09/09/2026
💝 একজন রুগীর মৃত্যুর পর হাসপাতালের কাহিনী
"আজকে আমার দাদাকে মেডিকেলে ভর্তি করিয়েছি। ভর্তি ফি মাত্র ৩০ টাকা। কিন্তু ইমার্জেন্সি থেকে দ্বিতীয় তলার CCU-তে নেওয়ার জন্য ট্রলির ভাড়া চাওয়া হলো ২০০ টাকা। ১০০ টাকা দিতে চাইলে তিনি নিতে রাজি হলেন না। রাগ করে চলে গিয়ে বললেন, “টাকা লাগবে না।” প্রায় ২০ মিনিট পর আবার এসে ১০০ টাকা নিয়ে গেলেন।
এরপর দাদাকে ক্যাথেটার পরানোর প্রয়োজন হয়। ক্যাথেটার পরানোর পর ২০০ টাকা চাওয়া হলো। আমি ১০০ টাকা দিয়ে বললাম, “ভাই, ওষুধ কিনতে কিনতেই আমাদের সব টাকা শেষ হয়ে গেছে। আপনি আপাতত ১০০ টাকা নেন।” তিনি রাগ করে টাকাটা নিলেন এবং পাশে থাকা আরেকজন স্টাফকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “এসব কাজ করানোর জন্য আমাকে আর ডাকবি না।”
এরপর পাশের স্টাফও রাগ করে বলে উঠলেন, “তোরা কেউ আর ওই রোগীর কাছে যাবি না।”
অথচ ক্যাথেটার পরানোর মতো একটি কাজ করতে সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিটের মতো সময় লাগার কথা। এর কিছুক্ষণ পর আরেকজন এসে ব্লাডের স্যাম্পল সংগ্রহ করে নিয়ে গেলেন এবং এর জন্যও ১০০ টাকা নিলেন।
একজন অসুস্থ মানুষকে নিয়ে হাসপাতালে আসার পর চিকিৎসা ও ওষুধের খরচের পাশাপাশি এ ধরনের অতিরিক্ত খরচ ও আচরণের মুখোমুখি হওয়া সত্যিই খুব কষ্টদায়ক। রোগীর স্বজন যখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং চিকিৎসার খরচ জোগাতেই হিমশিম খাচ্ছেন, তখন অন্তত মানবিকতা ও সহানুভূতিশীল আচরণটুকু প্রত্যাশা করা কি খুব বেশি কিছু?
তবে এর বিপরীতে ডাক্তারদের আচরণ ও দায়িত্বশীলতা আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে। কোনো সমস্যার কথা জানানো মাত্রই ডাক্তাররা দ্রুত এসে রোগী দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তাঁদের ব্যবহারও অত্যন্ত মার্জিত ও আন্তরিক।
দেশের আনাচে-কানাচে যেন সব জায়গাতেই কোনো না কোনো সিন্ডিকেট। আর আমরা সাধারণ মানুষ—সবার খোরাক।
এই দেশে জন্মই আমার আজন্ম পাপ।
________________
যাকে নিয়ে আগের পোস্টটি করেছিলাম, অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি—তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
তবে আজ লিখছি তাঁর মৃত্যুর পর আমাদের যে যে সিন্ডিকেটের শিকার হতে হয়েছে, সেই কথাগুলো। একজন মানুষকে হারানোর শোক সামলানোর আগেই কীভাবে নানা ধরনের হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ দাবির মুখোমুখি হতে হয়েছে, সেটিই তুলে ধরছি।
মৃত্যুর পরের ঘটনা
রোগীর পালস রেট যখন শূন্যে নেমে আসে, তখন আমি দ্রুত ডাক্তারের কাছে ছুটে যাই। ডাক্তার বললেন, “আমরা সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিয়েছি, বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা।” এর পরপরই একজন ডাক্তার এসে শেষবারের মতো ECG করেন এবং নিশ্চিত করেন যে রোগী মারা গেছেন।
এরপর শুরু হলো আরেক ধরনের ভোগান্তি।
ভর্তির কাগজটি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। দেখি, একজন ওয়ার্ড বয় কাগজটি নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন ডেথ সার্টিফিকেট লেখানোর জন্য। আমিও তাঁর পেছনে যাই।
