12/07/2026
মেনোপজের পরে দীর্ঘ সময় নারীরা বেঁচে থাকে এমন নজির প্রাণীজগতে অন্য কোথাও দেখা যায় না বললেই চলে। প্রজননের ক্ষমতা শেষ হয়ে গেলে প্রাণীও মারা যায়, অথবা কোন কোন প্রাণী প্রজনন ক্ষমতা শেষ হওয়ার আগেও মারা যায়, প্রজননের বয়সের পর প্রকৃতি প্রাণীকে আর প্রয়োজন মনে করে না। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে প্রকৃতির এই ব্যাতিক্রম কেন ? মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় নারীরা মেনোপজের পরেও ৩০-৪০ বছর বেঁচে থাকে।
এর উত্তর খোঁজার জন্য গবেষণা শুরু হয় ১৯৮০ সালে, লোকেশন হচ্ছে তানজানিয়ায় বর্তমানে পৃথিবীর একমাত্র শিকারি-সংগ্রাহক উপজাতি হাডজা(Hadza). কৃষি বিপ্লবের পর ১২ হাজার বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এই উপজাতির সদস্যরা এখনও শিকার করে খাদ্য সংগ্রহ করে - নেই কোন গবাদি পশু, নেই কোন কৃষি জমি। সম্পূর্ণ যাযাবর জীবন তাদের - নেই কোন স্থাবর সম্পত্তি, নেই কোন জমানো খাদ্য। সেহেতু নেই কোন রাজা, বিয়ে শাদিতে নেই কোন মোহরানা, নেই কোন যৌতুক। নর নারী একে অপরকে পছন্দ করে একসাথে থাকা শুরু করলে সবাই ধরে নেয় তারা একে অপরের জন্য ম্যাচ হয়েছে। ডিভোর্স খুব কমন ঘটনা, আর ডিভোর্সকে তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই নেয়। নতুন বর বউয়ের পরিবারের সাথেও থাকতে পারে, আবার বউ স্বামীর পরিবারে গিয়েও থাকতে পারে - কোন বাধা ধরা নিয়ম নেই।
গবেষক ক্রিসটেন হকস(Kristen Hawkes) প্রথমে গিয়ে আশা করেছিলেন - পুরুষেরা শিকার করে খাবার এনে দেবে, আর তাদের নারী এবং সন্তানেরা সেই খাবারের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকবে। কিন্তু তাঁর টিম গিয়ে দেখে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র - পুরুষেরা কয়েকদিন পর পর যে শিকার আনে তা দিয়ে পরিবার চলে না, নানীরা প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বনে গিয়ে মাটি খুঁড়ে যে আলু তুলে নিয়ে আসে এবং ফল কুড়িয়ে আনে তা হচ্ছে প্রতিদিনের নির্ভরযোগ্য প্রধান খাবার যা খেয়ে বাচ্চাদের ক্ষুধা মেটে এবং নার্সিংরত মায়ের রিকাভারি এবং বুকের দুধ হয়। পুরুষেরা প্রতিদিন শিকারে সফল হয় না - বেশীরভাগ সময়ে ছোটখাট প্রাণী পায় যা দিয়ে চলে না, বড় প্রাণী পায় কয়েক সপ্তাহে একবার বা কখনও কখনও মাসে একবার। আর বড় শিকার পেলে তার মাংশ সরাসরি পরিবারের নারীদের কাছে আসে না, এই মাংসের ভাগ গোত্রের সবাই দাবী করে - এই মাংশ কোন নির্দিষ্ট শিকারি এবং তার পরিবারের না।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে গোত্রের পোস্ট-মেনোপজের নারীরা খাদ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী সাকসেসফুল। এর কারণ তাদের মেমোরি, অভিজ্ঞতা এবং ফ্রি সময়। কিন্তু নার্সিংরত নারীরা যথেষ্ট খাবার সংগ্রহ করতে সক্ষম হয় না, এই খাবার দিয়ে নিজেরও হয় না, আবার weaning করা বাচ্চারও(৩ ঊর্ধ্ব বাচ্চার) হয় না। এমতাবস্থায় এগিয়ে আসেন নানী এবং দাদী, বিশেষ করে নানীরা। খাদ্য সংগ্রহে নানীদের অবদানের কারণে উইনড(Weaned) বাচ্চাদের জন্য মায়েদের আর চিন্তা করতে হয় না - মুলত নানীরাই দেখাশোনা করে