10/05/2026
হাম সচেতনতা
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হামের বিস্তার বাড়ছে, যা নিয়ে সবাই চিন্তিত। এ নিয়ে মানুষের মনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো নিয়েই আজকের উপস্থাপনা-
~হাম (Measles) কি?
হাম একটি ভাইরাসজনিত মারাত্বক ছোঁয়াচে রোগ।
~কিভাবে ছড়ায়?
আক্রান্ত রোগীর হাঁচি কাশির মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায় । এই রোগী গায়ে লালচে দানা আসার আগে ৪ দিন এবং পরে ৪ দিন রোগ ছড়াতে পারে। একজন হাম রোগী থেকে তার আশে পাশের ১৫ -২০ জন পর্যন্ত আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
হামের জীবানু বাতাসে ২ ঘন্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকে, সেজন্য রোগীর সাথে সরাসরি সাক্ষাত না হয়েও হাম হতে পারে। এই জীবাণু আমাদের শ্বাসনালী দিয়ে অথবা চোখ দিয়েও শরীরে ঢুকতে পারে।
~হাম হলে কি হয়?
জ্বর এর সাথে গায়ে লালচে দানা হলেই সেটা কে সন্দেহভাজন হাম হিসেবে গন্য করা হয়। র্যাশ বা লালচে দানা প্রথমে মুখে ও কানের পিছনে, এরপরে শরীরে ও হাতে পায়ে আসে। সাথে সর্দি- কাশি, চোখ লাল হওয়া ও পানি পরা, ডায়রিয়া থাকতে পারে।
~হাম সংক্রান্ত কি কি জটিলতা হতে পারে?
• নিউমোনিয়া
• ডায়রিয়া
• চোখের সমস্যা
• কানের সংক্রমন
• এমনকি মস্তিষ্কে সংক্রমণ (এনসেফালাইটিস)
~হাম রোগের তো টিকা দেয়া হয় আমাদের দেশে EPI প্রোগ্রামে, তাহলে কেন এরকম আউটব্রেক হল?
আমাদের ই পি আই প্রোগ্রামে শিশুদের জন্য হাম রুবেলার টিকা দেয়া হয় ৯ মাস শেষে এবং ১৫ মাসে।
একটা কমিউনিটি থেকে এই রোগের প্রাদুর্ভাব দূর করতে কমপক্ষে শতকরা ৯৫ ভাগ শিশুকে ভ্যাক্সিন দিতে হয়। দুঃখজনক হল বিগত বছর গুলোতে এই ভ্যাক্সিনের কভারেজ ছিল শতকরা ৮৫ ভাগ। এর মূল কারণ অজ্ঞতা, ভুলে যাওয়া, টিকা সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব ও সামান্য সর্দি কাশিতে টিকা দেয়া থেকে বিরত থাকা।
আর ক্যাম্পেইন গুলো প্রতি ৪ বছরে একবার করা প্রয়োজন। কিন্তু ২০২০ সালের পরে আর কোন হাম রুবেলা ক্যাম্পেইন হয়নি।
এসব কারণেই হয়ত এই প্রাদুর্ভাব।
~হামের এই আউটব্রেক কি শুধু আমাদের দেশেই হয়?
* না, পরিসংখ্যান বলছে ইউরোপ সহ উন্নত বিশ্বেও মাঝেমাঝেই এই রোগের প্রাদুর্ভাব হয়
~হাম হয়েছে কিনা কি পরীক্ষা করে বোঝা যাবে?
* প্রথমত এটি একটি ক্লিনিক্যাল ডায়াগনসিস। জ্বরের সাথে ত্বকে লালচে র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে তাকে সন্দেহভাজন হাম হিসেবেই গন্য করতে হবে।
*Serum IgM & IgG for measles - রক্তে
IgM antibody সাধারণত র্যাশ আসার ৩ দিন পর থেকে পাওয়া যায় এবং ৩০ দিন পর্যন্ত পজিটিভ থাকতে পারে।
IgG antibody র্যাশ আসার ৭ দিন পরে পজিটিভ আসে। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নির্দেশ করে।
*RT-PCR for measles (Viral RNA detection) নাক ও গলা থেকে সংগৃহিত রস থেকে এই পরীক্ষা করা যায়। গায়ে র্যাশ আসার প্রথম ৭ দিনের মধ্যে করলে রোগ নির্ণয় করা যায় । এটি দিয়ে খুব দ্রুত রোগ নির্ণয় সম্ভব। IgM পজিটিভ আসার আগেই এটি পজিটিভ আসে।
~হামের চিকিৎসা কি?
