22/07/2026
পরাজয়ে ডরে না বীর!
“পরাজয়ে ডরে না বীর”—বাক্যটির ‘পরাজয়ে’ শব্দটির কারক ও বিভক্তি নির্ণয় করুন।
বাদ দিন কারক-বিভক্তি। বরং দেখুন—পরাজয় হলে বীর আসলেই ডরায় না! তার প্রমাণ—FIFA World Cup Final!
বীররা যখন দেখলেন, পরাজয় একেবারে সম্মুখে, তখন ডরানো বাদ দিয়ে—
“মারেংগে ওর মরেংগে” করে খেলা শুরু করলেন।
মনে হলো, পরীক্ষার প্রশ্ন আগের রাতেই হাতে পেয়েছেন। বেশ নিশ্চিন্তে ছিলেন, এমন ভাব নিয়ে পরীক্ষার খাতা খুলে উত্তর দেওয়া—থুক্কু, খেলা শুরু করলেন।
কিন্তু পরে বোঝা গেল, প্রশ্ন কমন পড়েনি!
(পড়ুন—রেফারি! 😄)
খেলার শুরুটা দেখে মনে হচ্ছিল, পড়ার রাম, শ্যাম, যদু, মধু—সবার সঙ্গে জাম্বুরা দিয়ে খেলছেন।
কিন্তু সেই জাম্বুরাটাও যেন কিছুতেই তাঁদের নাগালের মধ্যে আসছিল না!
আমি অবশ্য রাতের ঘুম নষ্ট করে খেলা দেখেছি। নিজের ইচ্ছায় নয়—আমার পুত্রদের পাশে থাকার জন্য।
পুত্রদের উদ্দেশ্যে তাই আমার ছোট্ট একটি বাণী:
এই পৃথিবীতে Unconditional Love যদি কোথাও থেকে থাকে, তবে তা মায়ের ভালোবাসায়।
(যদিও ক্ষেত্রবিশেষে সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে! )
তাই হে পুত্রগণ!
তোমরা জিতলেও আমি আছি, হারলেও আমি আছি।
কিন্তু মনে রেখো—প্রিয় মানুষ, প্রিয় দল কিংবা প্রিয় কোনো পক্ষ যদি অন্যায় করে, তাহলে সবচেয়ে আগে যেন তোমাদের তরফ থেকেই প্রতিবাদের আওয়াজ ওঠে।
“রং নাম্বার!” থুক্কু—এটা অন্যায়। এটা ভুল।
আজ ভালো খেলেনি।
কারণ, খেলায় হার-জিত থাকবেই। এটাই চিরন্তন সত্য।
কিন্তু দল হেরে যাচ্ছে দেখে মুরগির রান বাদ দিয়ে নিজের নখ খেয়ে ফেলা—এটা কি কোনোভাবেই ঠিক? 😄
ছোটবেলায় আমি খেতে চাইতাম না। আম্মা আমাকে ভাত খাওয়ানোর সময় নানা রকম গল্প শোনাতেন। যতক্ষণ গল্প চলত, ততক্ষণ আমার খাওয়াও চলত। গল্প বন্ধ—আমার খাওয়াও বন্ধ!