বড় বাচ্চাদেরকে, এতে মায়েরা সদ্যজাত শিশুর দিকে মনোযোগ দিতে পারেন। আমাদের নিকটবর্তী প্রজাতি গ্রেট এইপদের ক্ষেত্রে গড়ে ৫ বছর পর পর বাচ্চা নিতে হয়, বাচ্চা সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারা, কারণ তাদের নানী-দাদী নেই, অর্থাৎ মেনোপজের পর এই প্রাণীরা আর বেঁচে থাকে না। মানুষের ক্ষেত্রে নানীদের অবদানের কারণে মায়েরা ৫ বছর অপেক্ষা করতে হয় না, ৩ বছরের কম সময়ে পরবর্তী বাচ্চা নিতে পারে। আর এভাবেই গোত্রের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, এভাবেই নানীরা শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে মানবজাতির গড় আয়ু বৃদ্ধি করে দ্বিগুণ করেছে। গাণিতিক গবেষণায় দেখা গেছে - নানী-দাদীর এই অবদান ছাড়া মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ২৫ বছর। আর বড় বাচ্চাদের দেখাশোনা এবং খাদ্য সগ্রহে নানীদের অবদানের কারণে প্রস্তর যুগের মানুষের গড় আয়ু বেড়ে হয়েছিল ৫০ বছর।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ,খরা, বন্যা, মহামারী এবং দুভিক্ষে বৃদ্ধ নানীরাই তাদের ৪০ বছরের অভিজ্ঞতায় পথ দেখিয়েছিলেন কোথায় পানির ঝর্না পাওয়া যাবে, কোথায় খাবার মিলবে, কোন ফল খাওয়া যাবে, কোন ফল বিষাক্ত, কোন উদ্ভিদের ওষধি গুণ আছে, কখন বৃষ্টি হবে, কখন বন্যা হবে। একজন বৃদ্ধ, বিশেষ করে নানী-দাদী মারা যাওয়া ছিল তাদের জন্য জ্ঞানের লাইব্রেরি ধ্বংস হয়ে যাওয়া। মেনোপজ-পরবর্তী নারীরা তাদের অর্জিত জ্ঞানকে পরবর্তী প্রজন্মে ট্রান্সফার করার পদ্ধতি শিখিয়ে গেছেন, যা থেকে তৈরি হয়েছে সংস্কৃতি এবং মানব সভ্যতা। মেনোপজ নারীরাই তৈরি করেছিলেন মানব সভ্যতার ভিত্তি।
প্রাণীজগতে কিলার তিমি(Orca) তে একই পর্যবেক্ষণ দেখা গেছে। অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে একমাত্র তিমিতে মেনোপজ হয়। বাচ্চা তিমিদের খাদ্যের সঙ্কট দেখা দিলে তারা নানীদের কাছে ভিড় করে। নানী তিমিরা নাতি-পুতিদেরকে খাদ্যের সন্ধান করে দেয়, নানীরা তাদের কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা থেকে জানে কোন জলপ্রবাহ খোলা আছে, কোন প্রবাহে মাছ থাকার সম্ভাবনা বেশী সেখানে নিয়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে নানীদের নেতৃত্বে যে বাচ্চা তিমিরা বড় হয় তাদের সারভাইভাল হার বেশী।
Grandmother hypothesis অনুসারে, নারীদের প্রজনন ৪৫ এ বন্ধ হয়ে যাওয়া কোন নেতিবাচক ঘটনা না, এটা বিবর্তনের একটা উপকারী strategy, এটা বিবর্তনের একটা প্রয়োজন, যাতে নাতি-পুতিদের জন্য খাদ্য যোগান করতে পারে এবং তাদের দায়িত্ব নিতে পারে, যাতে পরবর্তী বাচ্চা নেওয়ার জন্য মায়েদেরকে ৫ বছর অপেক্ষা করতে না হয়। মেনোপজ হচ্ছে হিউম্যান সারভাইভাল strategy. নেক্সট টাইম, যদি কোন নানীকে দেখে থেমে গিয়ে তাদের কথা শুনতে মন চায়, তাদেরকে সম্মান করার ইচ্ছা হয় - এই প্রবণতা আপনার চিন্তা, জ্ঞান বা বুদ্ধি থেকে আসেনি, এটা ৪০ হাজার বছরে তৈরি হওয়া সহজাত প্রবৃত্তি, সারভাইভাল strategy. আমাদের এই দীর্ঘ জীবন, এই দীর্ঘ শিশুকাল এবং ব্যতিক্রম সামাজিক বন্ধন নানীদের প্রচেষ্টায় পেয়েছি। তারাই মানব সভ্যতার foundation.