22/04/2026
মীরজাফর সবে মাত্র নবাব হয়েছেন। ইংরেজদের সাথে চুক্তির তিন কোটি টাকা মেটাতে গিয়ে তার তহবিল শূন্য হয়ে গেল। নবাবের সৈন্যবাহিনীর ঘোড়সওয়াররা মাইনে না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠল। ফলে নবাবী সৈন্যবাহিনী ভেঙে পড়ল।
নবাবের সেই দুরবস্থায় সুযোগ বুঝে বহু জমিদার ও ফৌজদারেরা নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। নবাব তখন বিদ্রোহীদের দমন করতে গিয়ে ইংরেজ ফৌজ ব্যবহার করতে বাধ্য হলেন।
গোরা ও তেলেঙ্গা সৈন্যদের সমস্ত খরচ নবাবকেই বহন করতে হবে, এই শর্তে ক্লাইভ নবাবকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসলেন। বিদ্রোহীরা তখনকার মত শায়েস্তা হল বটে, কিন্তু যুদ্ধের খরচ মেটাবার জন্য পর্যাপ্ত টাকা ছিল কোথায়? মীরজাফর ‘বর্ধমান’ ও ‘নদীয়া’ জেলার গোটা খাজনা ইংরেজদের নামে লিখে দিতে বাধ্য হলেন।
নবাবের খাজনা আদায়ের শাসনযন্ত্রে সেই যে ইংরাজদের প্রবেশ শুরু হল, এরপরে ধীরে ধীরে সারা ‘দেওয়ানী’ ও ‘নিজামত’ ইংরেজদের হাতে সম্পূর্ণভাবে চলে গেল। তখন থেকেই নবাবী শাসনযন্ত্র ক্রমশঃ অচল হয়ে পড়তে শুরু করল। নবাবের দরবারের সব ওমরাওরা তখন থেকেই উপলব্ধি করতে পারছিলেন যে তাঁদের দিন ক্রমশ শেষ হয়ে আসছে।
পলাশীর ষড়যন্ত্রে যেসব মনসবদারা মীরজাফরকে সাহায্য করেছিলেন, তারা বুঝে গেল যে মীরজাফর ইংরেজদের ‘ঠুটো জগন্নাথ’ মাত্র। তার হাত থেকে তাদের কোন কিছুই প্রাপ্তির কোন সম্ভাবনা নেই। মীরজাফরের এক বন্ধু আশা করেছিলেন যে নতুন নবাব তাকে যথোচিত পুরস্কার দেবেন।
কিন্তু তিনি কিছুই পেলেন না। আশাহত সেই আমীর, নতুন নবাবের নবাবিয়ানা ভেতর থেকে যে কতটা ফাঁপা, সেটা প্রকাশ্য দরবারে বাজিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন।
ওই ঘটনার আগের দিনই ক্লাইভের লোকজনদের সঙ্গে সেই আমীরের লোকজনদের প্রকাশ্যে হাতাহাতি হয়ে গিয়েছিল। পরের দিন সকালে নবাব মীরজাফর তার পুরনো বন্ধুর দিকে রক্ত চক্ষে তাকিয়ে বলেছিলেন, “জনাব, কর্নেল সাহেবের লোকেদের সঙ্গে কাল আপনার লোকেরা ঝগড়া বাঁধিয়েছিল। জনাবের কি জানা আছে, এই কর্নেল ক্লাইভ কে? জান্নাতের হুকুমে জাহানে তাঁর কি জায়গা?”
নবাবের পুরানো বন্ধু ‘মির্জা শামসুদ্দিন’ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সবার সামনেই উত্তর দিয়েছিলেন, “হুজুর নবাব বাহাদুর, কর্নেলের সঙ্গে ঝগড়া করব আমি? এই আমি? যে রোজ সকালে উঠে তার গাধাটাকে পর্যন্ত তিন বার সলাম না করে কোনো কাজ করে না? তবে কোন সাহসে আমি গাধাটার সওয়ারের সঙ্গে লাগতে যাবো?”
