14/08/2026
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা: মৃত্যু-আহত, কর্মশক্তি ও স্বাস্থ্যব্যয়ের উপর প্রভাব.
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যে বিরাট ফারাক আছে। ২০১৫ থেকে ২০২২ পর্যন্ত আট বছরের হিসাবে:
-নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) বলছে ৩২,১৯৫টি দুর্ঘটনায় ৪৩,২২০ জন নিহত ও ৫৪,৩৮১ জন আহত;
-সেভ দ্য রোড বলছে ১,৩০,৫০৯টি দুর্ঘটনায় ৪০,৫২৩ জন নিহত ও ১,৮২,৩০৮ জন আহত;
-যাত্রী কল্যাণ সমিতি সাত বছরে ৪৪,১৭১টি দুর্ঘটনায় ৬১,৬৫৬ জন নিহত ও ১,১২,৭৫৩ জন আহতের কথা বলছে;
-আর রোড সেফটি ফাউন্ডেশন চার বছরে ২১,৬২৮টি দুর্ঘটনায় ২৪,৬৩৯ জন নিহত ও ৩৪,৫৬৫ জন আহতের হিসাব দিচ্ছে।
এই বিভ্রান্তির মূল কারণ হলো, প্রতিটি সংস্থা ভিন্ন পদ্ধতিতে (পত্রিকা রিপোর্ট, পুলিশ কেস, হাসপাতাল রেকর্ড) তথ্য সংগ্রহ করে। এমনকি WHO-র হিসাব অনুযায়ী ২০২১ সালে প্রকৃত মৃত্যু ছিল প্রায় ৩২,০০০ — যেখানে সরকারি পরিসংখ্যান অনেক কম দেখায়; ২০২০-২১ সালে দেশীয় পরিসংখ্যান প্রায় ৪ হাজার আর গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ প্রায় ১১ হাজার মৃত্যুর কথা বলছে।
সাম্প্রতিক দূর্ঘটনার প্রবণতা স্পষ্ট ঊর্ধ্বমুখী: গত বছর ৬,২৭৬ জন কর্মক্ষম বয়সী (১৮-৬৫ বছর) মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর ৮১.৩৬%। ২০২৫ সালে BRTA-র হিসাবে ৫,৪৯০ জন নিহত হয়েছেন, যা রেকর্ড সর্বোচ্চ, আর ২০১৮ সালে (নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের বছর) ছিল ২,৬৩৫ জন — আট বছরে দ্বিগুণেরও বেশি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে সংখ্যা আরও বেশি: ২০২৫ সালে ৭,৩৫৯ জন নিহত ও ১৬,৪৭৬ জন আহত হয়েছেন, এবং এর মধ্যে ৫,৭২৩ জন (মোট মৃত্যুর প্রায় ৭৮%) ছিলেন ১৮-৬৫ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী।
মৃত্যু কীভাবে কর্মশক্তির ক্ষতি করছে
এখানেই ট্র্যাজেডিটা সবচেয়ে গভীর কারন নিহতদের প্রায় চার-পঞ্চমাংশই কর্মক্ষম বয়সের (১৮-৬৫)। এর মানে দেশ শুধু মানুষ হারাচ্ছে না, উৎপাদনশীল শ্রমশক্তি, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এবং ভবিষ্যৎ কর-রাজস্বও হারাচ্ছে।
শুধু কর্মশক্তি ক্ষতির কারণে বার্ষিক ক্ষতি দাঁড়ায় প্রায় ২৩,৪৬০ কোটি টাকা, আর সম্পদের ক্ষতি যোগ করলে মোট ক্ষতি জিডিপির ১.৫ শতাংশেরও বেশি হতে পারে। এছাড়া, ১৪ বছরের কম ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মিলিত মৃত্যুর হার মোট মৃত্যুর ৪০%, যা আঞ্চলিক গড়ের চেয়ে বেশি, এবং পথচারী ও সাইকেল আরোহীর মতো ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারকারীরা মোট মৃত্যুর ৩৪%।
আহত (morbidity) ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ঃ
মৃত্যুর তুলনায় আহতের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ — এবং এরাই দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রকৃত চাপ তৈরি করে (দীর্ঘ সময় হাসপাতালে ভর্তি থাকা, অস্ত্রোপচার, পুনর্বাসন, স্থায়ী প্রতিবন্ধিতা)।
