05/04/2026
বাবা হারানোর গল্প এবং নিউরোফিটের যাত্রা
২০২৪ সালের ১৪ জানুয়ারি রাতে হঠাৎ করে বাড়ি থেকে ছোট বোনের ফোন এল। সে কাঁদতে কাঁদতে জানাল—
“বাবা হঠাৎ জোরে একটা শব্দ করে মাটিতে পড়ে গেছে। এরপর থেকে আর দাঁড়াতে পারছে না, মুখ দিয়েও কোনো কথা বলতে পারছে না।”
বাড়ির সবাই তখন আতঙ্কে কাঁদছিল। তাদের মনে হচ্ছিল বাবা বুঝি মারা যাচ্ছেন। আমি তখনই বুঝে গেলাম—বাবা সম্ভবত বড় ধরনের ব্রেইন স্ট্রোক করেছেন।
আমি বললাম, দ্রুত বাবাকে লাকসাম বা কুমিল্লার কোনো হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে। আমি ঢাকায় থেকে রওনা হচ্ছি, পরে ঢাকায় এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করব।
আমার বড় ভাগনি নিশু, মেঝো বোন এবং ভাতিজারা মিলে প্রথমে বাবাকে লাকসামে নিয়ে যায়, পরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়। সিটি স্ক্যান করার পর ডাক্তাররা পরিস্থিতি দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তারা বাবাকে দ্রুত ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে রেফার করেন।
কুমিল্লা থেকে বাবাকে দ্রুত ঢাকার পথে পাঠানো হয়। এই সময় আমি এবং আমার ভাগিনা সোহেল ট্রেনে করে ঢাকা থেকে কুমিল্লার দিকে যাচ্ছিলাম।
বাবা যখন ঢাকার পথে, তখন আমাদের প্রতিষ্ঠানের একজন টিম মেম্বার জসিম রাত প্রায় দুইটার দিকে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে গিয়ে অপেক্ষা করছিল। ইমার্জেন্সি বিভাগের ডাক্তার প্রথমে বললেন রোগী নিয়ে আসতে। কিন্তু রোগীর অবস্থা দেখে পরে জানালেন—সিট খালি নেই।
একজন স্ট্রোক রোগীকে যদি নিউরোসায়েন্স হাসপাতালেই রাখা না যায়, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়?
অবশেষে কোনো উপায় না পেয়ে বাবাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বাবার মাথায় তখনও অবিরাম রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। আমার একটাই আশা ছিল—যেভাবেই হোক রক্তক্ষরণ বন্ধ করে বাবাকে আগে স্থিতিশীল করা।
আমার বিশ্বাস ছিল, যদি অপারেশনের মাধ্যমে বাবাকে কিছুটা স্থিতিশীল করা যায়, তাহলে পরে ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাঁকে আবার সচল করে তুলতে পারব।
এই আশাতেই বাবার অপারেশন করানো হয় ঢাকা মেডিকেলে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অপারেশনের পর আর কখনো বাবার জ্ঞান ফিরে আসেনি।
ঢাকা মেডিকেলে আমরা অনেক মানুষের সহানুভূতি ও সাহায্য পেয়েছি, এজন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু এটাও সত্য—ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসা ব্যবস্থার অনেক জায়গায় মানবিকতার ভয়াবহ অভাব রয়েছে। হয়তো এটিই আমাদের রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার একটি কঠিন প্রতিচ্ছবি।
আমাদের কোনো সিট ছিল না। অপারেশনের পর বাবার মাথা থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছিল। কয়েক ঘণ্টা পর একজন এসে বললেন—
“আপনার বাবাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে হবে।”
আমি হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলাম—
“কোথায় নিয়ে যাব? সিঁড়িতে?”