মীরজাফর ‘আলিবর্দি খানের’ মতো ‘মহাবৎ জঙ্গ’ নামে খ্যাত হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ‘ক্লাইভের গাধা’ নামে শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রসিদ্ধি হয়েছিল।
রাজকার্যে বীতশ্রদ্ধ হয়ে মীরজাফর‘ভাঙ’ খেয়ে চুর হয়ে থাকতেন। লোকে তাঁর ছেলে ‘মীরন’কে বলত ‘ছোট নবাব’। যত দিন সেই নিষ্ঠুর নবাবজাদা বেঁচেছিলেন তত দিন প্রকৃতপক্ষে তিনিই মীরজাফরের হয়ে রাজকার্য চালিয়ে গেলেন। তার হুকুমে ‘ঘসেটি বেগম’ ও ‘আমিনা বেগম’ - দুই নবাবনন্দিনীকে জলে ডুবিয়ে মারা হল।
‘ঘসেটি বেগম’ তাঁর সমস্ত লুকানো ধনরত্ন দিয়ে মীরজাফরকে পলাশীর ষড়যন্ত্রে সাহায্য করেছিলেন। শোনা যায় যে, জলে ডুবে মরবার আগে ওই দুই বোন মীরনের মাথায় ‘বজ্রাঘাতের’ অভিসম্পাত করে গিযেছিলেন।
মীরনের সব দুষ্কার্যের সাথী ছিলেন ‘খাদেম হোসেন খান। নয়া জমানায় সেই ‘খাদেম হোসেন খান’ ‘পূর্ণিয়ার ফৌজদার’ হয়ে বসলেন। তারপর মীরন ও খাদেম হোসেন খানের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে গেল। বিদ্রোহী খাদেম হোসেন খানের পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে খোলা মাঠে তাঁবুর মধ্যে ‘বজ্রাহত’ হয়ে মীরন মৃত্যুর মুখে পতিত হলেন।
ইংরেজদের টাকা মেটাতে না পারায় মীরজাফর প্রথমে মসনদচ্যুত হলেন। তারপরে আবার ইংরেজদের কৃপায় তিনি মসনদে বসেছিলেন, শেষে মীরজাফর ‘কুষ্ঠ রোগে’ মরেছিলেন। শেষের দিকে তিনি একপ্রকার মরিয়া হয়ে ইংরেজদের একবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আপনারা কি ভাবেন টাকার বৃষ্টি হয়?”
পলাশীর অপর নায়ক ছিলেন ‘রায় দুর্লভ’। নতুন নবাব ও তাঁর নতুন দেওয়ানের মধ্যে দু’ দিন যেতে না যেতেই মারাত্মক রেষারেষি শুরু হয়ে গেল। মীরজাফর সন্দেহ করলেন যে, রায় দুর্লভ সিরাজের ছোট ভাই ‘মীর্জা মেহদী’কে মসনদে বসিয়ে নিজে রাজত্ব করবার মতলব আঁটছেন।
সন্দেহের বশবর্তী হয়ে মীরন সেই নিরাপরাধ তরুণকে হত্যা করেন। এরপর রায় দুর্লভের উপরে চোরা গোপ্তা আঘাত হানবার ফিকির খুঁজতে থাকেন।
ক্লাইভের কৃপায় রায় দুর্লভের প্রাণ রক্ষা হয়েছিল। কিন্তু তারপরেই মীরন ঢাকার ‘রাজবল্লভ’কে ডেকে এনে রায় দুর্লভকে তার হাতে রাজকার্য তুলে দেবার হুকুম দিলেন। ফলে রায় দুর্লভের দু’ দিনের দেওয়ানী ঘুচে গেল। রায় দুর্লভ কলকাতায় পালিয়ে গিয়ে নিজের ধন প্রাণ বাঁচাতে সমর্থ হলেন।
যদিও তার সঞ্চিত ধন তাঁর উত্তরপুরুষদের ভোগে লাগে নি। ছেলে ‘রাজবল্লভ’ ইংরেজ আমলে ‘রায় রায়ান’ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর একমাত্র সন্তান ‘মুকুন্দবল্লভ’ তাঁর জীবদ্দশাতেই মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ায় রায় দুর্লভের বংশ চিরতরে লোপ পেল।
