16/03/2026
ভগবানের ফাঁসিঃ
দেবাশিস বিশ্বাস
হঠাৎ করেই খবরটা এলো
বিচারপতি “সময়ের” আদালতে,
স্বর্গে বসেছে অদ্ভুত বিচার।
অভিযোগকারী সৃষ্টির সেরা “মানুষ”,
আর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে স্বয়ং “ভগবান”।
মানুষের অভিযোগ বিস্তর-
“পৃথিবী ভরে গেছে অন্যায়-অনাচারে।
কেউ জন্মেই পায় প্রাসাদ,
কেউ জন্মেই খোঁজে একমুঠো ভাত।
কেউ পায় ভালোবাসা,
কেউ সারাজীবন একা।
কারও ঘরে সোনা-রুপার চাষ
কারও ঘরে শুধু নীরব দীর্ঘশ্বাস।
এই অন্যায়ের দায়, ভগবানের!”
ভগবান তখনও চুপচাপ
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে,
মনে হল যেন শতাব্দীর ক্লান্তি
জমে আছে তাঁর শান্ত চোখে
সাক্ষ্য দিল পৃথিবী-
গায়ে তাঁর যুদ্ধের ক্ষত,
দুর্ভিক্ষের দাগ,
নাকে বারুদের গন্ধ
বিধ্বংসী বোমার ধ্বংসাবশেষ
মিসাইলের শব্দে অনুভুহীন কান
আগুনের লেলিহান শিখায় দগ্ধ চোখ।
আর শরীরে মানুষের লোভের আঁচড়।
কাতর ক্ষীণ কন্ঠে পৃথিবীর জবানবন্দি-
“আমি তো সবই দেখেছি, মহানুভব
ভগবানতো বীজ ঠিকই দিয়েছিলেন,
কিন্তু মানুষ চাষ করল লোভের।”
আকাশের সাক্ষ্যে নিস্তব্ধ আদালত
“আমি দেখেছি,
কত নীরব কান্না, কত প্রার্থনা
ধোঁয়ার মতো উড়ে গেছে।
কত নিরাপরাধ মানুষের হাহাকার
নিশ্বব্দে মিশে আছে আমার বুকে।”
বাতাসের সরল স্বীকারোক্তি,
“পুরুষে পুরুষে লড়াই
প্রতিশোধ; নারীর শ্লীলতা হানি।
কত যে ধর্ষিতার গগন বিদারী
চিৎকারের শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়েছে
আমারই নাজুক বুকে।
কত যে প্রার্থনার নীরব শব্দ
আমি বহন করেছি!
কিন্তু কামানের গোলার শব্দে চাপা পড়ে গেছে প্রার্থনা।
প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে!”
বিচারপতি সময় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,
তবুও লেখা হল রায়—
“মানুষের দুঃখের দায়ে
ভগবানের ফাঁসি।”
ফাঁসির মঞ্চ তৈরি হল
মানুষেরই করা পাপ দিয়ে।
আর ফাঁসির দড়িটা বোনা হল
মিথ্যা, লোভ আর ক্ষমতার সুতোয়।
ভগবান দাঁড়ালেন ফাসির মঞ্চে
অদ্ভুত শান্ত।
হালকা হাসলেন আর বললেন—
“আমাকে মেরে ফেললে
তোমাদের পাপের দায়টা
চাপাবে কার ঘাড়ে?
আমি তোমাদের দিয়েছি জ্ঞান মানুষের কল্যানে।
সে জ্ঞানকে তোমরা লাগালে ভাইকে ধ্বংস করতে!”
হঠাৎ নীরব সভাঘর।
পিন পতনের শব্দ শোনা যায়।
তোমরা ভগবানকে নয়
নিজেদের অক্ষমতা আর লোভকে
ফাঁসি দাও।
ফাঁসি দাও তোমাদের অন্ধ বিবেকের।
হাওয়ায় দুলে দুলে হাসে ফাঁসির দড়ি
চোখে মুখে অদ্ভুত বিরক্তি মাখা তৃপ্তি নিয়ে।
একটু থেমে ভগবান আবার বললেন—
“আমার মৃত্যুর পর
নিজেদের আয়নায়
একবার তাকাতে ভুল কোরো না।
মনে কর আমার ফাঁসি হয়ে গেল।
তারপর থেকে পৃথিবীতে
ভগবান নেই—
তবু আশ্চর্য,
অন্যায়, পাপটা কি কমবে?
ভগবান বলে চলেন—
“আমি তো দিয়েছিলাম আলো,
তোমরাই বানিয়েছ ছায়া।
আমি দিয়েছিলাম পথ,
তোমরাই গড়েছ দেয়াল।
আমি দিয়েছিলাম মনুষ্যত্ব
তোমারা তাকে বানালে পাষবিকতা
আমি দিলাম শিক্ষার আলো
তোমারা ডুবলে অশিক্ষার অন্ধকারে
আমি তোমাদের পাঠালাম মানুষের কল্যানে
তোমরা হলে স্বার্থপর।”
মানুষ নত মস্তকে শুনল,
কিন্তু বুঝল না কিছুই।
ফাঁসির দড়ি
নিজেই খুলে পড়ল—
কারণ সে জানত,
যাকে মানুষ ফাঁসি দিতে চায়
সে ভগবান নয়—
সে তাদের নিজেরই
লোভ, কুটিল বিবেক আর মনের অন্ধকার।