26/05/2026
কোরবানি ঈদে আমাদের বাঙ্গালী মুসলিমদের অন্যতম ও একমাত্র পছন্দের খাবার হল গরুর মাংস বা খাসীর মাংস। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় এ সময়টাতে প্রতিবেলার খাবার থেকে শুরু করে নাস্তার আইটেমগুলোতে আমরা গরুর মাংসের প্রাধান্য দিয়ে থাকি। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে আনন্দের মাঝে যেন আমরা অসুস্থ হয়ে না যাই। বিভিন্ন বয়স ও শারীরিক অবস্থাভেদে এ গরুর মাংস গ্রহণের ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে।
নিঃসন্দেহে গরুর মাংস বা খাসির মাংস উচ্চ মূল্যের প্রোটিনের উৎস যাতে আমাদের দেহের জন্য প্রয়োজনীয় সকল অত্যাবশ্যকীয় এমাইনো এসিড পাওয়া যায়। এতে থাকা অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিডগুলোর মধ্যে লিউসিন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা পেশিতে প্রোটিন সংশ্লেষণ, ক্ষয়পূরণ এবং নতুন টিস্যু গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।এছাড়াও এতে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, বিশেষ করে বি-১২(যা কেবলমাত্র প্রানি উৎস হতে পাওয়া যায়),বি৬, বি৩ ও জিংক, আয়রন,সেলেনিয়াম,ফসফরাস,পটাশিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজের অন্যতম উৎস।
এই পুষ্টিতে ভরপুর খাবারটি সঠিক ও পরিমিত পরিমানে গ্রহণের মাধ্যমে শরীরে সর্বোচ্চ পুষ্টি সাধন সম্ভব। একজন সুস্থ স্বাভাবিক ব্যক্তির দৈনন্দিন প্রোটিনের চাদিহা থাকে তার ওজনের ০.৮-১ গ্রাম। ✅একজন সুস্থ ওজনের ব্যক্তি যার ওজন ৬০ থেকে ৭০ এর মধ্যে সে দৈনিক প্রায় ২০০-২৫০ গ্রাম গরুর মাংস গ্রহন করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, এ পরিমান মাংসে একবেলায় নয়,তিন বেলায় ভাগ করে গ্রহন করতে হবে। যদি ঐদিন অন্য প্রোটিনের উৎস যেমন ডিম,মুরগির মাংস,দুধ, গ্রহণ করলে এর পরিমাণ ১৮০-২০০ গ্রামে রাখা ভালো।
✅ গরুর মাংসে চর্বিতে স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও কোলেস্টেরলের পরিমান বেশি থাকে বলে হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য খেয়াল রাখতে হবে গরুর মাংস গ্রহনের পরিমান সারা দিনে যেন ৬০-৭০ গ্রামের বেশি না হয় এবং অবশ্যই তা চর্বিহীন লিন মিট হতে হবে।
✅ ডায়াবেটিস, লিভারে সমস্যা বা কিডনিজনিত জটিলতায় যারা ভুগছেন তাদের জন্য এই পরিমান ৯০-১০০ গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা জরুরী।
✅অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য, পাইলস বা এনাল ফিসারের সমস্যা বাড়তে পারে, যা ব্যথা ও রক্তক্ষরণের কারণ হয়। তাই ঈদের সময় পর্যাপ্ত পানি পান করা করার পাশাপাশি ইসবগুলের ভুষি, তোকমা, চিয়া সিড বা লেবুর শরবতের মতো তরল ও আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করা জরুরি, যা হজম ভালো রাখবে ও কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকি কমাবে।
✅২ বছরের নিচে তাদের গরুর মাংস না দেয়াই ভালো, যাদের এলার্জির আছে তাদেরও এটি গ্রহনে বিশেষ সতর্ক হতে হবে।
