14/08/2026
#কর্পোরেট ডায়েরি-১:
সকাল ৯টায় অফিসে বায়োমেট্রিক পাঞ্চ করতেই হবে, নয়তো ওই কর্মীর এক ঘণ্টার বেতন কাটা। কর্পোরেট নিয়ম এমনই হয়ে থাকে সচরাচর।
আজ ঠিক ৯.১৬ মিনিটের সময় আমার অফিসের এক কলিগ হাঁপাতে হাঁপাতে রুমে ঢুকলেন। বয়স আনুমানিক ২৭-২৮। মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না, হাফাতে হাফাতে কোনোমতে বললেন—
"স্যার, আজ সকালের এক ঘণ্টার স্যালারি বাঁচানোর জন্য বাসা থেকে তিন ঘণ্টা আগে বের হয়েছিলাম, তাও রক্ষা করতে পারলাম না। যদি আজকের দিনটা একটু কনসিডার করতেন স্যার..."
আমি একটু গম্ভীর গলায় জানতে চেয়ে চেয়েছিলাম—
“কেন এমন লেট হলো?”
তিনি বললেন—
"স্যার, উত্তরা থেকে কাকলী পর্যন্ত আসার পর মানিব্যাগে আর এক টাকাও ছিল না। কাকলী থেকে গুলশান-১ পর্যন্ত হেঁটে হেঁটে এসেছি, আর বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল..."
আমি কিছুটা বিরক্ত হয়েই বললাম—
“প্রতিমাসের বেতন থেকে যাতায়াত বা ট্রাভেল অ্যালাউন্সটা আলাদা করে রাখবেন তো!
তিনি চোখ নিচু করে বললেন—
"স্যার, স্যালারি থেকে ট্রাভেল অ্যালাউন্স আলাদা করার আগে আমাকে বেতনের টাকাটা আরও পাঁচটা ভাগে ভাগ করতে হয়, যা ট্রাভেল অ্যালাউঞ্জের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যাতায়াতের জন্য টাকা হয়তো ম্যানেজ করা যায় স্যার, কিন্তু ওই পাঁচটা ভাগে ভাগ না করলে তো আমার পুরো পরিবারটাই অনক কষ্ট ভোগ করে যাবে।"
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম—“কী সেই পাঁচটা ভাগ?”
তিনি একটু থেমে, চোখ ভিজিয়ে বললেন—
১. সবার আগে মাথার ওপর ছাদটুকু টিকিয়ে রাখতে বাসা ভাড়া ও সার্ভিস চার্জ দিতে হয়।
২. বয়সের ভারে ন্যুব্জ বাবা-মায়ের নিয়মিত ওষুধ আর ডাক্তারের ফি মেটাতে হয়।
৩. সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে থাকা মা-বাবার হাতখরচ আলাদা রাখতে হয়।
৪. ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হয়।
৫. আর শেষ অংশে থাকে মাসের কোনো এক সন্ধ্যায় ছোট ভাই-বোনের বা পরিবারের মুখের একটু হাসি ফোটানোর সামান্য কিছু আয়োজন।
তারপর থামলেন তিনি। আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। সবচেয়ে মর্মান্তিক ও বাস্তব সত্য হলো—এই পুরো হিসাবের কোথাও নিজের জন্য এক বিন্দুও কিছু থাকে না। নিজের শরীরের যত্ন, নতুন একটা শার্ট বা নিজের ছোট্ট কোনো ইচ্ছে—সবকিছুই এই ৫টি ভাগের নিচে চাপা পড়ে চিরতরে মরে যায়।
প্রথমে মনে হয়েছিল—অন্য অনেকের মতো এও হয়তো কোনো বাঁধাধরা অজুহাত দিচ্ছে। কিন্তু আমার নিজের বিবেক আমাকে একটা মুহূর্তের জন্যও শান্ত থাকতে দেয়নি। বিবেক বারবার বলছিল—কোনো মানুষ কি শখে নিজের ঘাম ঝরানো বেতন কাটা পড়তে দিতে চায়? বিশেষ করে সেই ছেলেটি, যার চোখে-মুখে কেবলই সংসারের ভারী দায়িত্বের ছাপ।
নিজের চাকরি আর ব্যবসার সুবাদে আমি প্রতিনিয়ত এমন অনেক মানুষের মুখোমুখি হই। কত তরুণের সাথে একান্তে কথা বলি, তাদের চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করি। তখন খুব কাছে থেকে দেখতে পাই, একটা মানুষ ভেতরে ভেতরে ঠিক কতটা ভেঙে পড়লে বাইরে এমন পাথর হয়ে বেঁচে থাকতে পারে।
আজকের অভিজ্ঞতা থেকে একটি কথাই বলব:
আমরা যারা ব্যবসা বা চাকরি করছি—যেখান থেকে মানুষের এই নির্মম বাস্তবতাকে খুব কাছ থেকে রিড করার সুযোগ আছে, দয়া করে কেউ আর শুধু নিয়মের চাবুক দিয়ে মানুষকে মাপবেন না। যে মানুষগুলোর মুখোমুখি আমরা প্রতিদিন দাঁড়াই, তারা কোনো ফাইলের পাতা নয়—রক্ত-মাংসের তৈরি একেকটি জীবন্ত মানুষ।
পরিবার টিকিয়ে রাখতে প্রতিদিন যুদ্ধ করা এই সকল ফ্যামিলি ফাইটারদের প্রতি আমাদের সবার সর্বোচ্চ সম্মান, সহানুভূতি এবং সহমর্মিতা থাকা উচিত। আসুন, যার যার জায়গা থেকে মানুষগুলোকে আরেকটু মানবিকভাবে রিড করতে শিখি।