15/07/2026
আমরা কি একটি নীরব স্বাস্থ্য সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?
একটি দৃশ্যপট কল্পনা করুন। প্রতিদিন সকালে আমরা আমাদের প্রিয় সন্তানের মুখে যে খাবারটি তুলে দিচ্ছি, পরম মমতায় যে দুপুরের আহার সম্পন্ন করছি, কিংবা সামান্য শারীরিক অসুস্থতায় যে ওষুধটি সেবন করছি—তা কি আসলেই আমাদের জীবন রক্ষা করছে, নাকি নিঃশব্দে আমাদের শরীরকে এক ভয়াবহ ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
আমরা আজ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের যুগে বাস করছি। একদিকে গড় আয়ু বাড়ছে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি হচ্ছে; অন্যদিকে ঘরে ঘরে ডায়াবেটিস, কিডনি বিকলতা, লিভারের রোগ, বন্ধ্যাত্ব এবং ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি মহামারি আকার ধারণ করছে। হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই, ফার্মেসির সামনে উপচে পড়া ভিড়। প্রশ্ন জাগে, আধুনিক চিকিৎসা আর বিজ্ঞানের এই স্বর্ণযুগেও আমরা কেন দিন দিন আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছি? আমরা কি অজান্তেই একটি নীরব, আত্মঘাতী স্বাস্থ্য সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছি?
এই যুদ্ধের কোনো বোমা নেই, কোনো গুলির শব্দ নেই। তবুও প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ ধীরে ধীরে এর শিকার হচ্ছে।
একদিকে আমাদের খাদ্যব্যবস্থা ক্রমেই অধিক রাসায়নিকনির্ভর হয়ে উঠছে। অধিক উৎপাদনের নামে কৃষিজমিতে হাইব্রিড উৎপাদন বেবস্থা, নির্বিচারে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। সেই রাসায়নিকের বোঝা শেষ পর্যন্ত আমাদের খাবারের প্লেটে, তারপর আমাদের শরীরে পৌঁছাচ্ছে।
অন্যদিকে, ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার যেখানে মানুষের জীবন রক্ষা করে, সেখানে অপ্রয়োজনীয় ও অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ সেবন, অযথা অ্যান্টিবায়োটিক, দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ও স্টেরয়েডের ব্যবহার আমাদের এমন এক ওষুধনির্ভর সমাজে পরিণত করছে, যেখানে রোগের মূল কারণ দূর করার চেয়ে অনেক সময় শুধু উপসর্গ দমনের প্রতিযোগিতা চলছে।
আজ প্রশ্ন করার সময় এসেছে—
আমরা কি এমন একটি ভবিষ্যৎ চাই, যেখানে শিশুরা জন্ম থেকেই রাসায়নিকের ভার বহন করবে?
আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে প্রতিটি ছোট সমস্যার সমাধান শুধু একটি নতুন ওষুধ?
যদি উত্তর না হয়, তাহলে পরিবর্তন শুরু করতে হবে আজই।
আমাদের দাবি হওয়া উচিত—
* নিরাপদ, বিষমুক্ত ও টেকসই খাদ্যব্যবস্থা।
* কৃষিতে রাসায়নিকের যৌক্তিক ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং নিরাপদ উৎপাদনের নিশ্চয়তা।
* অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক ওষুধ ব্যবহারের বিরুদ্ধে জাতীয় সচেতনতা।
* প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, পুষ্টি, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমকে চিকিৎসার মূলভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
* রোগ হওয়ার আগেই মানুষকে সুস্থ রাখার নীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।
একটি জাতিকে দুর্বল করতে সবসময় যুদ্ধ লাগে না।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্য, অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকের ব্যবহার এবং অযৌক্তিক ওষুধনির্ভরতাও একটি জাতিকে ধীরে ধীরে অসুস্থ করে তুলতে পারে।
স্বাস্থ্যকে ব্যবসার পণ্য নয়, মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার এখনই সময়।