10/09/2024
আত্মহত্যা এবং আমাদের দেশের নেতিবাচক ধারণা
সব ধর্মে আত্মহত্যা মহাপাপ। কিন্তু তারপরেও একজন মানুষ কেনো আত্মহত্যা করে কখনো কি প্রশ্ন করেছেন? ধর্মমতে আমরা জানি যে আত্মহত্যা করলে নিশ্চিত দোজখ কিংবা নরক। তাহলে কেনো মানুষ দোজখে কিংবা নরক বেছে নেয়।
গবেষণায় জানা যায়, পৃথিবীর ৯০% মানুষের আত্মহত্যার একমাত্র কারণ গুরুতর মানসিক অসুস্থতা। এখন আসি এই গুরুতর মানসিক রোগগুলো কি কি? গুরুতর মানসিক রোগগুলো হলো সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার এবং তীব্র বিষন্নতা। একজন মানুষ যখন গুরুতর মানসিক সমস্যায় ভুগেন তখন তার বিভিন্ন ধরনের সমস্যা বা লক্ষণ দেখা দেয়। যেমন:- হ্যালুসিনেশন, ডিল্যুশন, আত্মহত্যা প্রবণতা এমনকি রোগের প্রকট বেশি হলে সেই রোগী আত্মহত্যা পর্যন্ত করে।
সহজ বাংলায় হ্যালুসিনেশন এবং ডিল্যুশনের কথা বলি ধরেন আপনার আশেপাশে কিছুই নেই তারপরেও আপনি কানে গায়েবি কথা শুনতে পারতেছেন কিংবা দেখতে পারতেছেন, আপনি খাইতেছেন পানি কিন্তু স্বাদ পাচ্ছেন কেরোসিনের,এমনও হইতে পারে আপনার শরীরে কিছুই নেই কিন্তু আপনার বিশ্বাস আপনার শরীরে পোকা হাটতেছে এগুলা হলো হ্যালুসিনেশন। হ্যালুসিনেশনের একটা ধরণ আছে যাকে বলা হয় "Command hallucination " এই হ্যালুসিনের রোগীরা গায়েবি শব্দ কমান্ড আকারে শুনে,যেমন "তুই খারাপ"," তুই অপরাধী","তুই মর" এরকম গায়েবি শব্দ বারবার শুনতে শুনতে মানুষ জীবনের উপর অতীষ্ঠ হয়ে আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।। (আমি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের সামনের প্রধান সড়কে একদিন একটি মেয়েকে দেখি গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির নিচে পড়ে আত্মহত্যা করার জন্য,আমি যখন বুঝলাম মেয়েটি মানসিকভাবে অসুস্থ এবং সে আত্মহত্যা করতে চাইতেছে তখন তাকে উদ্ধার করি এবং জানতে পারি সে সর্বদা শুনে কেউ একজন থাকে বলতেছে "তুই পঁচা, তুই মর" এই কথা শুনতে শুনতে সে সহ্য করতে না পেরে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়)
ডিল্যুশন হইলো একটি মিথ্যা বিশ্বাস যেমন ধরেন একজন ভাবতেছে তার পরিবারের লোক তাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলতে চাইতেছে, কিংবা অন্যকেউ ক্ষতি করতে চাইতেছে যদিও তার পরিবারের লোক কিংবা অন্য কেউই তার ক্ষতি করতে চাইতেছে না। এমনকি তার বিশ্বাস যে মিথ্যে তার প্রমাণ দিলেও সে আপনার কথা গ্রহণ করবে না। এককথায় বিনা কারণে সন্দেহ করাও বলা যায়। আবার এরকম দেখবেন অনেকে নিজেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ভাবতেছে বাস্তবে সে একজন নিম্নবিত্ত, আবার অনেকে দেখবেন ভাবে নিজেকে অনেক বড়লোক বাস্তবে গরীব।
এরকম সমস্যা দেখা দিলে আপনি সেই ব্যক্তিকে অতিসত্বর মানসিক চিকিৎসকের কাছে নেন।
তাছাড়া তীব্র বিষন্নতার রোগীরা নিজেকে তুচ্ছ ভাবে,অনেকে আবার নিজেকে অপরাধী ভাবে। এবং সময়ের সাথে সাথে তারা রোগের তীব্রতা বৃদ্ধি পায় এবং মানুষ আত্মঘাতী হয়ে যায়।
এখন আমার মেডিকেলের এক বন্ধুর কথা বলি,বন্ধুর নাম রাজু (ছদ্মনাম), একদিন শুনলাম রাজু আত্মহত্যা করেছে। আমরা যারপরনাই কষ্ট পাইছি। আমাদের ব্যাচের সবাই বিভিন্ন কথা বলতেছে "কেউ বলতেছে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে সে আত্মঘাতী হইছে", কেউ আবার বলতেছিলো "মেডিকেলের পড়ার চাপে সে আত্মহত্যা করেছে" কিন্তু কিছুদিন পর তার পরিবারের কাছ থেকে জানতে পারলাম সে মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলো তার বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার নামের মানসিক রোগ ছিলো।
সত্যি বলতে আমাদের দেশে অসংখ্য রাজু আছে যারা মানসিক অসুস্থতার জন্য আত্মহত্যা করে নিজের জীবন শেষ করে দেয়। শুধু নিজের জীবন না এর প্রভাব পড়ে গোটা পরিবারে।
এখন আমার ছোটবেলার একটি ঘটনা বলি,আমাদের পাশের বাড়ির একজন মহিলা আত্মহত্যা করেছেন। গ্রামের সবাই ঝুলে থাকা লাশ দেখতে গেছেন কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখলাম সেই মহিলার জানাজায় কেউ অংশগ্রহণ করলো না। মানুষের ধারনা আত্নহত্যা করা রোগীদের জানাজায় যাওয়া ঠিক নয়। পরে মা-বাবাদের কাছে শুনছিলাম মহিলার মানসিক রোগ ছিলো।
বাস্তবে সে অসুস্থতার জন্য আত্মহত্যা করেছে এবং যারা অসুস্থতার কারণে আত্মহত্যা করে তারা দীর্ঘদিন মানসিক রোগে আক্রান্ত থাকে। কিন্তু অসুস্থ মানুষটি বেঁচে থাকার সময় কারোর সহানুভূতি সহযোগিতা পায়নি এবং মৃত্যুর পরেও তাকে আমরা প্রাপ্য সম্মান দেই নাই।।
হ্যা আত্মহত্যা মহাপাপ, কিন্তু মহাপাপ হবে সে যদি সুস্থ থাকে। গুরুতর মানসিক অসুস্থ ব্যক্তিকে যেখানে পৃথিবীর আদালত শাস্তি দেয় না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালাও তাকে ক্ষমা করবেন।কারণ এই আত্মহত্যা স্বেচ্ছায় নয়, নিজের অজান্তে এবং অসুস্থতার কারণে।
"The TRANSFORM Bangladesh" প্রজেক্টের মাধ্যমে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করতেছি এবং মানসিক অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসার আওয়তায় এনে সুস্থ করা এবং আত্মহত্যা কমিয়ে আনার জন্য কাজ করে যাচ্ছি।।
আসুন আমরা আত্মহত্যাকে না বলি কিন্তু আত্মহত্যাকারীকে নয়। মানসিক অসুস্থ রোগীর পাশে দাঁড়াই, আত্মহত্যার প্রবণতা কমাই।