15/07/2026
Cicuta Virosa (Cic.)
(সিকুটা ভিরোসা)
ভূমিকা (Introduction):
• উৎস: উদ্ভিজ্জ।
• প্রচলিত নাম: কাউবেইন বা নর্দার্ন ওয়াটার হেমলক।
• ঔষধ প্রস্তুত: ছাতার মতো ফুলবিশিষ্ট উগ্র বিষাক্ত উদ্ভিদের তাজা মূলের রস থেকে মাদার টিংচার প্রস্তুত করে পরবর্তীতে অ্যালকোহলে মিশিয়ে শক্তিকৃত করা হয়।
• প্রুভার: ডাঃ স্যামুয়েল হ্যানিম্যান।
• মায়াজম: অ্যান্টি সোরিক, অ্যান্টি সাইকেটিক, অ্যান্টি-সিফিলিটিক ও অ্যান্টি টিউবারকুলার।
• কাতরতা: শীতকাতর
• পার্শ্ব: সাধারণত বাম পাশে রোগের প্রকোপ বেশি; তবে অনেক ক্ষেত্রে লক্ষণ আড়াআড়িভাবে ডান দিকে উপরে ও বাম দিকে নিচে বেশি প্রকাশ পায়।
• ব্যবহার: এটি একটি পলিক্রেস্ট ঔষধ; নতুন ও পুরাতন উভয় ধরনের রোগে ব্যবহৃত হয়।
• উপযোগিতা: অত্যন্ত সংবেদনশীল, খিটখিটে এবং স্নায়বিক উদ্দীপনা বা পেশীর কম্পনপ্রবণ ব্যক্তিদের জন্য অধিক উপযোগী।
• যে সকল রোগে প্রযোজ্য: লক্ষণ অনুযায়ী উপযুক্ত হলে ঔষধটি যেকোনো রোগে প্রযোজ্য।
• ক্রিয়াস্থল: প্রধানত কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র, পেশী, চর্ম ও পরিপাকতন্ত্রে ক্রিয়া করে।
ঔষধ নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণসমূহ
(Important Symptoms for Prescribing Medicine)
সারসংক্ষেপ (Summary/Keynotes)
প্রধান ক্রিয়া: এই ঔষধটির প্রধান কাজ কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের উপর; যার ফলে ধনুষ্টঙ্কার, তড়কা, খিঁচুনি, মৃগী, চোয়াল আটকে যাওয়া (Lockjaw), দাঁতে দাঁত লেগে যাওয়া এবং হিক্কা প্রভৃতি স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দেয়।
মস্তিষ্কে আঘাত (Head Injury): মস্তিষ্কে আঘাত অথবা মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের পুরনো আঘাতের পর সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী কুফল, বিশেষ করে খিঁচুনি, মৃগী বা স্নায়বিক স্পাজমে সিকুটা অত্যন্ত উপযোগী (Arn., Nat-s., Hyper.)। ডাঃ হেরিং তাঁর The Guiding Symptoms of Our Materia Medica (Vol. 4)-এ উল্লেখ করেছেন- "Concussion of brain and chronic effects therefrom, particularly spasms." ডাঃ এস. পি. দে তাঁর Clinical Case Taking Guide-এও এই লক্ষণটির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
আক্ষেপ ও ধনুষ্টঙ্কার (Convulsions & Tetanus): খিঁচুনি প্রথমে মুখমণ্ডল, ঘাড় ও পিঠের পেশি অর্থাৎ শরীরের উপরের অংশ থেকে শুরু হয়ে নিচের দিকে বিস্তার লাভ করে। ঘাড়ের পেশি শক্ত হয়ে মাথা পেছনের দিকে ঝুঁকে যায়, শরীর ধনুকের মতো শক্ত হয়ে বেঁকে যায় (Opisthotonos), বিভিন্ন দিকে মোচড়াতে থাকে এবং হাত-পায়ের আঙুল ভেতরের দিকে বেঁকে যায়।
