19/05/2026
অনেক অভিভাবক তাদের সন্তান দ্রুত কথা বলা শিখুক, এই স্বাভাবিক প্রত্যাশা থেকেই শিশুকে বারবার শব্দ বলানোর চেষ্টা করেন। তারা মনে করেন, “যত বেশি বলাবো, তত দ্রুত শিখবে।” তাই শিশুকে প্রায়ই বলা হয় “বলো মা”, “বলো পানি”, “এটা বলো”, “আবার বলো”, কিংবা “না বললে এটা পাবে না।” কখনো কখনো শিশুকে জিনিস দেওয়ার আগেও বলা হয়, “আগে বলো, তারপর দেবো।” অভিভাবকদের উদ্দেশ্য সাধারণত ভালোই থাকে, তারা চান শিশু দ্রুত ভাষা শিখুক এবং অন্যদের মতো কথা বলা শুরু করুক। কিন্তু অনেক সময় এই অতিরিক্ত চাপ শিশুর ভাষা শেখার স্বাভাবিক আগ্রহকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
ভাষা শেখা কোনো মুখস্থ করানোর বিষয় নয়, এটি একটি স্বাভাবিক, ধীরে ধীরে বিকশিত হওয়া সামাজিক ও আবেগভিত্তিক প্রক্রিয়া। একটি শিশু তখনই সবচেয়ে ভালো ভাষা শেখে, যখন সে নিরাপদ, স্বস্তিকর এবং আনন্দময় পরিবেশে থাকে। কিন্তু যখন তার ওপর “বলতেই হবে” ধরনের চাপ তৈরি হয়, তখন সে কথা বলাকে আনন্দের পরিবর্তে ভয়, অস্বস্তি বা মানসিক চাপের সঙ্গে যুক্ত করতে শুরু করতে পারে।
অনেক সময় দেখা যায়, শিশুটি কোনো শব্দ বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারছে না। তখন পরিবারের সদস্যরা তাকে বারবার সংশোধন করেন “না না, এভাবে না”, “আবার বলো”, “ঠিক করে বলো।” কেউ কেউ আবার শিশুর ভুল উচ্চারণ শুনে হেসে ফেলেন বা অন্য শিশুদের সাথে তুলনা করেন। যেমন “অমুকের বাচ্চা তো অনেক সুন্দর করে কথা বলে !” এসব আচরণ শিশুর আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ধীরে ধীরে সে কথা বলার চেষ্টাই কমিয়ে দিতে পারে, কারণ তার মনে হতে পারে সে “ভুল” করছে।
বিশেষ করে যেসব শিশু দেরিতে কথা বলে, speech difficulty আছে বা communication anxiety অনুভব করে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। কিছু শিশু কথা বলার সময় অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করে, কেউ কেউ চুপ হয়ে যায়, আবার কেউ শুধুমাত্র ইশারা বা মাথা নেড়ে যোগাযোগ করতে চায়। কারণ তারা ভুল বলার ভয় পায় বা মনে করে তাদের কথা বলার চেষ্টা যথেষ্ট ভালো নয়।
ভাষা শেখা কখনোই চাপ বা ভয় দেখিয়ে কার্যকরভাবে শেখানো যায় না। শিশুর মস্তিষ্ক তখনই সবচেয়ে ভালোভাবে ভাষা শিখতে পারে, যখন communication একটি আনন্দময় এবং ইতিবাচক অভিজ্ঞতা হয়। যখন মা-বাবা ধৈর্য নিয়ে শিশুর কথা শোনেন, তার ছোট ছোট প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন এবং ভুল হলেও তাকে উৎসাহ দেন, তখন শিশুর ভাষা ব্যবহারের আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
অনেক পরিবারে আবার শিশুকে অতিথিদের সামনে “পারফর্ম” করানো হয়। যেমন “আঙ্কেলকে কবিতা বলো”, “গান গাও”, “এই শব্দটা বলো।” শিশু যদি না বলতে চায়, তখন তাকে বারবার বলা হয় বা চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু সব শিশু সবার সামনে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। বিশেষ করে যেসব শিশু স্বভাবত লাজুক, sensitive বা speech difficulty-তে ভুগছে, তাদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও অস্বস্তিকর হতে পারে। এতে তারা ভবিষ্যতে সামাজিক পরিস্থিতিতেও কথা বলা এড়িয়ে চলতে পারে।
শিশুর ভাষা বিকাশে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো তাকে স্বাভাবিকভাবে কথা বলার সুযোগ দেওয়া। উদাহরণস্বরূপ, শিশু যদি “পা” বলে পানি বোঝাতে চায়, তাহলে “হ্যাঁ, তুমি পানি চাও?” বলে তার প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে। এতে শিশু বুঝতে পারে যে তার যোগাযোগের চেষ্টা মূল্যবান। ধীরে ধীরে সে আরও শব্দ ব্যবহার করতে আগ্রহী হয়।
শিশুকে কথা বলাতে চাইলে তার সাথে খেলতে হবে, গল্প বলতে হবে, গান গাইতে হবে, তার প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা করতে হবে এবং communication-কে আনন্দময় করে তুলতে হবে। ভাষা শেখা তখনই সবচেয়ে ভালো হয়, যখন শিশু নিজে থেকে কথা বলতে আগ্রহ অনুভব করে, কখনোই শুধু চাপের কারণে নয়।
একটি শিশু যখন অনুভব করে যে তাকে বিচার করা হচ্ছে না, বরং তার প্রতিটি ছোট প্রচেষ্টাকেই ভালোবাসা ও ধৈর্যের সাথে গ্রহণ করা হচ্ছে, তখন তার ভাষা ব্যবহারের আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়। আর এই আত্মবিশ্বাসই ধীরে ধীরে তাকে আরও স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগাযোগ করতে সাহায্য করে।
ভাষা শেখা কোনো প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি সম্পর্ক, ভালোবাসা, interaction এবং ধৈর্যের মাধ্যমে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি স্বাভাবিক বিকাশগত যাত্রা। তাই শিশুকে জোর করে কথা বলানোর পরিবর্তে, তার জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন যেখানে সে নিরাপদ অনুভব করবে, আনন্দ পাবে এবং নিজের মতো করে কথা বলার সুযোগ পাবে।
মোঃ আব্দুর রহমান
ক্লিনিক্যাল স্পিচ এন্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট
চীফ কনসালটেন্ট, ব্রেইন জিম বাংলাদেশ