28/09/2026
চেম্বারে আসা একজন নানার গল্প…
যে গল্পটা শুনে আমার নিজেরও মনটা ভার হয়ে গেল।
প্রায় ৬০ বছর বয়সী একজন ভদ্রলোক তাঁর ১৪ বছরের নাতিকে নিয়ে আমার চেম্বারে এসেছিলেন।
নাতির তিন দিন ধরে জ্বর।
রোগীর ইতিহাস নিতে নিতে স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞেস করলাম—
— “রোগী আপনার কে হন?”
ভদ্রলোক বললেন,
— “আমার মেয়ে ঘরের নাতি, ম্যাডাম।”
কথা বলতে বলতে জানতে পারলাম, তাঁর মেয়ের তিন সন্তান—দুই মেয়ে, এক ছেলে।
এই ছেলেটিই ১৪ বছরের।
একসময় নানাকে জিজ্ঞেস করলাম,
— “পড়ালেখা করে?”
নানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— “না ম্যাডাম… পড়ে না।”
— “কেন?”
এবার তিনি নিজেই বললেন,
“সারাদিন মোবাইল টিপে। রাত জেগে মোবাইল দেখে, সকালে ঘুমায়।”
জিজ্ঞেস করলাম,
— “মোবাইলটা কে দিয়েছে?”
নানা বললেন,
— “ওর বাবা দিয়েছে।”
তারপর যে গল্পটা শুনলাম, সেটাই আসল কষ্টের জায়গা।
এই নানাই একজন রিকশাচালক।
নিজে রিকশা চালিয়ে, অনেক কষ্টে চার লাখ টাকা জোগাড় করে নিজের মেয়ের জামাইকে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন।
স্বপ্ন ছিল—
জামাই বিদেশে যাবে, ভালো আয় করবে, মেয়ে ভালো থাকবে, নাতি-নাতনির ভবিষ্যৎ সুন্দর হবে।
কিন্তু আজ সেই বাবা বিদেশে থেকেও স্ত্রী-সন্তানদের তেমন খোঁজ নেন না।
ছেলেটা পড়ালেখা করছে না দেখে তার মা তাকে ঢাকায় নানার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
নানা সারাদিন রিকশা চালান।
নাতিকে একটা ফ্যাক্টরিতে কাজেও ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন—
কিন্তু নাতি কাজও করবে না।
সারাদিন মোবাইল।
রাত জেগে মোবাইল।
পড়ালেখা নেই।
কাজের প্রতি আগ্রহ নেই।
আমি ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম—
এই বয়সে একটা ছেলে কী স্বপ্ন দেখছে?
সে নিজেকে কোথায় দেখতে চায়?
সে কি জানে, তার ভবিষ্যতের জন্য কত মানুষ কতটা কষ্ট করছে?
যে নানা রোদে-বৃষ্টিতে রিকশা চালিয়ে টাকা জমিয়ে তার বাবাকে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন,
সেই নানাই আজ বলছেন—
“আমি তো চেয়েছিলাম আমার মেয়ে ভালো থাকবে, আমার নাতি-নাতনিগুলো মানুষ হবে।
আমি এত কষ্ট করলাম… কিন্তু কিছুই হলো না।
আমি টোটালি ফেইলড, ম্যাডাম…”
এই কথাটা বলতে বলতে মানুষটা কেঁদে ফেললেন।
সেদিন আমার মনে হলো—
তিনি আসলে ব্যর্থ নন।
ব্যর্থ তিনি নন, যিনি নিজের সামর্থ্যের শেষটুকু দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে চেয়েছেন।
কিন্তু আমরা কি কখনো আমাদের সন্তানদের বোঝাই—
বাবা-মা কতটা কষ্ট করে?
নানা-নানি, দাদা-দাদি কতটা ত্যাগ করেন?
একটা টাকা উপার্জনের পেছনে কত ঘাম ঝরে?
আজকের অনেক কিশোর-কিশোরী রাত জাগছে, দিনের বেলা ঘুমাচ্ছে।
মোবাইল, গেম, সোশ্যাল মিডিয়া তাদের জীবনের বড় একটা অংশ হয়ে যাচ্ছে।
পড়াশোনায় মনোযোগ কমছে, দায়িত্ববোধ কমছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনাও অনেক সময় হারিয়ে যাচ্ছে।
মোবাইল খারাপ নয়।
প্রযুক্তিও খারাপ নয়।
কিন্তু প্রযুক্তি যেন আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ কেড়ে না নেয়।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
সন্তানের সামনে বাবা-মায়ের দায়িত্ববোধের উদাহরণ তৈরি করতে হবে।
কারণ সন্তান শুধু আমাদের কথা শোনে না,
আমাদের কাজও দেখে শেখে।
আমি জানি না, সেই ১৪ বছরের ছেলেটার ভবিষ্যৎ কী হবে।
কিন্তু আমি চাই, আজ থেকে সে একবার অন্তত তার নানার দিকে তাকিয়ে ভাবুক—
“এই মানুষটা আমার জন্য কত কিছু করেছেন।
আমি কি সত্যিই তাঁর কষ্টের মূল্য দিতে পারছি?”
আর আমরা বাবা-মায়েরা একবার ভাবি।
একটা সন্তানকে মানুষ করতে শুধু টাকা লাগে না।
লাগে সময়, শাসন, ভালোবাসা, মূল্যবোধ আর নিজের জীবনের উদাহরণ।
কারণ সন্তানকে পৃথিবীতে আনা সহজ,
কিন্তু তাকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা—এটাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
নিজের যত্ন নিন, বিশেষ করে আমার মা-বোনেরা। আপনি সুস্থ থাকলে আপনার পরিবার সুস্থ থাকবে।
— ডা. নাজমা বেগম শান্তা
Medicine, Diabetes & Thyroid Disease Specialist
চেম্বার:
🏥 Salauddin Specialized Hospital
শনিবার–বুধবার | সন্ধ্যা ৬:৩০–৯:৩০
🏥 Shohid Khaled Ibrahim General Hospital, Wari (NHN)
রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার | বিকেল ৫:০০–৭:০০
🏥 Ibn Sina Diagnostic Centre, Maijdee, Noakhali
প্রতি মাসের ২য় শুক্রবার