উত্তরে তিনি বললেন—
“যেখানে পারেন নিয়ে যান। এখানে বেশি সময় রাখা যাবে না।”
আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম।
হাড় কাঁপানো তীব্র শীতের রাতে আমরা বাবাকে হাসপাতালের সিঁড়িতে শুইয়ে রেখেছিলাম। ঠান্ডা বাতাস শরীর কেটে নেওয়ার মতো লাগছিল। আমার ছোট বোন নাজু বাবার পাশে বসে ছিল। আর আমি এবং সোহেল দৌড়াদৌড়ি করছিলাম অপারেশন ও চিকিৎসার ব্যবস্থার জন্য। পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেলের আরেক মহিয়সী নার্স রেশমা আপুর সহযোগিতায় বাবাকে মৃত্যু পর্যন্ত পোস্ট অপারেটিভ রুমে রাখতে পেরেছিলাম । আমি পেইড রুমের জন্য আবেদন করেছিলাম, পেইড রুম যখন পেয়েছি বাবা তখন মারা যায় ।
১৭ জানুয়ারি রাত প্রায় ১১টার দিকে বাবা মারা যান।
সেই মুহূর্তটি আমার জীবনের সবচেয়ে নির্মম স্মৃতিগুলোর একটি। সেদিন বিকালে আমার স্ত্রী আমাদের ছেলে মেয়েকে নিয়ে বিকালে তার দাদাকে শেষ বারের মত দেখে আসে ।
ওইদিন রাত ৯ টার তিন দিন পর আমি বাসায় ফিরেছিলাম শুধু গোসল করার জন্য। আমার সাথে ছিল আমার ছোট ভাই মহিন । বাসায় এসে গোসল করে ভাত নিয়ে বসছি , এমন সময় সোহেল ফোন দিয়ে বলে মামা নানার অবস্থা বেশি খারাপ । তাড়াতাড়ি আসেন । রাত প্রায় ১০টার দিকে আমি মহিনকে নিয়ে আবার হাসপাতালে ফিরলাম। পোস্ট-অপারেটিভ রুমের সামনে গিয়ে দেখি—বারান্দায় একটি ট্রলিতে আমার বাবা নিথর হয়ে শুয়ে আছেন।
বাবা আর নেই।
মনে হচ্ছিল যেন পুরো পৃথিবীটা ভেঙে পড়েছে।
রাতে যখন বাবাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আরও এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখি। আমার মেঝো বোনের একমাত্র মেয়ে আইরিশ ছিল বাবার অত্যন্ত প্রিয়। সে তার নানার মৃত্যুকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। স্ট্রোক হওয়ার পরও বাবা তার হাত ধরেছিলেন।
নানার নিথর দেহ দেখে সে হতবিহ্বল হয়ে গিয়েছিল।
মা, বোন, ভাগনি, ফুফু এবং আত্মীয়স্বজনদের কান্নায় পুরো বাড়ি ভারী হয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল এই কান্না যেন কখনো থামবে না। মা এখনো বাবার কথা মনে করে বিলাপ করে ।
এদিকে আমার ছোট বোনের স্বামী রিপন আগের দিন ফোন করে বলছিল—
“ভাইয়া, আমরা টিকেট কাটতেছি। বাবাকে দেখতে দেশে আসব।”
আমার ছোট বোন মর্জিনা লন্ডন থেকে অনবরত কাঁদছিল। সে শেষবারের মতো বাবাকে দেখতে চেয়েছিল। আমি তাদের বলেছিলাম পরে টিকেট কাটতে । আমি জানাবো বাবার অবস্থা ।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতায় সে বাবাকে শেষবার দেখতে পারেনি।
সত্যিই, অনেক সময় মানুষের ভাগ্যের ওপর কারো কোনো হাত থাকে না।
বিপদের সময় মানুষ কতটা অসহায় হয়ে পড়ে, তা এই সময়টাতেই বুঝেছি। তবে আমি অসংখ্য বন্ধু, আমার প্রিয় কলিগবৃন্দ, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে যথেষ্ট সার্পোট পেয়েছি।
আমার ভগ্নিপতিরা বারবার ফোন করে বলছিলেন—
“ভাইয়া, যত টাকা লাগে বাবাকে চিকিৎসা করান। আমরা আছি।”
চিকিৎসা করেছি, কিন্তু বাবাকে আর ফিরিয়ে আনতে পারিনি।
এই কঠিন সময় জুড়ে আমার পাশে সব সময় ছিল আমার প্রিয় ভাগিনা সোহেল এবং ভাতিজা ফয়সাল। বিপদের সময় মানুষের পাশে থাকা—এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় মানবিকতা।
