30/07/2026
খবরের কাগজে আজকের লেখা কোমরের ব্যথায় অবহেলা নয়
বর্তমান সময়ে কোমরের ব্যথা (Low Back Pain) বিশ্বজুড়েই অন্যতম সাধারণ স্বাস্থ্যসমস্যা। অফিসে দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ভুল ভঙ্গিতে ভারী জিনিস বহন, অতিরিক্ত ওজন, খেলাধুলায় আঘাত কিংবা বয়সজনিত পরিবর্তন—এসব কারণেই কোমরের ব্যথার প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে গৃহিণী, শিক্ষার্থী এমনকি প্রবীণ ব্যক্তিরাও এ সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকের ক্ষেত্রে ব্যথা সাময়িক হলেও, অবহেলা করলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে দৈনন্দিন জীবন, কর্মক্ষমতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কোমরের ব্যথা হলেই অনেকেই দ্রুত আরামের আশায় ব্যথানাশক ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। যদিও এসব ওষুধ সাময়িকভাবে ব্যথা কমাতে সহায়তা করতে পারে, তবে দীর্ঘদিন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করলে কিডনি, লিভার, পাকস্থলী ও হৃদ্যন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই শুধু ব্যথা কমানো নয়, ব্যথার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কোমরের ব্যথার কারণ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। মাংসপেশির টান, লিগামেন্টের আঘাত, ডিস্কের সমস্যা (PLID), স্নায়ুতে চাপ পড়া, অস্টিওআর্থ্রাইটিস, অস্টিওপোরোসিস কিংবা দীর্ঘদিন ভুল ভঙ্গিতে কাজ করার কারণে এ ব্যথা দেখা দিতে পারে। তাই সবার জন্য একই ধরনের চিকিৎসা কার্যকর হয় না। রোগীর বয়স, পেশা, শারীরিক অবস্থা, ব্যথার ধরন এবং পরীক্ষার ফলাফল বিবেচনা করে চিকিৎসা পরিকল্পনা করা উচিত।
কিছু লক্ষণ রয়েছে, যেগুলো দেখা দিলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। যেমন—দীর্ঘক্ষণ বসে বা দাঁড়িয়ে থাকলে কোমরে তীব্র ব্যথা অনুভব করা, কোমর থেকে ব্যথা নিতম্ব হয়ে পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়া, পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশভাব অনুভব করা, সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর কোমর শক্ত হয়ে থাকা, সামান্য ঝুঁকে কাজ করলেই কোমরে টান লাগা অথবা ব্যথার কারণে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা বা দৈনন্দিন কাজকর্মে সমস্যা হওয়া। এসব লক্ষণ অবহেলা করলে কিছু ক্ষেত্রে ডিস্ক প্রল্যাপ্স (PLID), স্নায়ুতে চাপ পড়া কিংবা মেরুদণ্ডের অন্যান্য জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ কোমরের ব্যথার ক্ষেত্রে পরিকল্পিত ও প্রমাণভিত্তিক (Evidence-based) ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। রোগীর বিস্তারিত মূল্যায়নের মাধ্যমে ব্যথার উৎস নির্ণয় করে উপযুক্ত থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ, ম্যানুয়াল থেরাপি, ভঙ্গি সংশোধন, পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিক ফিজিওথেরাপি প্রযুক্তির সমন্বয়ে চিকিৎসা প্রদান করা হয়। এ ধরনের চিকিৎসার লক্ষ্য শুধু ব্যথা কমানো নয়; বরং রোগীর স্বাভাবিক চলাফেরা, কর্মক্ষমতা এবং জীবনমান ফিরিয়ে আনা।
তবে মনে রাখতে হবে, সব কোমরের ব্যথার চিকিৎসা এক নয়। কিছু ক্ষেত্রে ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে, আবার কিছু ক্ষেত্রে পরীক্ষা নিরীক্ষাসহ বিশেষজ্ঞ পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে।
কোমরের ব্যথা প্রতিরোধেও কিছু সহজ অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে কাজ না করে প্রতি ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট পর কয়েক মিনিট হাঁটা বা শরীর নাড়াচাড়া করা, চেয়ারে বসার সময় কোমরের স্বাভাবিক বাঁক বজায় রাখা, ভারী বস্তু তুলতে হাঁটু ভাঁজ করে সঠিক কৌশল অনুসরণ করা, নিয়মিত হাঁটা ও কোর মাসল শক্তিশালী করার ব্যায়াম করা, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা—এসব অভ্যাস কোমরের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক।
অনেকেই মনে করেন, ব্যথা থাকলে সম্পূর্ণ বিশ্রামই সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা। কিন্তু অধিকাংশ সাধারণ কোমরের ব্যথার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন বিছানায় শুয়ে থাকা বরং ক্ষতিকর হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সহনীয় মাত্রায় দৈনন্দিন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক চলাফেরায় ফিরে আসা অধিকাংশ রোগীর জন্য উপকারী।
মনে রাখতে হবে, কোমরের ব্যথা কোনো অবহেলার বিষয় নয়। প্রাথমিক পর্যায়েই সঠিক রোগ নির্ণয় ও সময়োপযোগী চিকিৎসা গ্রহণ করলে অধিকাংশ রোগী ভালো ফলাফল পান এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে সক্ষম হন। তাই ব্যথা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, বারবার ফিরে এলে বা পায়ে ছড়িয়ে পড়লে দেরি না করে একজন অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞ অথবা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সচেতনতা, সঠিক জীবনযাপন এবং বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাই পারে কোমরের ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রেখে একটি সুস্থ, কর্মক্ষম ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন নিশ্চিত করতে।
লেখক
ডাঃ মোখলেছুর রহমান সিদ্দিকী মুকুল
সিনিয়র কনসালট্যান্ট, ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন
MPT (DU), MPH (ASAUB), MDT (Mumbai), MWM & Joint Pain (India)
চেম্বার: ইউনিক পেইন এন্ড প্যারালাইসিস সেন্টার, মিরপুর, ঢাকা।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট: ০১৭৬৮৩৭৭৪৪২