খিঁচুনির পরবর্তী অবস্থা: খিঁচুনি শেষে রোগী দীর্ঘ সময় অচেতন থাকে। জ্ঞান ফিরলেও কিছুই মনে করতে পারে না; অনেক সময় প্রাপ্তবয়স্ক এমনকি বৃদ্ধ রোগীও শিশুর মতো আচরণ করে, পুতুল বা খেলনা নিয়ে খেলে এবং অকারণে শিশুসুলভ হাসি হাসে (ডাঃ রজার মরিশন)।
মুখমণ্ডল ও চোয়াল (Face & Jaw): খিঁচুনির তীব্রতায় চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে দাঁতে দাঁত লেগে মুখ আটকে যায়। মুখমণ্ডল ফ্যাকাশে বা নীলচে হয়ে যায় এবং ঠোঁটের কোণে ফেনা জমে। ডাঃ সি. এম. বোগার তাঁর Synoptic Key গ্রন্থে সিকুটার এই অবস্থাকে পেশির তীব্র সংকোচন বা "Violent muscular contortions" হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
চক্ষু লক্ষণ (Ocular Symptoms): খিঁচুনির সময় চোখের মণি ওপরের দিকে বা একদিকে স্থির হয়ে থাকে অথবা ডানে-বামে পেন্ডুলামের মতো কাঁপতে থাকে; রোগী একদৃষ্টে শূন্যে চেয়ে থাকে এবং ক্ষুদ্র বস্তুকে অনেক বড় দেখে (ডাঃ আবু বকর)।
স্প্লিন্টার বা ধারালো বস্তু বিদ্ধ হওয়ার কুফল: শরীরে কোনো ধারালো কাঠি, কাচ বা সুঁচ ফুটে তীব্র যন্ত্রণা বা ধনুষ্টঙ্কার দেখা দিলে এটি অত্যন্ত কার্যকরী (Hyper., Sil.)।
চরম সংবেদনশীলতা (Hypersensitiveness): সামান্যতম ছোঁয়া বা স্পর্শ, সামান্য শব্দ বা ঘরের দরজা খোলার আওয়াজ, কিংবা তামাকের ধোঁয়া লাগলেই রোগীর শরীরে তীব্র কাঁপুনি বা খিঁচুনি শুরু হয়। ডাঃ ফাটক এবং ডাঃ সারাভাই কাপাডিয়া এই অবস্থাকে চরম সংবেদনশীলতা বলে অভিহিত করেছেন। আর ডাঃ জে. এইচ. ক্লার্ক রোগীর এই অতি-সংবেদনশীলতাকেই ঔষধটি চেনার সবচেয়ে প্রধান নির্দেশক লক্ষণ বলেছেন।
অদ্ভুত লক্ষণ:
নিজের ঘরবাড়ি, চেনা রাস্তাঘাট বা আপনজনকে চিনতে পারে না; সবকিছু নতুন ও অচেনা লাগে।
শিশু অপাচ্য বস্তু যেমন কয়লা, চুন, কাঁচা আলুর খোসা বা মাটি চিবিয়ে খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করে (ডাঃ হেনরি এন. গারেন্সী তাঁর Keynotes-এ শিশুদের কৃমির উপদ্রব বা পুষ্টিহীনতাজনিত এই অদ্ভুত খাদ্যস্পৃহাকে সিকুটার একটি নির্ভরযোগ্য পথপ্রদর্শক (Guiding) লক্ষণ বলে উল্লেখ করেছেন)।
কনকমিটেন্ট লক্ষণ: তীব্র খিঁচুনি বা ধনুষ্টঙ্কারের সময় রোগীর বুক কাঁপিয়ে যন্ত্রণাদায়ক হিক্কা ওঠে এবং অনৈচ্ছিকভাবে প্রস্রাব হয়ে যায়।
১। মানসিক লক্ষণসমূহ (Mental Generals)
স্মৃতিভ্রম: নিজের ঘরবাড়ি, অতি পরিচিত রাস্তাঘাট বা আপনজনকে চিনতে পারে না; সবকিছু তার কাছে সম্পূর্ণ নতুন ও অচেনা মনে হয় (Glon.)।
