21/08/2026
মেয়েটার চোখ দুটো খোলা, কিন্তু কিছু দেখছে না।
চারপাশে মানুষের ভিড়, প্রশ্ন, কান্না, চিৎকার। কিছুই যেন তাকে স্পর্শ করছে না।
১৪ দিন বয়সী নিজের সন্তানকে নিজ হাতে হ'ত্যা করার পর একজন মা এভাবেই বসে আছেন ক্যামেরার সামনে।
কমেন্ট বক্সে প্রচুর মানুষ "রাক্ষসী", "অমানুষ মা", "ফাঁসি চাই" আরও নানান গালি দিচ্ছেন।
তবে এই ১৪ দিন অন্য একটি সংখ্যা।
১৪ দিন!!!!!
এই সংখ্যাটা কাকতালীয় না। মেডিকেল সায়েন্সে এটা একটা নির্দিষ্ট, ভয়ংকর উইন্ডো।
সন্তান জন্মের পর একজন মায়ের মনে তিন ধরনের পরিবর্তন হতে পারে, একটার চেয়ে আরেকটা ভয়াবহ।
প্রথমটা, Baby Blues। প্রায় ৭০-৮৫% মা এর মধ্য দিয়ে যান। ডেলিভারির ২-৩ দিন পর ইস্ট্রোজেন আর প্রোজেস্টেরন হুট করে পড়ে যায়, সাথে ঘুম গায়েব। মন খারাপ লাগে, কান্না পায়। এটা ১-২ সপ্তাহে এমনিতেই ঠিক হয়ে যায়।
দ্বিতীয়টা, Postpartum Depression। উন্নত দেশগুলোতে প্রায় ১০-১৫% মায়ের হয় (WHO)। বাংলাদেশে এই হার অনেক বেশি, বিভিন্ন গবেষণায় ১৮% থেকে প্রায় ৪৮% পর্যন্ত পাওয়া গেছে (PLOS Mental Health, ২০২৫)।
কারণ আমাদের এখানে স্ক্রিনিং নেই বললেই চলে, আর "মা হলে এমন একটু হয়ই" বলে বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়া হয়। সাথে শ্বশুরবাড়ি, স্বামীর এসব ব্যাপারে কোনো নলেজ না থাকা।
তৃতীয়টা, সবচেয়ে বিরল কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক, Postpartum Psychosis। প্রতি ১০০০ ডেলিভারিতে ১-২ জনের হয়। কিন্তু এটা মেডিকেল ইমার্জেন্সি, কারণ এতে মায়ের বাস্তবতাবোধ ভেঙে যেতে পারে, ঘুমের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে কমে যায়, বিভ্রম বা হ্যালুসিনেশন পর্যন্ত হতে পারে।
আর এটা সবচেয়ে বেশি শুরু হয় ঠিক কখন জানেন?
ডেলিভারির প্রথম দুই সপ্তাহের মধ্যে। গবেষণা বলছে, বেশিরভাগ এপিসোড শুরু হয় দিন ৩ থেকে দিন ১৪ এর মধ্যে (BMC Psychiatry, ২০২৫)। ঠিক এই সময়টাতেই হরমোনের সবচেয়ে বড় পতন ঘটে, আর ঘুমহীনতা তীব্র হয়। ঘুমহীনতা নিজেই psychosis এর একটা প্রমাণিত ট্রিগার।
মানে যে মেয়েটা বলছিলেন, "বাচ্চার জন্য ১৪ দিন ঘুমাতে পারছি না", তিনি হয়তো স্রেফ ক্লান্ত ছিলেন না। মেডিকেলি এটা ঠিক সেই উইন্ডো, যেখানে মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করে।
এটা আমার ডায়াগনোসিস না। আমি তাকে দেখিনি, তার মেডিকেল রিপোর্টও আমার কাছে নেই। কিন্তু টাইমলাইনটা ভয়ংকরভাবে মিলে যায়।
আসল সমস্যাটা কিন্তু এই একটা ঘটনা না।
আসল সমস্যা হলো, আমরা এটাকে সবসময় একটা "খুনের গল্প" হিসেবে দেখি, একটা "মেডিকেল ইমার্জেন্সি" হিসেবে না। একটা মেয়ে যখন বলেন "আমি ঘুমাতে পারছি না, ভালো লাগছে না", আমাদের সমাজে সেটাকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়। অথচ এটাই হতে পারে সবচেয়ে বড় রেড ফ্ল্যাগ।
সরাসরি কথা হলো, দোষটা একা এই মায়ের না।
দোষ আমাদের মানুষের চিন্তাভাবনার, আমাদের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার, যেখানে ডেলিভারির পর মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং এখনো রুটিন প্র্যাকটিস না।
দোষ পরিবারের সেই কাঠামোর, যেখানে বাচ্চা হওয়ার পর সবার নজর থাকে বাচ্চার দিকে, মায়ের দিকে না। রাতে কে জাগবে, এটা এখনো শুধু "মায়ের দায়িত্ব" ধরে নেওয়া হয়।
দোষ সেই মিডিয়া কালচারের, যেখানে সচেতনতা বাড়ানোর বদলে "নিষ্ঠুর মা" হেডলাইন বেশি ক্লিক পায়।
দোষ সেই স্টিগমার, যার কারণে একজন মা নিজেই বুঝতে পারেন না যে তার যা হচ্ছে সেটা অসুখ, দুর্বলতা না।
তাহলে কীভাবে এটা ঠেকানো যেত?