আসলে স্ট্রোকের এই গল্প শুধু আমার একার নয়—এটি অসংখ্য পরিবার ও সন্তানের গল্প।
বাংলাদেশে এখনও স্ট্রোকের জন্য একটি সুসংগঠিত চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। হার্টের চিকিৎসা অনেক উন্নত হলেও ব্রেইন স্ট্রোকের জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনও খুব সীমিত।
আমি একজন ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে বহু স্ট্রোক রোগীর পুনর্বাসনের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ পেয়েছি। দেখেছি—স্ট্রোক থেকে বেঁচে গেলেও অনেক রোগী সঠিক নিউরো রিহ্যাবের অভাবে হাঁটতে পারেন না, নিজের হাতে খাবার খেতে পারেন না, এমনকি কথা বলতেও পারেন না।
স্ট্রোকের চিকিৎসায় ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট এবং নিউরো রিহ্যাব—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যারিয়ারের শুরুতে আমি একটি স্ট্রোক ফাউন্ডেশন করার স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিছু কাজও শুরু করেছিলাম, কিন্তু অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও নানা জটিলতায় সেটি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বাবার মৃত্যুর পর আমি বুঝেছি—শুধু অর্থ থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না।
তাই নতুন করে ভাবলাম—কীভাবে সাশ্রয়ী খরচে স্ট্রোক রোগীদের জন্য কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থা তৈরি করা যায়।
এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় “নিউরোফিট”।
আমাদের লক্ষ্য—যেন সাশ্রয়ী খরচে মানুষ আন্তর্জাতিক মানের নিউরো রিহ্যাবিলিটেশন সেবা পেতে পারে। নিউরোফিটে আমি একজন উদ্যোক্তা মাত্র , বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে আমাদের অত্যন্ত দক্ষ টিম লিডার রয়েছে , যারা নিউরোফিটকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে । আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ । ইনশাল্লাহ , নিউরোফিট এই দেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে ।
তবে নিউরোফিটে কোন ফিজিওথেরাপি সেন্টার নয় । এটা একটা স্ট্রোক রিকভারি সিস্টেম । নিউরোফিট হল স্ট্রোক রিহ্যাবের জন্য প্রয়োজনীয় সকল রিহ্যাব হেলথ প্রফেশনাল এবং মডার্ন ইকুইপমেন্ট নিয়ে গঠিত একটা প্রুভেন সিস্টেম । যেই সিস্টেম স্ট্রোক আক্রান্ত রোগিকে দ্রুত রিকভারী করতে হেলপ করতে সাহায্য করবে ।
গবেষণা অনুযায়ী (The Lancet), প্রায় ৮৫–৯০% স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব—
নিয়মিত ব্যায়াম, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে।
নিউরোফিটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো স্ট্রোক প্রতিরোধমূলক সচেতনতা ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা।
এই কাজগুলো সফল করতে আপনাদের সবার সহযোগিতা, পরামর্শ ও সমর্থন অত্যন্ত প্রয়োজন।
ধন্যবাদ
সাইফুল ইসলাম, পিটি
বিপিটি, এমপিটি
প্রতিষ্ঠাতা , নিউরোফিট (NeuroFit — Hope After Stroke) -
Advance Stroke Rehabilitation Center
পরামর্শের জন্য:
WhatsApp / Call: 01787-152872