অবিশ্বাস ও সন্দেহ: মানুষকে অবিশ্বাস ও সন্দেহ করে; সমাজ বা জনসমাগম এড়িয়ে একা থাকতে চায় এবং খিটখিটে মেজাজ প্রকাশ করে।
উদ্ভট আচরণ: বিষণ্ণতার মধ্যেও হঠাৎ অদ্ভুত ও অর্থহীন অঙ্গভঙ্গি বা নাচ-গান শুরু করে দেয়। নিজেকে বড় মনে করার প্রবণতা থাকতে পারে (Lach., Plb.)।
ভয় ও আতঙ্ক: সামান্য শব্দে, দরজা খোলার আওয়াজে বা হঠাৎ কোনো উদ্দীপনায় চমকে ওঠে এবং অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
২। সর্বদৈহিক লক্ষণসমূহ (Physical Generals)
রোগের কারণ: মাথা বা মেরুদণ্ডে কোনো যান্ত্রিক আঘাতের পর সৃষ্ট স্নায়বিক সমস্যা, মস্তিষ্কে রক্তাধিক্য (Cerebral congestion), পেটে কৃমির উপদ্রব, তীব্র মানসিক উত্তেজনা, ভয় পাওয়া অথবা আফিম/তামাকের বিষক্রিয়া থেকে রোগের উৎপত্তি হতে পারে। চর্মরোগ চাপা পড়ার পর মস্তিষ্কের অসুস্থতা বা খিঁচুনি দেখা দিতে পারে।
ক্ষুধা: অস্বাভাবিক ও তীব্র ক্ষুধা; পেট ভরে খাওয়ার পরও অল্প সময়ের মধ্যে পুনরায় ক্ষুধা পায়। তবে খিঁচুনির পূর্বে বা পরে ক্ষুধা সম্পূর্ণ লোপ পেতে পারে।
পিপাসা: প্রচণ্ড পিপাসা; কিন্তু পানীয় গ্রহণে অসুবিধা হয়, তরল পদার্থ গিলতে কষ্ট হয় এবং গড়গড় শব্দ করে নিচে নামে (Cupr.)।
ঘুম: ঘুমের মধ্যে রোগী বারবার চমকে ওঠে, পেশির কাঁপুনি হয় এবং চোখ আধা-খোলা থাকে। খিঁচুনির পর রোগী গভীর, অচেতন বা অসাড় ঘুমে ঢলে পড়ে।
ঘাম: প্রধানত রাতে এবং ঘুমের মধ্যে ঘাম হয়; ঘাম চটচটে ও ঠাণ্ডা প্রকৃতির, বিশেষ করে মাথা ও ঘাড়ে বেশি দেখা যায়।
সাধারণ লক্ষণ: খিঁচুনির সময় শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়, কিন্তু মাথা গরম থাকে; মাথা ঘামে ভিজে যায়।
বৃদ্ধি: ঘুমের মধ্যে (বিশেষত মৃগী বা খিঁচুনির সময়), নড়াচড়া, ঠাণ্ডা বাতাস এবং মানসিক উত্তেজনায় রোগলক্ষণ বৃদ্ধি পায়।
উপশম: উষ্ণতা, শান্ত ও অন্ধকার পরিবেশে, সম্পূর্ণ স্থির হয়ে চিত হয়ে শুয়ে থাকা এবং খাওয়ার পর পেটের যন্ত্রণা উপশম হয়।
পছন্দ: অপাচ্য ও অখাদ্য বস্তু (কয়লা, চুন, কাঁচা আলুর খোসা, মাটি ইত্যাদি), বাঁধাকপি এবং ঠাণ্ডা খাবার বা পানীয়ের প্রতি আকর্ষণ থাকে।
অপছন্দ: গরম খাবার, গায়ে বেশি আবরণ রাখা, তামাকের গন্ধ বা ধোঁয়া এবং যেকোনো ধরনের কোলাহল বা জনসমাগম অপছন্দ করে।
স্বপ্ন: আক্ষেপ, ওপর থেকে পড়ে যাওয়া, তাড়া খাওয়া অথবা ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার স্বপ্ন দেখে চিৎকার করে ওঠে।
৩। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণসমূহ (Other Important Symptoms)