প্রথম দুই সপ্তাহে পরিবারের কারো, বিশেষ করে স্বামীর, রাতের একটা শিফট নিজে সামলানো দরকার ছিল, যাতে মা টানা ৩-৪ ঘণ্টা ব্লকে ঘুমাতে পারেন।
মা যদি হঠাৎ কথা কম বলা শুরু করেন, অদ্ভুত কথা বলেন, বাচ্চার প্রতি অস্বাভাবিক ভয় বা সন্দেহ দেখান, কিংবা বাচ্চা ঘুমালেও নিজে ঘুমাতে না পারেন, এগুলো রেড ফ্ল্যাগ। তখনই দ্রুত সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নেওয়া দরকার।
মাকে একা রাখা যাবে না, বিশেষ করে রাতে।
এটা নতুন কিছু না, সারা পৃথিবীতেই ঘটছে।
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে অ্যান্ড্রিয়া ইয়েটস নামের এক মা তার পাঁচ সন্তানকে বাথটাবে ডুবিয়ে হত্যা করেন। তার আগে থেকেই postpartum psychosis আর depression এর দীর্ঘ ইতিহাস ছিল, একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ২০০৬ সালে পুনর্বিচারে আদালত তাকে "not guilty by reason of insanity" রায় দেয় এবং মানসিক হাসপাতালে পাঠায় (সূত্র: The Lancet, উইকিপিডিয়া)।
২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ক্যারল করোনাডো তার তিন মেয়েকে হত্যা করেন। তার আইনজীবীও postpartum psychosis এর দাবি করেছিলেন। কিন্তু আদালত তাকে মানসিকভাবে সুস্থ বিবেচনা করে যাবজ্জীবন সাজা দেয় (সূত্র: CBS News, KQED)।
লক্ষ্য করার বিষয়, দুটো ঘটনার প্যাটার্ন প্রায় একই, কিন্তু বিচার সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও postpartum psychosis কে সবসময় মেডিকেল ইমার্জেন্সি হিসেবে দেখা হয় না। আমাদের দেশে, যেখানে এ নিয়ে ন্যূনতম সচেতনতাও নেই, পরিস্থিতি কতটা কঠিন হতে পারে বুঝে নিন।
সমাধান একদিনে আসবে না, কিন্তু শুরু করা যায় এখনই।
প্রসবের পর ৬ সপ্তাহের চেকআপে মায়ের মানসিক অবস্থা রুটিনভাবে স্ক্রিনিং হওয়া উচিত। দেশের কিছু হাসপাতালে এটা পাইলট আকারে শুরুও হয়েছে (সূত্র: বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের একটি গবেষণা)।
পরিবারকে জানতে হবে, প্রথম দুই সপ্তাহ শুধু বাচ্চাকে "আদর করার সময়" না, এটা মায়ের জন্য মেডিকেলীয় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ও।
একজন মা ক্লান্ত চোখে বলবেন, "আমি আর পারছি না, ভালো লাগছে না", এটাকে হালকাভাবে নেবেন না।
এরকম "নিষ্ঠুর মা"র গল্পের পেছনে হয়তো লুকিয়ে আছে একটা চিকিৎসাযোগ্য, প্রতিরোধযোগ্য অসুখ, যেটা আমরা সময়মতো ধরতে পারিনি।
একজন মানুষের সহ্যক্ষমতা কতটুকু, সেটা বুঝে তার পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব তার আশেপাশের মানুষেরও।
সচেতন হোন। সুস্থ থাকুন.......