শেষ পর্যন্ত আম্মা রাগ করে মেজভাইকে বলতেন,তুই ওকে খাইয়ে দে।
আমার মেজভাই ছিলেন একজন ভালো হকি খেলোয়াড়। তাই খেলাধুলা সম্পর্কে আমার প্রাথমিক জ্ঞান, ভালোবাসা এবং আগ্রহ—সবটাই তাঁর কাছ থেকে পাওয়া।
মেজভাইয়ের প্রিয় খেলোয়াড় ছিলেন পেলে। পেলের সাথে মেজভাই এর ছবিও আছে।
তিনি যখন খেলা দেখতেন, আমাকে পাশে বসিয়ে খেলা দেখাতেন। আর সেই সময় থেকেই আমার পছন্দের দল হয়ে গেল—ব্রাজিল।
এরপর আমি যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি, তখন আমাদের পাঠ্যপুস্তকে পেলেকে নিয়ে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় জীবনীমূলক গল্প পড়েছিলাম—কালোমানিক পেলে।
সেই গল্পে ফুটে উঠেছিল পেলের কঠোর সংগ্রাম, দারিদ্র্যকে জয় করে ওঠার গল্প এবং বিশ্বসেরা ফুটবলার হয়ে ওঠার এক অবিশ্বাস্য যাত্রা।
পেলের পুরো নাম এদসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। ডাকনাম—পেলে।
দারিদ্র্যের মধ্যেই তাঁর বেড়ে ওঠা। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। ছোটবেলাতেই জীবিকার প্রয়োজনে তাঁকে কাজ করতে হয়েছিল। কখনো রাস্তায় জুতা পরিষ্কার করেছেন, কখনো চায়ের দোকানে কাজ করেছেন। অর্থের অভাবে পড়াশোনাও চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু তাঁর রক্তে ছিল ফুটবল।
একটি আসল ফুটবল কেনার সামর্থ্য তাঁর পরিবারের ছিল না। তাই পুরোনো খবরের কাগজ বা কাপড়ের টুকরো দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে গোল বল বানিয়ে, সেটি মোজার ভেতরে ঢুকিয়ে ফুটবল খেলার অনুশীলন করতেন ছোট্ট পেলে। বন্ধুদের সঙ্গে খালি পায়ে ব্রাজিলের অলিগলিতে সেই কাগজের বল দিয়েই তিনি শিখেছিলেন ড্রিবলিং, শট এবং ফুটবলের অসাধারণ কৌশল।
দারিদ্র্য তাঁকে থামাতে পারেনি।
অভাব তাঁর প্রতিভাকে ঢেকে রাখতে পারেনি।
শত বাধার মধ্যেও ফুটবলের প্রতি তাঁর অদম্য ভালোবাসা এবং অসাধারণ প্রতিভা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল বিশ্বসেরার মঞ্চে।
মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি Santos FC-তে যোগ দেন। ১৭ বছর বয়সে ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে খেলেন এবং তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্সে ব্রাজিল বিশ্বকাপ জয় করে।
সেই বিশ্বকাপ থেকেই শুরু হয় এক কিংবদন্তির বিশ্বজয়।
পেলে শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না—তিনি ছিলেন একটি অনুপ্রেরণার নাম।
দারিদ্র্য থেকে উঠে এসে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর এক জীবন্ত গল্প।
২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর, ৮২ বছর বয়সে পেলে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কোলন ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সাও পাওলোর আলবার্ট আইনস্টাইন হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
কিন্তু কিংবদন্তিরা কখনো সত্যিকার অর্থে চলে যান না।
তাঁরা থেকে যান ইতিহাসে, মানুষের স্মৃতিতে, আর প্রজন্মের পর প্রজন্মের অনুপ্রেরণায়।
ব্রাজিল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৫ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে—
১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ এবং ২০০২ সালে।
আর আমি?
আমি এখনো সেই ছোট্ট মেয়েটিই আছি—
যে মেজভাইয়ের পাশে বসে খেলা দেখত,
যে পেলের গল্প পড়ে মুগ্ধ হতো,
আর যে ব্রাজিলের খেলা দেখলে আজও বুকের ভেতর অন্যরকম একটা আনন্দ অনুভব করে।
তাই জয় হোক বা পরাজয়—
জিতলে আনন্দ করবো, হারলে কষ্ট পাবো।
কিন্তু অন্যায়কে অন্যায়ই বলবো।
কারণ, ভালোবাসা মানে অন্ধ সমর্থন নয়।
ভালোবাসা মানে প্রিয় মানুষকে, প্রিয় দলকে—ভুল হলে ভুল বলতে পারার সাহসও।
আর হ্যাঁ—
“পরাজয়ে ডরে না বীর”—
এই কথাটা শুধু পরীক্ষার খাতায় কারক-বিভক্তি নির্ণয়ের জন্য নয়,
জীবনের জন্যও মনে রাখা দরকার।
কারণ,
জীবনে হার মানেই শেষ নয়।
কখনো কখনো পরাজয়ই মানুষকে শেখায়—কীভাবে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়।
ছবিগুলো গুগল থেকে নেওয়া