20/04/2026
স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া - দুইজনের মধ্যে থেকে একজন চুপ থাকলেই শয়তান হেরে যায়.......
দাম্পত্য জীবন আল্লাহ তাআলার এক অপূর্ব নিয়ামত। দুটি ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন পরিবেশে বড় হয়ে একই ছাদের নিচে বসবাস করে —
তাই মতভেদ বা মনোমালিন্য হওয়া একেবারে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই ছোট্ট ছোট্ট মতভেদ যখন বড় ঝগড়ায় পরিণত হয়, তখন যে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায় — সে হলো শয়তান।
🟦 শয়তানের সবচেয়ে বড় আনন্দ
সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
> *"ইবলিস তার সিংহাসন পানির উপর স্থাপন করে, তারপর সে তার বাহিনী পাঠায়। তাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সে, যে সবচেয়ে বড় ফিতনা ঘটাতে পারে। একজন এসে বলে, আমি এই এই করেছি। ইবলিস বলে, তুমি কিছুই করোনি। তারপর আরেকজন আসে এবং বলে, আমি একজন স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে ছেড়েছি। তখন ইবলিস তাকে কাছে টেনে নেয় এবং বলে — হ্যাঁ, তুমিই সেরা!"*
> — (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৮১৩)
এই হাদিসটি আমাদের সামনে এক ভয়াবহ সত্য উন্মোচন করে। শয়তানের দরবারে সবচেয়ে বড় পুরস্কার পায় সে, যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ফাটল ধরাতে পারে। তার মানে প্রতিটি দাম্পত্য কলহ শয়তানের একটি মিশন সফল হওয়ার মতো।
🟦 স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কুরআনের দৃষ্টিতে
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সূরা রূমের ২১ নম্বর আয়াতে বলেছেন —
> "আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।"
> — (সূরা রূম, আয়াত ২১)
এই আয়াতে আল্লাহ তিনটি শব্দ ব্যবহার করেছেন — সাকিনাহ (প্রশান্তি), মাওয়াদ্দাহ (ভালোবাসা) এবং রাহমাহ (দয়া)। দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি হলো এই তিনটি স্তম্ভ। যখন ঝগড়া হয়, তখন এই তিনটিরই ক্ষতি হয়। আর শয়তান ঠিক এখানেই আঘাত করে।
🟦 রাগের সময় চুপ থাকা — একটি নবীজির শিক্ষা
একবার এক সাহাবি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে বললেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাকে কিছু উপদেশ দিন।" রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন —
> "রাগ করো না।"
সাহাবি বারবার জিজ্ঞেস করলেন। প্রতিবারই রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন —
> "লা তাগদাব — রাগ করো না।"
> — (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬১১৬)
এই হাদিসটির গভীরতা অসাধারণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ হাজারো উপদেশ দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি বারবার একটিই কথা বললেন — রাগ নিয়ন্ত্রণ করো। কারণ রাগ হলো শয়তানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরো বলেছেন —
> "রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে আসে এবং শয়তান আগুন দিয়ে তৈরি। আগুন পানি দিয়ে নেভানো হয়। তাই তোমাদের কেউ যখন রাগান্বিত হয়, সে যেন অজু করে।"
> — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৭৮৪)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, রাগের উৎস শয়তান। স্বামী বা স্ত্রী যখন রাগের মাথায় কথা বলেন, তখন আসলে শয়তানই তাদের মুখ দিয়ে কথা বলায়।
🟦 একজন রাগলে অপরজনের চুপ থাকা — বাস্তব জীবনের সমাধান
এটি শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়, এটি মানব মনোবিজ্ঞানেরও একটি প্রমাণিত সত্য। যখন দুজন একসাথে রাগ করে কথা বলে, তখন কথার মাত্রা বাড়তেই থাকে। একজন দশ কথা বললে অপরজন বিশ কথা বলে। এভাবে যা শুরু হয় ছোট একটি বিষয় নিয়ে, তা শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় বড় ক্ষত হিসেবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন —
> "যখন তোমাদের কেউ রাগান্বিত হয় এবং সে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন সে যেন বসে পড়ে। রাগ চলে গেলে ভালো, না গেলে শুয়ে পড়ুক।"
> — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৭৮২)
এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ শারীরিক অবস্থান পরিবর্তনের কথা বলেছেন, কারণ শরীরের ভঙ্গি মনের অবস্থাকে প্রভাবিত করে। দাঁড়িয়ে থাকলে রাগ বাড়ে, বসলে কমে, শুলে আরো কমে। এটি একটি বাস্তব সমাধান।
তাহলে দাম্পত্য কলহে এই শিক্ষার প্রয়োগ হবে এভাবে — স্ত্রী যদি রেগে যায়, স্বামী চুপ থাকবেন। স্বামী যদি রেগে যায়, স্ত্রী চুপ থাকবেন। দুজন একসাথে রাগলে শয়তানের মিশন সফল। একজন চুপ থাকলে শয়তান হেরে যায়।
🟦 কুরআনে ক্রোধ দমনের প্রশংসা
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে সূরা আলে ইমরানের ১৩৪ নম্বর আয়াতে বলেছেন —
