17/04/2026
এপ্রিল মাস—Head and Neck Cancer Awareness Month উপলক্ষে আমার এই লেখা Daily Jugantor-এ প্রকাশিত হয়েছে।
https://www.jugantor.com/viewers-opinion/1089717
শিরোনাম: হেড-নেক ক্যানসার চিকিৎসায় আধুনিক রেডিওথেরাপি: সম্ভাবনা, বাস্তবতা ও করণীয়
বাংলাদেশে হেড-নেক ক্যানসার একটি নীরব মহামারী । মুখ, জিহ্বা, গলা, ল্যারিংস ও ন্যাসোফ্যারিংস—এই অঙ্গগুলোর ক্যানসার আমাদের দেশে উল্লেখযোগ্য হারে দেখা যায়। তামাক, জর্দা, পান-সুপারি, ধূমপান ইত্যাদি এই রোগের প্রধান কারণ। কিন্তু আশার কথা হলো—আধুনিক রেডিওথেরাপি এই রোগের চিকিৎসায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে, যা শুধু রোগ নিয়ন্ত্রণই নয়, রোগীর জীবনের মানও উন্নত করছে।
আগে রেডিওথেরাপি যে উপায়ে দেয়া হতো তাতে ক্যানসারের পাশাপাশি আশপাশের সুস্থ টিস্যুও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকত । কিন্তু বর্তমানে ইনটেনসিটি মডুলেটেড রেডিওথেরাপি (IMRT) এবং ভলিউমেট্রিক মডুলেটেড আর্ক থেরাপি (VMAT) প্রযুক্তির মাধ্যমে টিউমারের গঠন অনুযায়ী রেডিয়েশন প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে টিউমারে যথাযথ উচ্চ ডোজ দেওয়া যায়, আবার লালাগ্রন্থি, স্পাইনাল কর্ড, ওরাল ক্যাভিটি—এসব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ সুরক্ষিত রাখা যায়। এর বাস্তব ফলাফল হচ্ছে—মুখ শুকিয়ে যাওয়া, খাওয়ায় সমস্যা, কথা বলার অসুবিধা—এসব জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
ইমেজ-গাইডেড রেডিওথেরাপি (IGRT) এই নির্ভুলতাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে। প্রতিদিন চিকিৎসার আগে ইমেজিং করে রোগীর অবস্থান নিশ্চিত করা হয়, ফলে প্রতিটি সেশনই নির্ভুলভাবে দেওয়া সম্ভব হয়। এতে চিকিৎসার কার্যকারিতা বাড়ে এবং পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি কমে।
হেড-নেক ক্যানসারের চিকিৎসায় একটি বড় লক্ষ্য হলো অঙ্গ সংরক্ষণ (Organ Preservation) । অনেক ক্ষেত্রে আগে যেখানে সার্জারি করে কণ্ঠনালী বা মুখের অংশ অপসারণ করতে হতো, এখন আধুনিক কনকারেন্ট কেমোরেডিওথেরাপির মাধ্যমে সেই অঙ্গ অক্ষত রেখেই চিকিৎসা সম্ভব হচ্ছে। এটি শুধু শারীরিক নয়, রোগীর মানসিক ও সামাজিক জীবনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখন প্রশ্ন হলো—এই উন্নত প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ আমাদের দেশে কতটা হচ্ছে? বাস্তবতা হলো, কিছু উন্নত কেন্দ্র ছাড়া এখনও অনেক জায়গায় এই সুবিধা সীমিত। ফলে অনেক রোগী আধুনিক চিকিৎসার পূর্ণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। এখানেই প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত জাতীয় পরিকল্পনা ।
প্রথমত, ক্যানসার চিকিৎসায় বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। ঢাকা-কেন্দ্রিক সেবা থেকে বের হয়ে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে ধাপে ধাপে আধুনিক রেডিওথেরাপি ইউনিট স্থাপন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করতে হবে। শুধু যন্ত্রপাতি থাকলেই হবে না—রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, মেডিক্যাল ফিজিসিস্ট, রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট—সবাইকে আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স বা মাননিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। রেডিওথেরাপি অত্যন্ত সংবেদনশীল চিকিৎসা, এখানে সামান্য ভুলেরও বড় প্রভাব থাকতে পারে। তাই প্রতিটি কেন্দ্রে নিয়মিত মান যাচাই বাধ্যতামূলক করা উচিত।
চতুর্থত, রোগীদের জন্য খরচ সহনীয় করা জরুরি। আধুনিক রেডিওথেরাপি অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল, ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত রোগীদের জন্য এটি একটি বড় বাধা। সরকারি সহায়তা, স্বাস্থ্যবীমা বা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে এই খরচ কমানো সম্ভব।
পঞ্চমত, দ্রুত রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করতে হবে। অনেক রোগী দেরিতে আসেন, ফলে চিকিৎসা জটিল হয়ে যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে রেডিওথেরাপির ফলাফল অনেক ভালো হয়।
আধুনিক রেডিওথেরাপির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হাইপোফ্র্যাকশনেশন, যেখানে কম সংখ্যক সেশনে চিকিৎসা সম্পন্ন করা যায়। এটি রোগীর জন্য সময় সাশ্রয়ী, খরচ কমায় এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপও কমায়—যা বাংলাদেশের মতো দেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবকিছু বিবেচনায়, আধুনিক রেডিওথেরাপি এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন। এটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং ক্যানসার চিকিৎসার একটি কার্যকর পথ।
যদি আমরা সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত রোগ নির্ণয়, আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে গুরুত্ব দিই—তাহলে হেড-নেক ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারব।
এখন সময় এসেছে—নীতিনির্ধারক, চিকিৎসক এবং সমাজ একসাথে কাজ করার। কারণ, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রয়াস থাকলে আধুনিক রেডিওথেরাপি হাজারো রোগীর জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালাতে পারে।
ডাঃ আরমান রেজা চৌধুরী
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ
এভারকেয়ার হাসপাতাল ঢাকা
বাংলাদেশে হেড-নেক ক্যানসার একটি নীরব মহামারি। মুখ, জিহ্বা, গলা, ল্যারিংস ও ন্যাসোফ্যারিংস—এই অঙ্গগুলোর ক্যানসার ...