সিরাজের বিশ্বস্ত প্রধানমন্ত্রী ‘মোহনলাল কাশ্মীরী’কে রায় দুর্লভ বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন। পলাশীর যুদ্ধের ঠিক আগে নিযুক্ত সিরাজের আরেক বিশ্বস্ত কাবুলী সেনাপতি ‘খাজা আবদুল হাদি খান’কে মীরজাফর বিশ্বাসঘাতকতা করে হত্যা করেন। ঢাকার ভূতপূর্ব নায়েব ‘রাজবল্লভ সেন’ পরে ‘পাটনার নায়েব’ হলেন। যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত মীরকাশিমের হুকুমে গঙ্গাবক্ষে সলিল সমাধি প্রাপ্ত হলেন।
হুগলীর অস্থায়ী ফৌজদার ‘নন্দকুমার’ পরে মীরজাফরের ‘দেওয়ান’ হয়েছিলেন। তিনিও শেষ পর্যন্ত ‘ওয়ারেন হেস্টিংসের’ ষড়যন্ত্রের বলি হয়ে ফাঁসিতে প্রাণ দিয়েছিলেন। সিরাজের অতি বিশ্বস্ত গুপ্তচর ও ‘পাটনার নায়েব’ ‘রামনারায়ণ’ নবাব মীরকাশিমের হুকুমে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হলেন। অর্থাৎ পলাশীর যুদ্ধের কুড়ি বছরের মধ্যে প্রায় সমস্ত ‘মহাবৎজঙ্গী’ ওমরাওরা সমূলে বিনষ্ট ও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেন।
‘জগৎশেঠ মহাতাব রায়’ ও ‘মহারাজা স্বরূপচন্দের’ পরিণামও ভয়াবহ হল। নবাব মীরকাশিম আরো অনেকের সঙ্গে সেই দুই প্রধান শেঠকে গঙ্গার জলে ডুবিয়ে হত্যা করেন। ওই ঘটনায় জগৎশেঠ পরিবারের ব্যবসা যে ঘা খেল, সেটা থেকে তারা আর উঠে দাঁড়াতে পারেন নি।
দেওয়ানী হাতে পেয়েই ক্লাইভ রুক্ষভাবে তাঁদের উত্তরাধিকারীর কাছ থেকে রাজকোষের চাবি ছিনিয়ে নিল। রাজকোষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযোগের ভিত্তিতেই জগৎশেঠের বিশাল ব্যবসা গড়ে উঠেছিল। সেই সংযোগ ঘুচে যাবার পরে তাদের ব্যবসাও আর টিকে থাকে নি। ইংরেজরা অসংখ্য প্রকারে ওই পরিবারের কাছে ঋণী ছিল। সেই ঋণ তারা চরম বেইমানি দিয়েই শোধ করল।
নদীয়ার রাজা ‘কৃষ্ণচন্দ্র’ তলে তলে পলাশীর ষড়যন্ত্রে ইংরেজদের সাহায্য করেছিলেন। ইংরেজরা সে সবও মনে রাখে নি। তিন কোটি টাকার দাবি মেটাতে মীরজাফর লিখে দিয়েছিলেন যে নদীয়া জমিদারীর খাজনা মুর্শিদাবাদে না গিয়ে ইংরেজদের ‘তনখা’ হয়ে কলকাতায় যাবে।
ওই টাকা আদায় করবার জন্য ইংরেজরা কৃষ্ণচন্দ্রকে অশেষ উৎপীড়ন করল। এমন কি সনাতন হিন্দু সমাজের প্রধান ধারক ও বাহক সেই রাজার ‘জাতিনাশ’ করবার ভয় পর্যন্ত দেখানো হল। শেষে বুড়ো বয়সে তাঁর জমিদারী অপরিমেয় ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ল। রাজা মারা যাবার পরে তার বংশধরেরাও সেই জমিদারীকে আর রক্ষা করতে পারল না। ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূর্যাস্ত আইনে’ নদীয়া জমিদারীর প্রায় সব নিলাম হয়ে গেল। © রাজিক হাসান