07/09/2026
নীরব যন্ত্রণার নাম বাতরোগ: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি বাস্তবতা----
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বিছানা থেকে নামতে গিয়ে হাঁটুতে যে চিনচিনে ব্যথাটা লাগে, কিংবা কাপড় মেলতে গিয়ে হাতের আঙুলগুলো যখন আর সহজে মুঠো হয় না, সেই মুহূর্তগুলো আমাদের অনেকের কাছেই খুব চেনা। আমরা বলি "বয়স হয়েছে তো", "শীতকালে এমন হয়ই", অথবা "কাজ বেশি করলে ব্যথা তো হবেই"। কিন্তু এই ছোট ছোট ব্যথাগুলোর পেছনে অনেক সময় লুকিয়ে থাকে একটি দীর্ঘমেয়াদী, নিঃশব্দ শত্রু, যার নাম বাতরোগ বা রিউমাটোলজিক্যাল ডিজিজ। যে রোগ কাউকে মেরে ফেলে না ঠিকই, কিন্তু ধীরে ধীরে একজন সুস্থ, স্বাবলম্বী মানুষকে পঙ্গু করে দিতে পারে।
সংখ্যাগুলো যা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে----
বাংলাদেশে বাতরোগ নিয়ে পরিচালিত COPCORD গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় প্রতি চারজনের একজন মানুষ মাংসপেশি বা অস্থিসন্ধির ব্যথায় ভোগেন। গ্রামাঞ্চলে এই হার প্রায় ২৬ শতাংশ, শহরের বস্তি এলাকায় প্রায় ২৫ শতাংশ। আর যারা এই ব্যথায় ভোগেন, তাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ দৈনন্দিন সাধারণ কাজ যেমন ভারী জিনিস তোলা, উবু হয়ে বসা কিংবা সিঁড়ি বেয়ে ওঠার মতো কাজগুলো ঠিকমতো করতে পারেন না। নারীরা এই রোগে পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি আক্রান্ত হন।
শুধু ব্যথা নয়, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো নির্দিষ্ট রোগেও বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই। বর্তমানে দেশে প্রায় পঁচিশ লাখের কাছাকাছি মানুষ রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়, এবং প্রতি বছর নতুন করে যুক্ত হচ্ছেন কয়েক হাজার মানুষ। অথচ এই বিশাল রোগীগোষ্ঠীর তুলনায় প্রশিক্ষিত রিউমাটোলজিস্টের সংখ্যা এতটাই কম যে বেশিরভাগ রোগীর জন্য সঠিক সময়ে সঠিক বিশেষজ্ঞের কাছে পৌঁছানোই একটা যুদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়।
যে ক্ষতি চোখে দেখা যায় না----
বাতরোগের আসল ভয়াবহতা লুকিয়ে আছে এর ধীরগতির, নীরব প্রকৃতিতে। এটি হার্ট অ্যাটাকের মতো একদিনে আঘাত হানে না, বরং বছরের পর বছর ধরে একটু একটু করে একজন মানুষের জয়েন্ট, তার হাঁটাচলার ক্ষমতা, তার আত্মবিশ্বাস কেড়ে নেয়। যে কৃষক একসময় সারাদিন মাঠে কাজ করতেন, সেই মানুষটাই একদিন আবিষ্কার করেন তার আঙুল আর কাস্তে ধরতে পারছে না। যে গৃহিণী নিজের সংসার নিজে সামলাতেন, তিনি একদিন সন্তানের কাছে সাহায্য চাইতে বাধ্য হন কেবল একটা দরজা খোলার জন্য।
শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি আসে আর্থিক আঘাত। বাংলাদেশে বেশিরভাগ রিউম্যাটিক রোগের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদী এবং ব্যয়বহুল। নিয়মিত ওষুধ, রক্ত পরীক্ষা, ফিজিওথেরাপি, মাঝেমধ্যে অস্থিসন্ধি প্রতিস্থাপনের মতো ব্যয়বহুল অস্ত্রোপচার, এসব খরচ একটি সাধারণ পরিবারের সঞ্চয় নিঃশেষ করে দিতে পারে। যে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য বাতরোগে কর্মক্ষমতা হারান, সেই পরিবারের পুরো ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। গ্রামীণ এলাকায় যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব প্রকট, সেখানে রোগীদের প্রায়ই দূরের শহরে গিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়, যা যাতায়াত খরচ ও কর্মদিবস নষ্ট হওয়ার বাড়তি বোঝা যোগ করে।
আর সবচেয়ে কম আলোচিত ক্ষতিটি হলো মানসিক। দীর্ঘদিনের ব্যথা, সীমিত চলাফেরা, অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা একজন মানুষের মনোবল ভেঙে দেয়। অনেক রোগী সমাজে নিজেকে গুটিয়ে নেন, বিষণ্ণতায় ভোগেন, এবং পরিবারের বোঝা মনে করে নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করেন। এই মানসিক যন্ত্রণা প্রায়শই শারীরিক ব্যথার চেয়েও গভীর ক্ষত রেখে যায়।
আমাদের করণীয় কী?---
প্রথম কাজ হলো লক্ষণকে অবহেলা না করা। টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে জয়েন্টে ব্যথা, সকালে উঠে শরীর জমে থাকার মতো লাগা (মর্নিং স্টিফনেস), হাত-পায়ের জয়েন্ট ফুলে যাওয়া, অথবা কারণ ছাড়াই দীর্ঘদিন জ্বর-দুর্বলতা থাকলে সেটাকে "এমনিই সেরে যাবে" ভেবে ফেলে রাখা উচিত নয়। ঝাড়ফুঁক, কবিরাজি তেল-পানি বা নিজের ইচ্ছেমতো ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে সময় নষ্ট করলে রোগ ততক্ষণে জয়েন্টের ভেতরে স্থায়ী ক্ষতি করে ফেলতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব একজন প্রকৃত বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়াই প্রথম ও সবচেয়ে জরুরি করণীয়।
কোথায় যেতে হবে?---
