15/09/2026
আমরা একটি মানুষকেও হার্ট অ্যাটাকে মরে যেতে দেবো না"–হার্ট ও লাইফস্টাইল সেমিনারে কবি মোহন রায়হান
হৃদরোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের গুরুত্ব তুলে ধরার মধ্য দিয়ে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘হার্ট ও লাইফস্টাইল সেমিনার’। ‘বিনা রিং, বিনা অপারেশনে হৃদরোগ মুক্তির’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ সেমিনারে হৃদরোগ থেকে দূরে থাকতে অত্যাধুনিক সাওল চিকিৎসা, নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং লাইফস্টাইল পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সোমবার, রাজধানীর ২৬ ইস্কাটন গার্ডেন রোডস্থ সাওল হার্ট সেন্টার, বাংলাদেশ-এর 'কাজল মিলনায়তন'–এ সাওল হার্ট সেন্টার, বাংলাদেশ এবং ইনার হুইল ক্লাব অব ঢাকা নর্থ ওয়েস্ট-এর যৌথ উদ্যোগে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইনার হুইল ডিস্ট্রিক্ট-৩৪৫-এর চেয়ারম্যান শিরিন আক্তার চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন সাওল হার্ট সেন্টার, বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান কবি মোহন রায়হান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাওল হার্ট সেন্টার.- বাংলাদেশ-এর সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. জাবিদ-উল-কাদির জোয়ার্দ্দার। এছাড়া ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত হৃদরোগ ও লাইফস্টাইল বিশেষজ্ঞ ডা. বিমল ছাজেড়, এমডি। পুষ্টিবিষয়ক আলোচনা করেন সাওল হার্ট সেন্টারের সিনিয়র পুষ্টিবিদ শারমিন সুলতানা।
ইনার হুইল ক্লাব অব ঢাকা নর্থ ওয়েস্ট-এর সাধারণ সম্পাদক সৈয়দা সারা সালাউদ্দিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়। স্বাগত বক্তব্যে সাওল হার্ট সেন্টার, বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান কবি মোহন রায়হান সাওল চিকিৎসা পদ্ধতিতে তাঁর ব্যক্তিগত হৃদরোগ-মুক্তির অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশে সাওল হার্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠার পটভূমি তুলে ধরেন।
কবি মোহন রায়হান বলেন, আমার বাবা, ভাই, চাচা ও শ্বশুরসহ পরিবারের অনেক সদস্য হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। কলকাতার এপোলো হসপিটালে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিজের হার্টেও ব্লক ধরা পড়লে রিং বা বাইপাস অপারেশনের পরামর্শ পাওয়ার পর আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। এ সময় সাওলের সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থা– কাটাছেঁড়া ছাড়া অত্যাধুনিক ইইসিপি মেশিনে হার্টের ব্লকের বাইপাস এবং খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারার পরিবর্তন গ্রহণ করে আমি সুস্থতা লাভ করি।"
মোহন রায়হান নিজের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে সাওল হার্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন বলেও উল্লেখ করেন।
দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে হৃদরোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে সাওলের সফল কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে কবি মোহন রায়হান বলেন, “আমরা একটি মানুষকেও হার্ট অ্যাটাকে মরে যেতে দেবো না।” হৃদরোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে মানুষকে সুস্থ থাকার সুযোগ করে দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য বলে জানান।
ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে ভারতের বিশিষ্ট হৃদরোগ এবং লাইফস্টাইল বিশেষজ্ঞ ডা. বিমল ছাজেড় হৃদরোগের কারণ, হার্ট অ্যাটাকের বিষয়সমূহ এবং তা প্রতিরোধের বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা করেন। তথ্যচিত্রের মাধ্যমে হৃদরোগের সঙ্গে জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক তুলে ধরে তিনি অংশগ্রহণকারীদের বিনা রিং, বিনা অপারেশনে হৃদরোগ মুক্তির প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সাওল হার্ট সেন্টারের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. জাবিদ-উল-কাদির জোয়ার্দ্দার হৃদরোগ প্রতিরোধে সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি হার্ট ব্লকেজের কারণ ও তা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের উপায় এবং সাওলের সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যে খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শরীরচর্চা ও জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে হৃদরোগ থেকে দূরে থাকার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
পুষ্টিবিষয়ক আলোচনায় সাওল হার্ট সেন্টারের সিনিয়র পুষ্টিবিদ শারমিন সুলতানা নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, হৃদরোগ প্রতিরোধে খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তেল ও চর্বি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সঠিক খাদ্য পরিকল্পনার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসম্মত ও সুস্বাদু খাবার গ্রহণ করা সম্ভব। খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখলে হৃদরোগসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া যায়। তিনি সার্বিক সুস্থতার জন্য প্রশিক্ষিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্য পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান।
সেমিনারে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সাবেক ডিএমডি আহসানুল হক চৌধুরী সেলিম। তিনি বলেন, তাঁর ৭৫ বছর বয়সী মায়ের হার্টে ব্লক ধরা পড়ার পর ইউরোপ, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে একসাথে ৬টি রিং পরানোর কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে তাঁর মা সাওল পদ্ধতিতে চিকিৎসা গ্রহণ করেন এবং বর্তমানে ৮৮ বছর বয়সেও স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।"
অতিথির বক্তব্যে ইনার হুইলের ডা. সামসাদ কবির হৃদরোগ প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ে স্বাস্থ্যসচেতনতা গড়ে তুলতে পারলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি একটি সুস্থ পরিবার গড়ে তোলা সম্ভব।"
ইনার হুইল ক্লাবের স্থায়ী সদস্য পারভিন জামান বলেন, একজন নারী পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। নারী নিজে স্বাস্থ্যসচেতন হলে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যেও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা সহজ হয়।"
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইনার হুইল ডিস্ট্রিক্ট-৩৪৫-এর চেয়ারম্যান শিরিন আক্তার চৌধুরী হৃদরোগ প্রতিরোধে সাওল হার্ট সেন্টারের সচেতনতামূলক কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, একটি সুস্থ হৃদয় একটি সুস্থ জীবন ও সুস্থ পরিবারের ভিত্তি।"
সেমিনারে উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সাওলের বিশেষজ্ঞ কার্ডিওলজিস্ট ও পুষ্টিবিদগণ। হৃদরোগের ঝুঁকি, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তাঁরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল হৃদরোগে আক্রান্ত একটি শিশুর চিকিৎসায় ইনার হুইল ক্লাব অফ ঢাকা নর্থ ওয়েস্টের সহযোগিতার উদ্যোগ। সেমিনার থেকে শিশুটির পাশে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
সচেতনতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের বার্তা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে শেষ হয় সাওল হার্ট সেন্টার ও ইনার হুইল ক্লাব অব ঢাকা নর্থ ওয়েস্ট-এর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হার্ট ও লাইফস্টাইল সেমিনার।
– নিজস্ব প্রতিনিধি