14/07/2026
বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম।
আমাদের প্রিয় আপা ডা. জোবাইদা রহমান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান, সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ এবং উপস্থিত সুধীবৃন্দ—আসসালামু আলাইকুম।
আমি ডা. মীর রাশেখ আলম অভি, সহকারী অধ্যাপক ও আবাসিক সার্জন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রতিদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আপনাদের সামনে সংক্ষেপে তুলে ধরতে চাই।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বহির্বিভাগে ৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে ৪১৯ জন এবং ৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে ৩৮৫ জন রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। এর পাশাপাশি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫০ জন রোগীর ড্রেসিং এবং ১৫টি ছোট অপারেশন সম্পন্ন করা হয়। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করেন মাত্র ৫ জন মেডিকেল অফিসার, সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২:৩০টা পর্যন্ত। হিসাব করলে দেখা যায়, একজন চিকিৎসকের হাতে প্রতিটি রোগীর জন্য গড়ে মাত্র ৪ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড সময় থাকে।
এই অল্প সময়ের মধ্যেই একজন চিকিৎসককে রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস গ্রহণ, শারীরিক পরীক্ষা, পূর্ববর্তী রিপোর্ট মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা নির্ধারণ, প্রেসক্রিপশন লেখা, রোগী ও স্বজনকে কাউন্সেলিং এবং প্রয়োজন হলে ভর্তি বা অপারেশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ—সবই সম্পন্ন করতে হয়। ফলে রোগী যেমন প্রত্যাশিত সময় ও মনোযোগ থেকে বঞ্চিত হন, তেমনি চিকিৎসকরাও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা প্রদানে স্বাছন্দ্য বোধ করেন না।
বাস্তবতা হলো, এই সীমিত সময়ে নিরাপদ, মানবিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত চিকিৎসাসেবা প্রদান অসম্ভব।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো রোগী ব্যবস্থাপনা। একজন রোগীকে প্রথমে টিকিট সংগ্রহের জন্য একবার লাইনে দাঁড়াতে হয়, এরপর চিকিৎসকের জন্য আবার আলাদা লাইনে অপেক্ষা করতে হয়। এতে রোগীর ভোগান্তি যেমন বাড়ে, তেমনি বহির্বিভাগের কার্যক্রমও অপ্রয়োজনীয়ভাবে ধীর হয়ে যায়।
এছাড়া কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা না থাকায় জেলা হাসপাতালেই চিকিৎসাযোগ্য অনেক রোগীও সরাসরি ঢাকা মেডিকেলে চলে আসেন। এর ফলে তৃতীয় স্তরের এই হাসপাতালে প্রকৃত জটিল রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় সময়, মনোযোগ ও সম্পদ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
শুধু সার্জারি নয়, অন্যান্য বিভাগের বহির্বিভাগেও প্রায় একই চিত্র বিদ্যমান। উল্লেখ্য, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪,০০০ রোগী বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। তাই এটি কোনো একক বিভাগের সমস্যা নয়; এটি আমাদের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের বিশ্বাস, কয়েকটি বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ এই সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারে— • একটি জাতীয় রেফারেল সিস্টেম প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন; • ওয়ান-স্টপ নিবন্ধন ও ডিজিটাল কিউ ম্যানেজমেন্ট চালু • জেলা ও উপজেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে অধিকাংশ রোগীকে স্থানীয় পর্যায়েই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জনবহুল বাংলাদেশের বাস্তবতা উন্নত বিশ্বের মডেলের সরাসরি অনুকরণ নয়; বরং আমাদের জনসংখ্যা, সম্পদ, আর্থসামাজিক বাস্তবতা ও স্বাস্থ্যসেবার চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি "বাংলাদেশ মডেল" স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবী রাখে।
আমরা যারা প্রতিদিন এই বাস্তবতার মুখোমুখি হই, তারা আপনার নেতৃত্বে এই পরিবর্তনের অংশ হতে প্রস্তুত। আমাদের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব জ্ঞানকে কাজে লাগান। আমরা নীতিনির্ধারণ থেকে বাস্তবায়ন—প্রতিটি পর্যায়ে আপনাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
আমরা বিশ্বাস করি, আপনার দূরদর্শী নেতৃত্বে এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে একজন রোগী সঠিক সময়ে, সঠিক প্রতিষ্ঠানে এবং সঠিক চিকিৎসকের কাছ থেকে মানসম্মত সেবা পাবেন। সেই স্বাস্থ্যব্যবস্থাই হবে বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্জন—একটি সত্যিকারের "বাংলাদেশ মডেল"। "বাংলাদেশ মডেলের আলোকে গড়ে উঠুক সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ।
আপনাদের মূল্যবান সময় ও মনোযোগের জন্য ধন্যবাদ।