10/06/2026
নোট # ৪৪
নূরজাহান বেগমের মৃত্যু ও প্রসঙ্গিক ভাবনা
নূরজাহান বেগমের মৃত্যু আমাদের আবেগকে প্রচন্ডভাবে নাড়া দিয়েছে। কেননা সন্তানরা যথাযথভাবে তার সেবা যত্ন করেননি, তার বাড়ীঘর পরিষ্কার করেননি... এই তো?! কিন্তু এমনও হতদরিদ্র সন্তান রয়েছে যার নিজের বয়স ষাট, আর মায়ের বয়স পঁচাশি... সেও তার মাকে নিজের সাথে রেখে যতটুকু পারে যত্ন করছে। এরকম বিষয় নিয়ে ফেসবুক কিংবা পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয় যেটা আমরা দেখি। এখন কেন এই দুই রকমের চিত্র?! একটু ভাবলেই হয়ত আমরা অনুধাবন করতে পারি। সেটা নিয়ে পরে কোন একদিন লিখব।
বারবার সব রকম মিডিয়ায় নূরজাহান বেগমের নোংরা আবর্জনায় ভরা ঘরটি আমরা দেখলাম। সাইকো-সোশ্যাল কাউন্সেলিং করার সময় এরকম কিছু কেইস ডিল করতে যেয়ে দেখেছি এক চল্লিশোর্ধ্ব মধ্যবয়সী লোক তার আত্মীয়ের সাথে আত্মীয়ের বাড়ীতে থাকেন বেশ কয়েক বছর। সব ধরণের সুযোগ সুবিধা তাকে পরিবারের একজন সদস্যের মত দেওয়া হয়, বরংচ অন্যদের চেয়ে কিছুটা বেশীই পান। কিন্তু ওই ভদ্রলোক তার কক্ষে কখনও কাউকে ঢুকতে দেন না, ঘর বা বাথরুম পরিষ্কার তো দূরের কথা! তিনি বছরে দু'একবার যখন শহরের বাইরে যান তার আত্মীয় তার ঘরে ঢুকে পরিষ্কার করেন। কিন্তু সে ভদ্রলোক বাসায় ফিরে সব পরিপাটি দেখেই এমন আক্রমণাত্মক আচরণ করা শুরু করেন যেটা সেই আত্মীয়ের জন্য প্রচন্ড ভীতিকর আর সামাজিক ও ব্যক্তিগতভাবে অসম্মানজনক হয়ে পড়ে। বেশ কয়েকবার এই পরিষ্কার ইস্যুতেই খুব বাজে আর ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এখন সেই আত্মীয় যাদের বাড়ীতে ভদ্রলোকটি থাকেন, তারা আর নিজ থেকে রুম, টয়লেট পরিষ্কার করেন না। পরিণামে রুম এবং টয়লেট ক্রমান্বয়ে একটা ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এই ক্ষেত্রে আমরা কাকে দোষ দেব?!
এইক্ষেত্রে আরও দেখা যায় ওই ভদ্রলোকটি যে আত্মীয়ের বাসায় থাকেন তাদের প্রতি অহেতুক নানা কারণে সন্দেহ প্রকাশ করেন। মনগড়া কথাবার্তা বলেন, খারাপ ব্যবহার করেন আর সেই সাথে প্রভাব ও কর্তৃত্ব খাটান। সবকিছু তিনি যেভাবে চান অর্থাৎ তার মনের মত করে হতে হবে। বাসায় সব সময় মানসিকভাবে একটা চাপে রাখেন সবাইকে। আত্মীয়টি প্রায়ই দুঃখ করে বলেন, ওই একটি রুম ও টয়লেটের স্যাৎসেতে ভাব ও ময়লা আবর্জনায় তার বাড়িটিই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে তাদের স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে। না তিনি কাউকে বলতে পারছেন, না তিনি তার আত্মীয়টিকে সরাতে পারছেন।
আরেকটি ঘটনা বলি। এক ভদ্রমহিলা তার আলমারিতে নিজের সব রকমের নতুন কাপড় চোপড়, শাড়ী, ইত্যাদি বছরের পর বছর ধরে জমা করে রেখে দিচ্ছেন। অথচ স্বামী আর পুত্রের সংসারে তিনি ছেড়া ত্যানার মত কাপড় পরে থাকেন। বাড়িতে কোন অতিথি এলেও তার সেই ময়লা, ছেঁড়া, গন্ধওয়ালা কাপড়গুলো পাল্টান না। পুরানো প্লাস্টিকের ফেলে দেয়া বাক্সে তিনি ভাত, তরকারি খান। তার এসব বাক্স পাল্টে কাঁচের থালা বাসন দেয়ার চেষ্টা করা হলে তিনি খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেন আর সংসারে প্রচন্ড অশান্তি শুরু করেন। বাড়িতে কোন হেল্পিং হ্যান্ড রাখতে দেন না, তাদের হাতের তৈরি খাবার খাওয়া তো দূরের কথা। কখনও ডাইনিং টেবিলে পরিবারের অন্যদের সাথে খাবার খেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। নিজের টয়লেটে মাটি, বালি, চাপাতা, খবরের কাগজের টুকরা, ইত্যাদি জমা করে রাখেন। তার বাথরুম প্রচন্ড ময়লা থাকতে হবে, কোন হেল্পিং হ্যান্ড বা বাড়ীর কাউকে দিয়ে তিনি পরিষ্কার করাতে দেবেন না। অনেক সময় জোর জবরদস্তি করে ওনার টয়লেট ধোওয়ান ওনার পুত্র ও পুত্রবধু। যতই উনাকে অনুরোধ করা হোক না কেন তিনি তার এ ধরণের কাজগুলো করেই যাচ্ছেন।
