09/09/2026
একটি ফোন কল যে মানুষের জীবনের মোড় এভাবে ঘুরিয়ে দিতে পারে, তা সেদিন রিমনকে না শুনলে বুঝতাম না। রিমনের রিসিভারের ওপাশ থেকে ভেসে আসা গলাটা চিনতেই কষ্ট হচ্ছিল। ভেঙে পড়া, কান্নায় ভেজা এক কণ্ঠ—বলল, তার ছোট বোনটা আর নেই। মাত্র ২৪ বছর বয়স ছিল মেয়েটার। সামান্য জ্বরে ভুগে হুট করেই চলে গেল না-ফেরার দেশে।
একমাত্র বোনকে আগলে রাখাই যেন ছিল রিমনের আনন্দ। ওদের সম্পর্কের বাঁধনটা ছিল খুব গভীর। বোনের এই আকস্মিক বিদায় রিমনের ছক-বাঁধা গোছানো জীবনে প্রলয় নিয়ে এলো। সবকিছু মুহূর্তে তাসের ঘরের মতো এলোমেলো হয়ে গেল।
রিমন একজন আধুনিক ও সফল ব্যবসায়ী। কাজের ব্যস্ততা আর নতুন নতুন ভাবনায় যার দিন কাটত, সেই মানুষটা যেন রাতারাতি বদলে গেল। প্রতিষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ করে দিল সে। সারা দিন ঘরের চারদেওয়ালে বন্দি হয়ে একা একা টিভির পর্দার দিকে চেয়ে থাকা কিংবা চুপচাপ বসে থাকা—এই ছিল তার দিনপঞ্জি। আত্মীয়স্বজন, সামাজিক অনুষ্ঠান—সবকিছু থেকে নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নিল।
এর চেয়েও ভয়াবহ সংকট তৈরি হলো তার রাতে। সারারাত রিমন জেগে থাকত। অন্ধকারের সাথে সাথে নেমে আসত এক অজানা আতঙ্ক। মৃত্যুভয় তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত—মনে হতো, বোন যেভাবে হঠাৎ চলে গেল, সে-ও কি তবে এভাবেই মরে যাবে? ঘুমের অভাবে শরীরে ও মনে জমতে শুরু করল চরম যন্ত্রণা। কারও সাথে ফোনে কথা বলাও বন্ধ করে দিল সে।
সেদিন ফোনে আমায় আকুতি জানিয়ে বলছিল—
"জানিস, মাঝে মাঝে মনে হয় রাস্তার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করি। মানুষ এসে আমাকে মেরে ফেলুক... কিংবা চলন্ত কোনো গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াই, গাড়িটা এসে আমায় পিষে দিয়ে যাক।"
কথাগুলো সরাসরি 'আত্মহত্যা' শব্দটা উচ্চারণ না করলেও রিমনের ভেতরে মরার এক তীব্র সুপ্ত বাসনা কাজ করছিল। জীবনের প্রতি তার তীব্র বিতৃষ্ণা চলে এসেছিল, কোনোকিছুতেই আর আগ্রহ খুঁজে পাচ্ছিল না। নিজের জীবনকে উদ্দেশ্যহীন মনে হচ্ছিল তার। সত্যি, আত্মহত্যা এক ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণার নাম—যা মানুষকে নিঃশব্দে গ্রাস করে ফেলে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে আমি দেরি না করে ওর পরিবারকে সব জানালাম। পরিবারও রিমনের ভেতরের এই গভীর ক্ষত ও অস্থিরতা বুঝতে পারল। তারা বুঝতে পারল, বোনকে হারানোর এই শোক রিমন একা সামলাতে পারছে না, তার জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
আল্লাহর অশেষ রহমতে, সঠিক মেডিকেল ট্রিটমেন্ট এবং নিয়মিত প্রফেশনাল কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে আলোর মুখ দেখতে শুরু করল রিমন। দীর্ঘ দুই বছরের লড়াই ও চেষ্টার পর সে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠল। আবার সে ফিরে পেল জীবনের ছন্দ, ফিরে গেল তার প্রিয় ব্যবসা-বাণিজ্যে।
আমার জীবনের অন্যতম বড় স্বস্তি—আমার বন্ধুটি হারিয়ে যেতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত অন্ধকার পথ থেকে ফিরে এসেছে।
ফাতেমা তুজ জোহরা