রোগীর অতীত ইতিহাস: রোগীর অতীতে মাথায় গুরুতর আঘাত, পড়ে গিয়ে মস্তিষ্ক বা মেরুদণ্ডে আঘাত পাওয়া অথবা শৈশবে তীব্র খিঁচুনি ও কৃমিজনিত সমস্যায় ভোগার ইতিহাস থাকতে পারে।
মাথা ও মস্তিষ্ক (Head & Brain): মাথায় তীব্র শূন্যতা বা ঘোরার অনুভূতি হয়। রোগী সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং মনে হয় মস্তিষ্কটি করোটির মধ্যে নড়াচড়া করছে।
পাকস্থলী ও খাদ্যনালী (Stomach & Esophagus): তীব্র ও যন্ত্রণাদায়ক হিক্কা ওঠে। তরল গিলতে গেলে খাদ্যনালীর আক্ষেপের কারণে গড়গড় বা ঢকঢক শব্দ করে নিচে নামে (Cupr.)। পাকস্থলীতে জ্বালা ও বমিভাব থাকতে পারে।
প্রস্রাব: প্রস্রাব সজোরে নির্গত হয় অথবা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে শরীরে পানি জমে ফুলে যেতে পারে। ডাঃ ফারুক জে. মাস্টার তীব্র খিঁচুনির সঙ্গে প্রস্রাবের এই অস্বাভাবিক বেগ অথবা প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্লিনিক্যাল নির্দেশক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মনীষীদের অভিমত:
১। ডাঃ রজার মরিশন: মাথায় তীব্র আঘাত বা ঝাঁকুনির (Concussion) পর যদি স্নায়বিক সমস্যা, প্রচণ্ড মাথাঘোরা কিংবা মৃগীরোগ (Epilepsy) দেখা দেয়, তবে সিকুটা ভিরোসা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঔষধ। মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের আঘাতজনিত সমস্যায় এটি বিশেষভাবে বিবেচ্য।
২। ডাঃ সি. এম. বোগার: শরীরের বিভিন্ন পেশির তীব্র ও অনৈচ্ছিক সংকোচন বা খিঁচুনি সিকুটা ভিরোসার প্রধান শারীরিক বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে ঘাড় ও পিঠ পেছনের দিকে ধনুকের মতো বেঁকে যাওয়া (Opisthotonos) একটি প্রধান নির্দেশক লক্ষণ।
৩। ডাঃ ফারুক জে. মাস্টার: সিকুটা ভিরোসার মানসিক অবস্থাকে তিনি একটি Regressive Childish State বা শিশুসুলভ অবস্থায় ফিরে যাওয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। গভীর মানসিক বা শারীরিক আঘাতের পর রোগীর মধ্যে সমাজবিমুখতা, সন্দেহপ্রবণতা এবং শিশুসুলভ আচরণ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর মধ্যে শিশুর মতো কথা বলা, আচরণ করা বা খেলনার প্রতি আগ্রহ ইত্যাদি সিকুটার একটি উল্লেখযোগ্য মানসিক বৈশিষ্ট্য।
৪। ডাঃ হেনরি এন. গারেন্সী: কৃমিজনিত সমস্যা বা অপুষ্টির কারণে শিশুদের মধ্যে আকস্মিক খিঁচুনি, আঙুলের সংকোচন এবং মুখ নীল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে সিকুটা ভিরোসার কথা বিশেষভাবে বিবেচনা করা উচিত।