ডাক্তারের কক্ষে ঢোকার পর ওই ব্যক্তি আমাকে বলেন, “এখানে তোমার কোনো কাজ নেই, তুমি চলে যাও। যা যা করার, আমরা করছি।”
আমি তাঁকে বললাম, “রোগী মারা যাওয়ার আগে ভর্তির কাগজ নিয়ে আমি অন্তত ২০–৩০ বার ডাক্তার ও নার্সদের কাছে গিয়েছি। তখন তো আপনাদের কাউকে এগিয়ে আসতে দেখিনি। এখন কেন? যা করার, আমিই করব।”
তিনি বললেন, “৪–৫ জন ডাক্তারের স্বাক্ষর নিতে হবে, তুমি এসব পারবে না।”
আমি বললাম, “কোথায় কোথায় স্বাক্ষর নিতে হবে, আমিই নেব। আপনার এখানে কোনো কাজ নেই, আপনি চলে যান।”
অবশ্য তখন আমি রাগের কারণেই কথাগুলো বলেছিলাম। পরে ডাক্তার আমাদের দুজনকেই কক্ষের বাইরে যেতে বলেন।
আমি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকি, আর ওই ব্যক্তি অন্য কাজে চলে যান।
ডাক্তার অত্যন্ত ব্যস্ত থাকায় প্রায় ৪০ মিনিট পর ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দেন। আমি এতক্ষণ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি। এরপর আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, “স্যার, আর কোনো ডাক্তারের স্বাক্ষর নিতে হবে কি?”
তিনি বলেন, “না। এটা নার্সের কাছে জমা দাও। তোমাকে একটি কাগজ দেওয়া হবে, সেটি নিয়ে নিও।”
সবগুলো কাগজ নার্সের কাছে জমা দিয়ে ডেথ সার্টিফিকেটটি নিজের কাছে রাখি।
এরপর লাশ ট্রলিতে করে নিচে নেওয়ার সময় লিফটের কাছে আবার একজন মহিলা ওয়ার্ড বয় ওই পুরুষ ওয়ার্ড বয়কে জিজ্ঞেস করেন, “কাজটা কোথায়?”
তিনি আমার কথা উল্লেখ করেন। এরপর ওই মহিলা আমার কাছে ডেথ সার্টিফিকেটটি চান। আমি তাঁকে বলি, “এটি আপনাকে কেন দেব?” তিনি আর কিছু বলেননি।
লাশ গেটের কাছে নিয়ে আসার পর তাঁদের পক্ষ থেকে ৬০০ টাকা দাবি করা হয়। আমি ২০০ টাকা দিতে চাইলে তাঁরা নিতে রাজি হননি। পরে ৩০০ টাকা দেওয়ার পরও তাঁরা অসন্তুষ্ট হয়ে চলে যান।
ডেথ সার্টিফিকেটটি নিজেদের কাছে নেওয়ার চেষ্টা করার পেছনে অতিরিক্ত টাকা দাবি করার একটি সুযোগ তৈরি করাই তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল—
আরও কষ্টের বিষয় হলো, CCU-এর বাইরে আমরা যখন রোগীর স্বজনরা শোকে দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক তখনই CCU থেকে বের হওয়া আরেকটি লাশের জন্য ৩,০০০ টাকা দাবি করতে দেখেছি। সেই ডেথ সার্টিফিকেটটিও তখন ওয়ার্ড বয়দের কাছে ছিল।
একজন মানুষের মৃত্যুর মুহূর্তে, যখন পরিবারটি শোক ও অসহায়ত্বের মধ্যে থাকে, তখন এ ধরনের অর্থের দাবি সত্যিই অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
এবার আসি অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের কথায়
লাশ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করতে গেলে প্রথমে ৫,০০০ টাকা ভাড়া চাওয়া হয়।
দুই-তিনজন চালকের সঙ্গে কথা বলার পর একজন ব্যক্তি এসে বলেন, “আমি সব ড্রাইভারকে কন্ট্রোল করি।”
আমার কাছে মনে হলো, তিনিই সেখানে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়ার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করছিলেন।
তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতে ভাড়া ৩,৫০০ টাকায় নামানো হয়। কিন্তু এরপর আমরা যে অ্যাম্বুলেন্স চালকের কাছেই যাই, তাঁরা ৩,৫০০ টাকার নিচে যেতে রাজি হচ্ছিলেন না।