বাংলাদেশে রিউমাটোলজি চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট বিভাগ আছে এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (BMU) রিউমাটোলজি বিভাগ, শাহবাগ, ঢাকা। এছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ, মুগদা মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজসহ দেশের বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে রিউমাটোলজি বিশেষজ্ঞরা রোগী দেখেন। ঢাকার বাইরে যারা থাকেন, তাদের জন্য প্রাথমিক ধাপ হতে পারে নিকটস্থ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা জেলা সদর হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগ, যেখান থেকে প্রয়োজনে বড় কেন্দ্রে রেফার করা হয়। বেসরকারি খাতে গ্রিন লাইফ, জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাস্পাতাল, বারডেম, আনোয়ার খান মর্ডান হাসপাতালসহ বেশ কিছু হাসপাতালে আলাদা রিউমাটোলজি সেবা চালু আছে, তবে খরচের দিক বিবেচনায় সরকারি প্রতিষ্ঠান অনেকের জন্য বাস্তবসম্মত প্রথম পছন্দ।
চিকিৎসক কারা হবেন?---
এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার, প্রতিটি হাড়-জয়েন্টের ব্যথার চিকিৎসক অর্থোপেডিক সার্জন নন। হাড় ভাঙা বা জয়েন্ট প্রতিস্থাপনের মতো অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে অর্থোপেডিক সার্জনের কাছে যেতে হয় ঠিকই, কিন্তু রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, লুপাস, অ্যাংকাইলোজিং স্পন্ডাইলাইটিস, গাউটের মতো প্রদাহজনিত ও অটোইমিউন রোগের সঠিক চিকিৎসক হলেন রিউমাটোলজিস্ট, যারা রিউমাটোলজীতে এফসিপিএস বা এমডি অথবা রিউমাটোলজিতে আলাদা উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। রিউমাটোলজিস্ট সহজলভ্য না হলে ইন্টারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছেও প্রাথমিক পরামর্শ নেওয়া যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদী রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য একজন প্রিউমাটোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নেয়া সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা কী?---
বেশিরভাগ রিউম্যাটিক রোগ পুরোপুরি নির্মূল হয় না, এটা সত্যি। কিন্তু সঠিক ওষুধ ও নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে রোগের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, জয়েন্টের ক্ষতি থামিয়ে দেওয়া বা ধীর করে দেওয়া যায়, এবং রোগী প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য কেবল ব্যথা কমানো নয়, বরং জয়েন্টের স্থায়ী বিকৃতি ঠেকানো, শরীরের অন্য অঙ্গ (কিডনি, ফুসফুস, হৃদযন্ত্র) যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তা নিশ্চিত করা, এবং রোগীকে কর্মক্ষম রাখা।
চিকিৎসা না করালে কী কী ক্ষতি হবে?---
চিকিৎসা না করালে বা দেরিতে শুরু করালে ক্ষতির তালিকাটা দীর্ঘ। জয়েন্ট ধীরে ধীরে বেঁকে যেতে পারে, স্থায়ীভাবে অকেজো হয়ে যেতে পারে, ফলে সহজ কাজগুলোও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। লুপাসের মতো অটোইমিউন রোগ অবহেলা করলে তা কিডনি বা হৃদযন্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে ছড়িয়ে জীবনঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত প্রদাহ থেকে হাড় ক্ষয় (অস্টিওপোরোসিস), হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং সার্বিক আয়ু কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও থেকে যায়। এর সাথে যোগ হয় কর্মক্ষমতা হারিয়ে আর্থিক সংকট, পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যাওয়া, এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ও অক্ষমতা থেকে জন্ম নেওয়া বিষণ্ণতা। অর্থাৎ, চিকিৎসা বিলম্বিত করার প্রতিটি দিনই রোগীর জন্য একটু একটু করে ভবিষ্যৎ সংকুচিত করে দেয়।
কেন এই নীরবতা ভাঙা দরকার?---
আমাদের সমাজে বাতব্যথাকে প্রায়ই "বয়সের স্বাভাবিক লক্ষণ" বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। এই ভুল ধারণার কারণে অনেক রোগী প্রথম দিকের লক্ষণ উপেক্ষা করেন, ঝাড়ফুঁক বা ঘরোয়া টোটকার পেছনে সময় নষ্ট করেন, আর যখন বিশেষজ্ঞের কাছে পৌঁছান ততদিনে জয়েন্টের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। অথচ প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা শুরু হলে অনেক রোগীই স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যেতে পারেন।
বাতরোগ নিরাময়যোগ্য না হলেও নিয়ন্ত্রণযোগ্য। প্রয়োজন সচেতনতা, প্রয়োজন সময়মতো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, আর প্রয়োজন একটি সমাজ যেখানে বাতরোগে আক্রান্ত মানুষটিকে দুর্বল নয়, বরং সহানুভূতি ও সহায়তার চোখে দেখা হবে। প্রতিটি চিনচিনে ব্যথা যেন অবহেলার শিকার না হয়, প্রতিটি রোগীর গল্প যেন সময়মতো সঠিক পথ খুঁজে পায়, এটাই এখন সময়ের দাবি।
ডা. মো কামরুল হাসান সজীব
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য)
এমডি (রিউমাটোলজী)
কনসালটেন্ট রিউমাটোলজীস্ট