগ কেড়ে নিয়ে শুধু তাকে বেশি বেশি ব্যায়াম কর , খেলাধুলা কর বলাটা খুব একটা বাস্তবসম্মত নয়।
এই প্রেক্ষিতে আমাদের করণীয় কি ?
আমাদের এখন শুধু সান্তান কী খাবে তা নয়, সান্তান যে পরিবেশের মধ্যে বড় হচ্ছে সেটি নিয়েও ভাবতে হবে। স্কুলের ক্যান্টিনে কী বিক্রি হবে? স্কুলের গেটের সামনে কী ধরনের খাবার সহজলভ্য থাকবে?
বাড়িতে শিশু কী খাচ্ছে? বাবা-মা কি সম্ভব হলে বাড়িতে তৈরি স্বাস্থ্যকর টিফিন দিচ্ছেন?
শিশু প্রতিদিন কতটা physical activity করছে? আর তার খেলাধুলার জন্য নিরাপদ মাঠ আছে কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে বিবেচনা করলেই আমরা childhood obesity এর সমস্যাটাকে ভালোভাবে বুঝতে পারব।
শেষ কথা;
আমরা প্রায়ই সন্তানকে বলি “চিপস খেও না,ফাস্টফুড কম খাও,মোবাইল কম দেখো,খেলাধুলা করো”।
কিন্তু শিশুর চারপাশের পরিবেশ যদি তাকে প্রতিদিন উল্টো দিকে ঠেলে দেয়, তাহলে শুধু বাচ্চাকে দোষ দিয়ে লাভ কী? আমাদের পরিবেশটাকেও বদলাতে হবে।
এই পরিবর্তন শুরু হতে পারে নিজের বাড়ি থেকেই; বাড়িতে স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস তৈরি করা, সম্ভব হলে ঘরে তৈরি পুষ্টিকর টিফিন দেওয়া এবং শিশুর খাবারের দিকে নজর রাখা।
এর পাশাপাশি দরকার স্বাস্থ্যকর স্কুল ক্যান্টিন, স্কুলের আশেপাশে স্বাস্থ্যকর food environment, নিরাপদ খেলার মাঠ এবং নিয়মিত physical activity-এর সুযোগ।
কারণ একটি শিশুর স্বাস্থ্য শুধু তার বাড়ির রান্নাঘরে তৈরি হয় না।
তার স্বাস্থ্য তৈরি হয় বাড়ি, স্কুল, ক্যান্টিন, স্কুলের আশেপাশের খাবারের পরিবেশ, খেলার মাঠ এবং পুরো সমাজের lifestyle এর মধ্যে।
আজকের শিশুরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ।সুস্থ শিশু তৈরি করতে একটি ভালো পরিবেশও দরকার।
তাই এখনই আমাদের ভাবতে হবে;
আমাদের শিশুরা কী খাচ্ছে, কোথায় খাচ্ছে, কীভাবে জীবন কাটাচ্ছে এবং আমরা তাদের জন্য কেমন ভবিষ্যৎ তৈরি করছি?