জানা যায়, একটা সময় তিনি নিজের পুত্র ও পুত্রবধুকে ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখতেন বেশ কয়েক বছর। শুধুমাত্র তাদের অফিসে যাওয়া আসার সময় হলে তালা খুলতেন। বাইরের সমাজের সাথে যোগাযোগ বিছিন্ন করে রাখতেন সব সময়। কাউকেই বাড়িতে ঢুকতে দিতে চাইতেন না। সারাক্ষণ সন্দেহ ও জিম্মি হওয়ার ভয়ে থাকেন। সেই যুগলটির জীবন বলতে শুধু ছিল অফিস বাসা আর এই মায়ের অসুস্থ চিন্তার কাছে হার মানা। অথচ এ সবের জন্য আত্মীয় স্বজন আর সমাজের কাছে কথা শুনতে হয় পুত্র ও পুত্রবধুটিকেই....তাদেরকেই দোষারোপ করা হয় তাদের মা কেন এমন পোষক পরেন বা এমন আচরণ করেন। ভদ্রমহিলার রয়েছে মাথা ভর্তি উকুন। হাত, পায়ের নখ অনেক লম্বা লম্বা। উনার পুত্র ও পুত্রবধু এগুলো সরাতে বহু চেষ্টা করেও সফল হতে পারেননি। পরিণামে তিনি তার দরজা ভেতর থেকে বেশ কয়েক দিন লক করে রাখেন। শুধু মাত্র খাওয়ার সময় দরজায় অনেক্ষণ টোকা দিলে দরজা একটু ফাঁকা করে খাবারটা ঘরে ঢুকিয়ে আবার লক করে রাখেন। আর সেই সাথে রয়েছে নানা ধরণের ব্ল্যাকমেলিং। এখন কি তাহলে ওনাকে হাত পা বেঁধে পরিষ্কার করবে ওনার পুত্র?! এটা সেই পুত্রের পক্ষে কখনও সম্ভব না।
এরকম বহু অজানা ঘটনা রয়েছে একেকটি পরিবারের। সেই ভেতরের খবরগুলো আমরা জানতে পারি না সোস্যাল স্টিগমা আর ট্যাবুর কারণে। অথচ আমরা জানি এগুলো মানসিক রোগের লক্ষণ ও আচরণগত সমস্যা। কিন্তু তারা নিজেরা সেটা স্বীকার করতে চান না, উল্টা ভায়োলেন্স শো করেন। তারা নিজেরা চিকিৎসা সেবা নিতে চান না, মেডিসিনও খেতে চান না। পরিবারের বাকী সদস্যরা তাদের চিকিৎসা করানোর জন্য জোর জবরদস্তি করতে করতে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েন। এসব ঘটনায় পিষ্ট হচ্ছে পরিবারের বাকী সদস্যরাও। এসব মানুষের দায়িত্ব নিতে নিতে একসময় তারাও বৃদ্ধ হন, তাদেরও অন্যের দেখভাল করার ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যায়। একমাত্র ভুক্তভোগী ছাড়া বাইরের কেউ তাদের দেখে সমস্যাগুলো বোঝেন না, বুঝবেনও না। তারা এসব মানসিক সমস্যাগ্রস্থদের কাছে এক রকমের নিরুপায় অসহায়ত্ব বরন করে নেন। তারা একদিকে যেমন ক্লান্ত, তেমনি মানসিক ও সামাজিক ভাবেও বিপর্যস্ত।
তাহলে এখন এ ধরণের কেইসের ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কি? তাদেরকে বৃদ্ধাশ্রম, শেল্টার হোম বা অন্য কোন জায়গায় রাখা যেখানে এদেরকে পুর্নবাসন করা যায়? সেটা কি সম্ভব?! উত্তর হল, "না, সম্ভব না।" কারণ, আমাদের রয়েছে নানা ধরনের ট্যাবু, স্টিগমা ও সমাজচ্যুত হওয়ার ভয়। তাছাড়া উন্নত দেশগুলোর মত আমাদের দেশে কোন উন্নত কেয়ারগিভিং হোমও নেই যেখানে এদেরকে রেখে সেবাযত্ন দেয়া সম্ভব। হাতে গোনা দু'একটি হয়েছে বা হচ্ছে যেগুলোতে রাখার আর্থিক সামর্থ্যও সবার নেই। এখন সময় এসেছে এসব নিয়ে ভাববার!