মন্তব্য: উপরোক্ত লক্ষণসাদৃশ্যে ঔষধটি প্রয়োগ করা হলে, রোগের নাম যাই হোক না কেন, ঔষধটি কার্যকর ফল প্রদান করতে সক্ষম।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ রোগের লক্ষণসমূহ (Important Clinical Symptoms)
১। মৃগী রোগ (Epilepsy): খিঁচুনি বিশেষত মাথা বা মেরুদণ্ডের পুরনো যান্ত্রিক আঘাতের পর দেখা দিলে এটি অন্যতম প্রধান ঔষধ। খিঁচুনির তীব্রতায় রোগী হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে, অজ্ঞান হয়ে যায়, মুখমণ্ডল লাল বা নীলাভ হয়ে যায়, দাঁতে দাঁত লেগে যায়, শরীর ধনুকের মতো বেঁকে যায় (Opisthotonos), চোখের মণি ওপরের দিকে উঠে যায় বা স্থির হয়ে থাকে এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঝাঁকুনি দিতে থাকে। আক্রমণ বারবার, বিশেষ করে রাতে হতে পারে। পড়ার সময় অক্ষরগুলো অস্পষ্ট বা অদৃশ্য হয়ে যায় কিংবা চোখের সামনে নাচতে থাকে। প্রথমদিকে আক্রমণ ঘন ঘন হলেও পরে দীর্ঘ বিরতিতে হতে পারে। সামান্য স্পর্শ, শব্দ বা তামাকের ধোঁয়ায় খিঁচুনি বেড়ে যায়; অন্ধকার, শান্ত ঘরে চিত হয়ে সম্পূর্ণ স্থির অবস্থায় শুয়ে থাকলে কিছুটা উপশম হয়।
২। ধনুষ্টঙ্কার ও খিঁচুনি (Tetanus & Convulsions): মাথা বা মেরুদণ্ডে আঘাতের পর কিংবা চর্মরোগ দমনের কুফল হিসেবে খিঁচুনি দেখা দিলে এটি একটি প্রধান ঔষধ। খিঁচুনি সাধারণত মুখ, মাথা, ঘাড় বা পিঠ থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ঘাড় শক্ত হয়ে মাথা পেছনের দিকে বেঁকে যায় অথবা একদিকে বেঁকে থাকে; শরীর ধনুকের মতো বাঁকা (Opisthotonos) হয়ে যায় এবং চোখের দৃষ্টি ট্যারা বা একদিকে স্থির থাকে। খিঁচুনির সঙ্গে হিক্কাও দেখা দিতে পারে। প্রসবকালীন ও প্রসবোত্তর খিঁচুনি, দাঁত ওঠার সময় খিঁচুনি, ভয়জনিত খিঁচুনি (Op.) এবং কৃমিজনিত খিঁচুনি (Cina.)-তেও উপকারী। খিঁচুনির পূর্বে অনেক সময় রোগী চিৎকার করে ওঠে অথবা বুকে বা হৃৎপিণ্ডে হঠাৎ শীতল অনুভূতি ও কাঁপুনি শুরু হয়, এরপরই খিঁচুনি দেখা দেয়। আক্রমণের পর রোগী দীর্ঘক্ষণ অবসন্ন, অচেতনসদৃশ অবস্থায় থাকে; স্মৃতিভ্রম হয় এবং আত্মীয়স্বজনকেও চিনতে পারে না। রাতে, সামান্য বাতাস, স্পর্শ বা শব্দে খিঁচুনি বৃদ্ধি পায়; গরমে ও চিত হয়ে সম্পূর্ণ স্থির অবস্থায় শুয়ে থাকলে কিছুটা উপশম হয়।
৩। সেরিব্রো-স্পাইনাল মেনিনজাইটিস: মস্তিষ্কের ঝিল্লির প্রদাহজনিত কারণে তীব্র জ্বর, প্রলাপ বকা, মাথা বালিশে এপাশ ওপাশ নাড়তে থাকে এবং ঘাড়ের পেশি শক্ত হয়ে মাথা পেছনের দিকে স্থায়ীভাবে বেঁকে থাকে, দৃষ্টি ট্যারা হয়ে যায়। মাথা সামান্য নাড়ালে, গায়ে হাত দিলে বা আলো ও শব্দে রোগের তীব্রতা বাড়ে এবং ঘর অন্ধকার করে রোগীকে সম্পূর্ণ শান্ত ও উষ্ণ পরিবেশে রাখলে লক্ষণের উপশম হয় (রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে খিঁচুনি হলে: Glon., Plb.)।