⭕গরুর মাংস রান্নার সঠিক পদ্ধতি:
১.ছোট ছোট করে টুকরা করুন এবং সময় নিয়ে কষিয়ে রান্না করুক। খুব বেশি তাপে রান্না করা থেকে বিরত থাকুন।
২.মাংস ম্যারিনেশনের জন্য সিরকা, লেবুর রস, টকদই, আদা, রসুন ইত্যাদি বিভিন্ন প্রাকৃতিক মসলা ব্যবহার করুন যাতে এটি সহজপাচ্য হয়।
৩.গরুর মাংস সিদ্ধ করে পানি ফেলে দিয়ে রান্না করলে তা পুষ্টিমূল্য ও স্বাদে কিছুটা তারতম্য হলেও হৃদরোগ, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের কিংবা পরিবারের বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য জন্য তা ভালো।
৪.চিলি বিফ, গ্রিল, বিফ স্টেক, বিফ টিক্কা স্বাস্থ্যকর অপশন হতে পারে।
⭕লক্ষ্যনীয় বিষয়:
✅রান্নায় খুব বেশি তেল বা মসলা এড়িয়ে চলুন।
✅ প্রতিবেলায় পর্যাপ্ত পরিমানে সালাদ ও শাক-সবজি রাখা অত্যন্ত জরুরি।
✅গরুর মাংসের সাথে যথাসম্ভব প্লেইন খাবার রাখুন যেমম : সাদা ভাত, রুটি,তেল ছাড়া পরোটা ইত্যাদি।
✅মাংসের কারি তরকারিতে কারি গ্রহনে সর্তক হোক কারন এই ঝোলেও ভাল পরিমানে ক্যালরি থাকে।
✅ ভারী খাবার যেমন পোলাও,বিরিয়ানি,কাচ্চি ইত্যাদি গ্রহনের পর বোরহানি,টকদই,জিরা পানি, মৌরি পানি, আদা পানি রাখলে তা হজমে সহায়ক হবে।
✅ যেকোনো ধরনের Soft Drinks বা রঙিন পানীয় গ্রহন থেকে বিরত থাকুন। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত মিষ্টি খাবার পরিহার করা বিভিন্ন মৌসুমি ফল রাখুন বা অল্প চিনি / স্টেভিয়া (সবথেকে স্বাস্থ্যকর) দিয়ে মিষ্টি খাবার তৈরি করুন।
✅ খাবার গ্রহনের পর পর শোয়া থেকে বিরত থাকুন এবং খাবারের ১০-১৫ মিনিট পর ১৫-২০ মিনিট হাটতে পারেন এটি খাবার হজমের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
✅সারাদিনে শুধু শুয়ে বসে গল্প-গুজবে না কাটিয়ে ৪০-১ ঘন্টা হাটা নিশ্চিত করুন।
মাংস সংরক্ষণ পদ্ধতি :
যেহেতু অনেক গরম পড়ছে, মালস কাটার পর রক্ত হতে ভালভাবে মাংস ধুয়ে পরিষ্কার করে পানি ঝরিয়ে/শুকিয়ে ১ কেজি করে ফ্রিজার পেপারে র্যাপ করে চেপে চেপে (যাতে বাতাস না থাকে) জিপলক ব্যাগে সংরক্ষণ করুন। এভাবে রাখলে ৩-৪মাস খাওয়া যাবে। রেফ্রিজারেটরের সঠিক তাপমাত্রা মেইনটেইন করাও জরুরি।এছাড়া organ meet যেমন(মগজ,কলিজা) দ্রুত খেতে হবে। এগুলো বেশিদিন সংরক্ষন করা ঠিক নয়।
ঈদের আনন্দ যেন অসুস্থতায় রূপ না নেয়, সে জন্য পরিমিত ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। সচেতনতাই পারে উৎসবকে নিরাপদ ও আনন্দময় করে তুলতে।
⭕রিমাইন্ডার⭕
তাকবিরে তাশরিক আদায়: ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত—এই পাঁচ দিন মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর একবার ‘তাকবিরে তাশরিক’ বলা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের ওপর ওয়াজিব। তাকবিরটি হলো—‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’ নামাজ জামাতে হোক বা একাকী, এই তাকবির পাঠ করতে হবে।
সানজিদা সুলতানা
নিউট্রশন ও ডায়েট কনসালটেন্ট
আল-বারাকা হসপিটাল ও ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্স