> "যারা সুখে ও দুঃখে ব্যয় করে, রাগকে সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।"
> — (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৪)
এই আয়াতে "আল-কাজিমিনাল গাইজ" — অর্থাৎ "যারা ক্রোধকে গলাধঃকরণ করে" তাদের প্রশংসা করা হয়েছে। ক্রোধ চেপে রাখা মানে দুর্বলতা নয়, বরং এটি সত্যিকারের শক্তির প্রমাণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন —
> "সেই ব্যক্তি প্রকৃত শক্তিশালী নয়, যে কুস্তি লড়াইয়ে মানুষকে হারায়। বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।"
> — (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬১১৪)
🟦 স্ত্রীর সাথে উত্তম আচরণ — স্বামীর দায়িত্ব
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন —
> "তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।"
> — (সূরা নিসা, আয়াত ১৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন —
> "নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কারণ তোমরা তাদের আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ।"
> — (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১২১৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরো বলেছেন —
> তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।"
> — (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৩৮৯৫)
একজন স্বামী যদি ঘরে রাগী ও কঠোর হন, আর বাইরে নরম ও ভদ্র — তাহলে তিনি নবীজির শিক্ষার বিপরীতে চলছেন। পরিবারের কাছেই মানুষের আসল চরিত্র প্রকাশ পায়।
🟦 স্বামীর সাথে উত্তম আচরণ — স্ত্রীর দায়িত্ব
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন —
> *"যদি কোনো স্ত্রী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজানে রোজা রাখে, তার লজ্জাস্থান হেফাজত করে এবং তার স্বামীর আনুগত্য করে — তাহলে তাকে বলা হবে, জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করো।"*
> — (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৬৬৪)
এখানে আনুগত্য মানে অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার মনোভাব। স্ত্রীর পক্ষ থেকে যদি সম্মান আসে এবং স্বামীর পক্ষ থেকে যদি দয়া আসে — তাহলে সংসারে শান্তি বজায় থাকে।
🟦 শয়তানকে পরাজিত করার পথ
শয়তান চায় স্বামী-স্ত্রী একে অপরের শত্রু হয়ে যাক। কিন্তু আল্লাহ বলেছেন —
> *"হে মুমিনগণ! শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।"*
> — (সূরা নূর, আয়াত ২১)
শয়তানকে পরাজিত করতে হলে —
প্রথমত, রাগের মুহূর্তে "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়তে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যদি রাগ হয় এবং এই দোয়া পড়া হয়, তাহলে রাগ চলে যাবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩২৮২)
দ্বিতীয়ত, একজন রাগলে অপরজন নীরব থাকবেন। এটি দুর্বলতা নয়, এটি জ্ঞানীর কাজ।
তৃতীয়ত, ঝগড়ার মাঝে সন্তানদের সামনে কখনো কুৎসিত কথা বলা যাবে না, কারণ তা পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
চতুর্থত, মতবিরোধ হলে আলোচনা করতে হবে, কিন্তু শান্ত হয়ে। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন — *"তোমাদের মধ্যে যদি কোনো বিষয়ে মতবিরোধ হয়, তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও।"* (সূরা নিসা, আয়াত ৫৯)
🟦 বাস্তব জীবনের একটি দৃশ্য
ধরুন, স্বামী বাইরে থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরলেন। স্ত্রী সারাদিন সংসার সামলে অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁরও মন খারাপ। ছোট একটি কথায় স্ত্রী রেগে গেলেন। এই মুহূর্তে স্বামী যদি পাল্টা রাগ করেন — শয়তান হাততালি দেয়। কিন্তু স্বামী যদি চুপ থেকে বলেন, "আচ্ছা, তুমি একটু শান্ত হও, আমরা পরে কথা বলব" — তাহলে শয়তান পরাজিত হয়।
একইভাবে, স্বামী যদি রাগান্বিত হন, আর স্ত্রী যদি পাল্টা কথা না বলে একটু সরে যান, নামাজ পড়েন বা দোয়া করেন — তাহলে ঝগড়া আর বাড়ে না।
এই ছোট্ট কাজটিই শয়তানের সবচেয়ে বড় শত্রু।
🟦 দাম্পত্য জীবন একটি পরীক্ষার জায়গা। আল্লাহ এই সম্পর্ককে "মিসাকান গালিজা" — একটি মজবুত চুক্তি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন (সূরা নিসা, আয়াত ২১)। এই চুক্তি রক্ষা করা প্রতিটি মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব।
যে দম্পতি রাগের মুহূর্তে ধৈর্য ধরেন, শয়তানকে সুযোগ দেন না, একে অপরকে ক্ষমা করেন — তারাই জান্নাতে পাশাপাশি থাকার যোগ্যতা অর্জন করেন। কারণ আল্লাহ বলেছেন —
> "মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু।"
> — (সূরা তাওবা, আয়াত ৭১)
তাই আসুন, শয়তানকে পরাজিত করি — ঘরে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে, রাগকে দমন করে এবং ভালোবাসার সংসার গড়ে।
আল্লাহ আমাদের সকলের দাম্পত্য জীবনে শান্তি, বরকত ও ভালোবাসা দান করুন। ( আমিন )