৪। চর্মরোগ বা একজিমা : শিশুদের মুখমণ্ডল, মাথা এবং পুরুষদের দাড়ির অংশে শক্ত, ঘন, হলদেটে এবং মধুর মতো চটচটে রসযুক্ত মামড়ি (Crust) পড়া একজিমা দেখা দেয়। শিশুর মাথার একজিমাতে এক প্রকারের পুরো মামড়ি মাথাটিকে খোলসের মতো ঢেকে রাখে এবং স্থানে স্থানে খোলসটি ফেটে রস বের হয় (Sars., Sec.)। একজিমাতে কোনো রকম চুলকানি থাকে না। ক্ষুর দিয়ে চুল কাটার পর সৃষ্ট ফলিকুলাইটিস বা অনুরূপ চর্মরোগেও উপকারী। বাতাসে এবং সামান্য স্পর্শে তীব্র ব্যথা হয় এবং চারপাশের ত্বক লাল হয়ে ফুলে ওঠে। গরম সেক দিলে কিংবা ক্ষতস্থান শুকনা রাখলে কিছুটা উপশম হয়।
৫। তীব্র হিক্কা (Spasmodic Hiccough): কলেরা বা যেকোনো রোগে তীব্র হিক্কা, কোনোভাবেই থামানো যায় না এমন আক্ষেপিক ও যন্ত্রণাদায়ক হিক্কা, এর সঙ্গে পাকস্থলীতে তীব্র জ্বালা ও বমিভাব থাকে। তরল কিছু পান করতে গেলে বা তামাকের ধোঁয়ায় এই হিক্কা মারাত্মকভাবে বাড়ে এবং একদম সোজা হয়ে স্থির হয়ে শুয়ে থাকলে হিক্কার তীব্রতা কমে।
৬। চোয়াল শক্ত হওয়া (Lockjaw): চোয়ালের পেশি অনৈচ্ছিক ও তীব্র আড়ষ্টতায় শক্ত হয়ে দাঁতে দাঁত লেগে যায়, যার ফলে মুখ খোলা বা ওষুধ খাওয়ানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। রোগীকে জোর করে মুখ খোলানোর চেষ্টা করলে বা স্পর্শ করলে আড়ষ্টতা আরও বৃদ্ধি পায় আর চোয়ালে গরম ভাপ বা সেক দিলে পেশির আড়ষ্টতা কিছুটা শিথিল বা উপশম হয়।
৭। চোখ: মাথায় আঘাত, তীব্র খিঁচুনি কিংবা স্নায়বিক দুর্বলতার কারণে যদি চোখের মণি একদিকে বা ওপরের দিকে স্থায়ীভাবে বেঁকে যায় (ট্যারা চোখ), সেক্ষেতে এটি অত্যন্ত কার্যকরী (Jabor.)। পড়ার সময় অক্ষরগুলি অদৃশ্য হয়ে যায় বা উল্টানো বলে মনে হয়।
৮। কানের রোগ: কোনো কঠিন রোগের পর কান থেকে রক্তস্রাব হতে থাকলে বা সম্পূর্ণ বধির হয়ে গেলে ঔষধটি উপকারী। খাবার গিলতে গিয়ে হঠাৎ কানে শব্দ হয়ে শ্রবণশক্তি লোপ পেলেও উপকার হয়।
অনুপূরক: হাইপেরিকাম, নাক্স, ষ্টিকনিন।
ক্রিয়ানাশক: আর্নিকা, ওপিয়াম, মাতাক বা তামাকের ধোঁয়া।
সম্পর্ক:
পরবর্তী ব্যবহৃত ঔষধ: রোগীর লক্ষণসমষ্টির ভিত্তিতে পরবর্তীতে যে কোনো উপযুক্ত ঔষধ নির্বাচন করা যেতে পারে।
ক্রিয়ার স্থায়িত্ব: প্রায় ৫-১০ দিন।
ব্যবহৃত শক্তি: ৩০ থেকে উচ্চশক্তি ও ৫০ সহস্রতমিক (LM) ০/১ থেকে উচ্চশক্তি।
নিষিদ্ধ খাবার: তামাক, জর্দা, গুল বা ধূমপান।