02/10/2026
আপনি আসলে সুখ খুঁজছেন না।
আপনি খুঁজছেন এমন কিছু, যেটা আপনি নিজেও জানেন না।
একটু ভাবুন তো —
রাত দুইটায় ঘুম আসছে না, তাই ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রল করছেন।
মন খারাপ, তাই অনলাইনে কিছু একটা অর্ডার করে ফেললেন।
অফিসের কাজের চাপ, তাই ফ্রিজ খুলে কিছু খেয়ে নিলেন।
বাড়িতে অশান্তি, তাই সারাক্ষণ বাইরে ব্যস্ত থাকছেন।
এগুলোর কোনোটাই আপনি সুখের জন্য করছেন না।
আপনি করছেন, যাতে ভেতরের ওই খচখচে অনুভূতিটা একটু চুপ থাকে।
এক হাজার বছর আগের একটা আবিষ্কার
একাদশ শতাব্দীর আন্দালুসিয়ায় (আজকের স্পেন) ইবনে হাযম নামে একজন মুসলিম পণ্ডিত ছিলেন। আইনবিদ, দার্শনিক, কবি।
তিনি একটা প্রশ্ন নিয়ে বছরের পর বছর ভেবেছিলেন — পৃথিবীর সব মানুষ, সবাই একসঙ্গে কোন জিনিসটা চায়?
ধনী-গরিব, জ্ঞানী-অজ্ঞ, রাজা-প্রজা — সবাই।
তিনি তাঁর বইয়ে লিখলেন, অনেক খুঁজে তিনি এমন একটাই লক্ষ্য পেয়েছেন, যেটা নিয়ে মানুষে মানুষে কোনো মতভেদ নেই।
সেটা হলো — দুশ্চিন্তা দূর করা।
কেউ টাকা জমায়, যাতে অভাবের দুশ্চিন্তা না থাকে।
কেউ খ্যাতি খোঁজে, যাতে অবহেলার দুশ্চিন্তা না থাকে।
কেউ আনন্দে ডুবে থাকে, যাতে একাকীত্বের দুশ্চিন্তা ভুলে থাকা যায়।
পথ আলাদা। গন্তব্য একটাই।
কিন্তু সমস্যাটা হলো...
ইবনে হাযম দেখলেন, এই পথগুলোর প্রায় কোনোটাই কাজ করে না।
টাকা এলে আসে টাকা হারানোর ভয়।
খ্যাতি এলে আসে খ্যাতি হারানোর ভয়।
আনন্দ শেষ হলে ফিরে আসে আগের শূন্যতা — অনেক সময় আরও বড় হয়ে।
আমরা যেটা দিয়ে দুশ্চিন্তা তাড়াই, সেটাই নতুন দুশ্চিন্তা নিয়ে আসে।
আপনার মস্তিষ্ক এভাবেই ফাঁদে পড়ে
আধুনিক নিউরোসায়েন্স এই ফাঁদের পুরো নকশাটা খুঁজে পেয়েছে।
যখন কোনো একটা কাজ করলে অস্বস্তি সাময়িকভাবে কমে, মস্তিষ্ক সেটা মনে রাখে। শুধু মনে রাখে না, পরের বার অস্বস্তি এলেই আপনাকে সেই কাজটার দিকে ঠেলে দেয়।
অস্বস্তি → ফোন হাতে নেওয়া → একটু স্বস্তি → মস্তিষ্ক শিখল "এটাই সমাধান"।
যত বার এই চক্র ঘোরে, মস্তিষ্কের অভ্যাসের পথ তত মজবুত হয়। একসময় এটা আর সিদ্ধান্ত থাকে না, হয়ে যায় অভ্যাস। আপনি টেরও পান না কখন হাতে ফোন চলে এসেছে।
মনোবিজ্ঞানে একে বলে নেগেটিভ রিইনফোর্সমেন্ট। পুরস্কার পাওয়ার জন্য নয়, কষ্ট থেকে পালানোর জন্য একটা আচরণ বারবার করা।
আর সবচেয়ে ভয়ের কথা — এতে দুশ্চিন্তা কমে না, বাড়ে।
ক্যালিফোর্নিয়ার একটা গবেষণায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কিছুক্ষণের জন্য ফোন নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। যাঁরা সারাদিন সবচেয়ে বেশি ফোন ব্যবহার করেন, তাঁদের দুশ্চিন্তা মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই বাড়তে শুরু করল, আর সময়ের সঙ্গে বাড়তেই থাকল।
যে জিনিসটা দিয়ে তাঁরা দুশ্চিন্তা সামলাতেন, সেটাই হয়ে উঠেছিল দুশ্চিন্তার নতুন কারণ।
থেরাপির ভাষায় একে বলে অনুভূতি থেকে পালানো।গবেষণা বারবার দেখিয়েছে, যাঁরা কষ্টদায়ক অনুভূতি থেকে যত বেশি পালান, তাঁদের দুশ্চিন্তা আর বিষণ্নতা তত বেশি হয়।
কারণ যে অনুভূতি থেকে পালাবেন, সে আপনাকে ধাওয়া করবেই।
তাহলে উপায় কী?