একজন ‘কালু’ নামে চালক ২,৫০০ টাকায় যেতে রাজি হলেও, ওই ব্যক্তি তাঁর সঙ্গেও কথা বলে তাঁকে ৩,৫০০ টাকার নিচে যেতে নিষেধ করেন। আমরা যে চালকের কাছেই যাচ্ছিলাম, ওই ব্যক্তিও আমাদের সঙ্গে যাচ্ছিলেন এবং চালকদের ৩,৫০০ টাকার নিচে না যেতে বলছিলেন।
পরে আমরা মেডিকেলের ছোট গেটের কাছে থাকা কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্সের কাছে যাই। সেখানেও তিনি গিয়ে চালকদের ৩,৫০০ টাকার নিচে যেতে নিষেধ করেন।
এরপর দীর্ঘ দরদামের পর একজন চালক ৩,০০০ টাকায় যেতে রাজি হন। কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিই, ২,৫০০ টাকার বেশি দেব না।
ঠিক তখনই গাড়িতে বসে থাকা একজন চালক, যিনি এতক্ষণকার বিষয়গুলো জানতেন না, তাঁর সঙ্গে আমার জামাই কথা বলেন এবং ২,৫০০ টাকায় যেতে রাজি করান।
কিন্তু ওই ব্যক্তি (সিন্ডিকেটের প্রধান) তাঁকে যেতে দিতে চাইছিলেন না। চালকটিও প্রথমে ভয় পেয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানান। পরে আমি তাঁকে সাহস দিলে তিনি যেতে রাজি হন।
তখন ওই ব্যক্তি বলেন, তাঁর নিজের অ্যাম্বুলেন্সই ২,৫০০ টাকায় যাবে। কিন্তু আমার জামাই যে চালকের সঙ্গে আগে থেকেই কথা বলে ভাড়া ঠিক করেছেন, আমরা সেটিই নিতে চাই।
আমি তাঁকে বলি, “আপনার পেছনে প্রায় ৪০ মিনিট ধরে ঘুরছি। এতক্ষণ আপনি যেতে পারেননি, এখন আর আপনার গাড়িতে যাব না।”
এরপর তিনি আমাকে বলেন, “তোমরা আমার গাড়িতে না গেলেও যে গাড়িতে যাবে, আমাকে ২০০ টাকা দিয়ে যেতে হবে।”
পরবর্তীতে শুনেছি, ওই চালক তাঁকে ২০০ টাকা দিয়েছেন। তখন আমি উপরে গিয়ে লাশ নিয়ে আসি।
একজন মানুষকে হারানোর পর পরিবারের মানুষগুলো যেখানে শুধু শেষবারের মতো প্রিয়জনকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার চিন্তায় থাকে, সেখানে যদি সেই অসহায় পরিস্থিতিকেও অর্থ আদায়ের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটি শুধু আর্থিক হয়রানি নয়—এটি মানবিকতারও চরম অবক্ষয়।
আমি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগ করতে চাই না। আমি শুধু একজন স্বজন হিসেবে যা প্রত্যক্ষ করেছি, সেটিই তুলে ধরলাম।
হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সরা আমাদের সমস্যার কথা শুনে দ্রুত রোগী দেখতে এসেছেন। তাঁদের আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীল আচরণ আমাদের ভালো লেগেছে—এই বিষয়টি আগের পোস্টেও উল্লেখ করেছি। তাই চিকিৎসক ও নার্সদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা রয়েছে।
কিন্তু চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সেবাগুলোও যদি স্বচ্ছ, নিয়মতান্ত্রিক ও মানবিক হতো, তাহলে একজন স্বজনকে প্রিয় মানুষ হারানোর পর এতগুলো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না।
(আশাদুর জামান সাহেবের ওয়াল থেকে)
এই গুলা তদারকি করার দায়িত্ব কার ?? প্রশাসনের। দেশের এমন কোনো হাসপাতাল নাই যেখানে এই ওয়ার্ডবয় দের সিন্ডিকেট নাই। সব জানা স্বত্বেও কার্যকর কোন পদক্ষেপ কেন হয় না তা একটি বড় প্রশ্ন।
এজন্যই বলি সিস্টেম ঠিক করার জন্য আন্দোলন করুন। নাহলে, কিছুই হবে না
©ডা: এম এ বি ছিদ্দিক মজুমদার (জাবের)
ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিষ্ট ও মেডিসিন স্পেশালিষ্ট