মাথা ও মেরুদণ্ডের আঘাত সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় অংশ, যেখানে চিকিৎসা ব্যয়, আইসিইউ, নিউরো-রিহ্যাবিলিটেশন এবং দীর্ঘমেয়াদী অক্ষমতার কারণে পরোক্ষ ব্যয় (উৎপাদনশীলতা হ্রাস, পারিবারিক যত্নদাতার সময়) অনেক বেশি। মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাবগুলোতে চিকিৎসা ব্যয়কে একটি প্রধান উপাদান হিসেবে ধরা হয়: ২০২৫ সালে আনুমানিক ২৫,৫৫০ কোটি টাকা অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, যার মধ্যে চিকিৎসা ব্যয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস ও সম্পদের ক্ষতি অন্তর্ভুক্ত।
মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি:
বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন সময়ে ভিন্ন অনুমান পাওয়া যায়, কিন্তু সবগুলোই বলছে ক্ষতি বিশাল ও ক্রমবর্ধমান:
- প্রতি বছর ১.২ বিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতি, যা জিডিপির ২% এবং দেশের প্রাপ্ত সমুদয় বৈদেশিক সাহায্যের সমান।
- জাতীয় হিসাবে ৪৫০ কোটি টাকা (জিডিপির ১.৬%-এর বেশি) যদিও এটি পুরনো হিসাব।
- ২০২১ সালে মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি জিডিপির প্রায় ৫% বলে অনুমান করা হয়েছে।
- WHO-র সাধারণ হিসাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনায় জিডিপির ৩% পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে।
প্রতিরোধ করলে বাংলাদেশ প্রতি বছর কী পরিমাণ লাভবান হতো। এখানেই সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক অংশ — ক্ষতি প্রতিরোধযোগ্য এবং তুলনামূলক কম বিনিয়োগেই বড় সাশ্রয় সম্ভব: জিডিপির মাত্র ০.২% (প্রায় ৭৬৮ মিলিয়ন ডলার) বার্ষিক বিনিয়োগ করলে প্রায় ১১,০০০ জীবন বাঁচানো সম্ভব — যেখানে বর্তমান জিডিপি ক্ষতি ৫%, অর্থাৎ বিনিয়োগ-প্রতিদান অনুপাত অত্যন্ত অনুকূল।
যদি প্রতি বছর জিডিপির ৩-৫% (বর্তমান $৫১০ বিলিয়ন জিডিপির ভিত্তিতে আনুমানিক $১৫-২৫ বিলিয়ন বা ১৮,০০০-৩০,০০০ কোটি টাকার বেশি) ক্ষতি বন্ধ করা যেত, তাহলে —
- হাজার হাজার কর্মক্ষম মানুষ শ্রমশক্তিতে থেকে যেতেন (উৎপাদন ও কর-রাজস্ব বৃদ্ধি),
- ট্রমা/নিউরোসার্জারি ও পুনর্বাসন খাতে সরকারি স্বাস্থ্যব্যয়ের একটি বড় অংশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বা অবকাঠামোয় সরানো যেত,
- এই সাশ্রীত অর্থ দিয়ে বছরে একাধিক মেট্রোরেল লাইন বা বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হতো (তুলনার জন্য: শুধু ঢাকার যানজটেই বছরে ৩৭,০০০-৫৫,০০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়, যা দুটি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের জন্য যথেষ্ট এবং প্রতি বছর ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়)।
গত এক দশকে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা ক্রমাগত বেড়েছে, মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা রেকর্ড ছুঁয়েছে, আর ভুক্তভোগীদের সিংহভাগ কর্মক্ষম বয়সী — ফলে এটি শুধু জনস্বাস্থ্য নয়, একটি সরাসরি সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমস্যা। জিডিপির ৩-৫% বার্ষিক ক্ষতির বিপরীতে মাত্র ০.২% বিনিয়োগে হাজার হাজার জীবন ও কোটি কোটি টাকা বাঁচানো সম্ভব — অর্থাৎ প্রতিরোধ একটি অর্থনৈতিকভাবেও অত্যন্ত লাভজনক বিনিয়োগ, শুধু মানবিক দায়বদ্ধতা নয়।