ইবনে হাযম নিজের উত্তরটা খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি লিখলেন, দুশ্চিন্তা দূর করার একমাত্র পথ যেটা কখনো প্রতারণা করে না, তা হলো আল্লাহর দিকে ফেরা, আর আখিরাতের জন্য কাজ করা।
কারণ বাকি সব কিছু হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এই লক্ষ্যটা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। আর যে লক্ষ্য হারানোর ভয় নেই, সেখানে হারানোর দুশ্চিন্তাও নেই।
কুরআন একই কথা বলেছে এক বাক্যে —
"জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।" (সূরা রা'দ, ১৩:২৮)
খেয়াল করুন, পার্থক্যটা কোথায়। স্ক্রলিং, শপিং, খাওয়া — এগুলো অনুভূতিকে চাপা দেয়। আর সত্যিকারের প্রশান্তি অনুভূতির মুখোমুখি হয়ে তাকে একটা বড় অর্থের ভেতরে জায়গা দেয়।
তবে একটা কথা খুব স্পষ্ট থাকুক
যদি দুশ্চিন্তা এতটাই তীব্র হয় যে ঘুম, খাওয়া, কাজ — সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, মাসের পর মাস চলছে, তাহলে সেটা ঈমানের দুর্বলতা নয়। সেটা চিকিৎসাযোগ্য একটা অবস্থা।
তখন দোয়া আর চিকিৎসা দুটোই চালিয়ে যাবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই চিকিৎসা নিতে উৎসাহ দিয়েছেন। কাউকে "নামাজ পড়ো, সব ঠিক হয়ে যাবে" বলে সাহায্য নেওয়া থেকে দূরে রাখবেন না।
আজকের ছোট কাজ
আজ যখনই হাত আপনা থেকে ফোনের দিকে যাবে, ফ্রিজের দিকে যাবে, বা কোনো কাজে ডুবে যেতে চাইবেন — ঠিক তিন সেকেন্ড থামুন।
নিজেকে একটাই প্রশ্ন করুন:
"আমি এখন কোন অনুভূতি থেকে পালাচ্ছি?"
একঘেয়েমি? একাকীত্ব? ভয়? অপরাধবোধ?
শুধু নামটা দিন। কিছু বদলাতে হবে না।
তারপর চাইলে কাজটা করুন। কিন্তু এবার আপনি জেনে করছেন, অভ্যাসে নয়।
আর অনুভূতিটা যখন খুব ভারী লাগবে, ফোনের বদলে দুই মিনিট চুপ করে বসুন। শ্বাস নিন। মনে মনে আল্লাহকে বলুন, ঠিক কী কষ্ট হচ্ছে। কাউকে বলা যায় না এমন কথাও বলুন।
পালালে অনুভূতি পিছু নেয়। মুখোমুখি হলে, ধীরে ধীরে সে পথ ছেড়ে দেয়।
আপনার হাত সবচেয়ে বেশি কোন জিনিসটার দিকে যায়, যখন মন খারাপ থাকে? কমেন্টে লিখুন, হয়তো আপনার উত্তরটাই আরেকজনকে নিজেকে চিনতে সাহায্য করবে।
Soul Wellness — Breathe · Believe · Blossom