* হামে আক্রান্ত বাচ্চাকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখুন ( Isolation)।বিশেষত যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম, এক বছরের কম বয়সী শিশু এবং গর্ভবতী মহিলাদের পৃথক রাখুন।
* আক্রান্ত শিশুকে সেবা দেয়ার সময় মাস্ক ব্যবহার করুন।
*আক্রান্ত শিশুকে ধরার আগে ও পরে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।
*বাচ্চাদের খাবার ও পানিয় পর্যাপ্ত পরিমানে দিতে হবে।
*বয়স অনু্যায়ী ডোজে ভিটামিন 'এ' দিতে হবে ১ম ও ২য় দিন। চোখে জটিলতা থাকলে ১৪ তম দিনে আরো এক ডোজ দিতে হবে।
*জ্বর, ডায়রিয়া কিংবা অন্যান্য জটিলতা যথানিয়মে চিকিৎসা দিতে হবে।
~কখন বাচ্চাকে ভর্তি দিতে হবে?
* বাচ্চা পরিমান মত খেতে না পারলে
* বারে বারে বমি করলে
* অতিরিক্ত দুর্বল হলে বা অজ্ঞান হলে
* খিচুনী হলে
* শ্বাসকষ্ট হলে
* ডায়রিয়া জনিত পানিশুন্যতা হলে
~ হামে শিশুদের মৃত্যু কেন হচ্ছে?
শিশুদের হাম হলেই ভয় পাওয়া বা আতংকিত হওয়ার কিছু নেই। এটি ভাইরাস জনিত রোগ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ৫/৭ দিনের মধ্যে ভাল হয়ে যায়। আমাদের দেশে যেহেতু অপুষ্টিতে ভোগা বাচ্চাদের সংখ্যা বেশি, দেখা যাচ্ছে তাদের ক্ষেত্রেই জটিলতা ও মৃত্যুহার বেশি হচ্ছে । যারা সময়মত ২ ডোজ ভ্যাক্সিন দেয় নি তাদের ও জটিলতা বেশি হচ্ছে।
~ভ্যাকসিন কখন দিব?
*সরকারীভাবে ২০ শে এপ্রিল থেকে ২০ শে মে পর্যন্ত এম আর (হাম রুবেলা) ক্যাম্পেইন ২০২৬ হচ্ছে সারা দেশে।
*আপনার ৬ মাস হতে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুকে বিনা মূল্যে এই টিকা দেয়া হবে।
*যারা আগে এই রোগের ১ বা ২ ডোজ পেয়েছে তারাও দিবে।
*যাদের আগে হাম হয়েছে তারাও দিবে।
*এমন কি যাদের রুটিন ভ্যাক্সিন পাওয়ার আর অল্প কয়েকদিন বাকি আছে তারাও দিবে।
* যার বয়স ছয় বা সাত মাস সে এখন ক্যাম্পেইনের টিকা দিবে পরবর্তীতে ৯ এবং ১৫ মাসে রুটিন টিকা দিবে।
*যার বয়স সাড়ে ৮ মাস মাস সে এখন ক্যাম্পেইনের টিকা দিবে, ২৮ দিন পরে অর্থাৎ সাড়ে ৯ মাসে সে রুটিন টিকা দিবে।
*এই ক্যাম্পেইনের টিকা একটি এক্সট্রা ডোজ, তাই যাদের রুটিন এম আর টিকা এখনো দেয়া হয়নি, তারা বাকি এক বা দুই ডোজ যথা সময়েই নিবে। তবে সব সময় খেয়াল রাখতে হবে দুই ডোজের মধ্যে কমপক্ষে ২৮ দিন ব্যাবধান থাকবে।
~কারা টিকা দিবে না?
* যারা গত ২৮ দিনের মধ্যে এই টিকা পেয়েছে।
*অসুস্থ বা হাসপাতালে ভর্তি শিশু ( সুস্থ হবার পরে নিতে পারবে) ।
* আগে টিকা দেয়ার পরে কোন ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়েছে।
~হামের এই আউটব্রেক চলাকালীন করণীয় কি?
*বাচ্চাকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ান।
*সময়মতো টিকা দিন।
*ভিড় যুক্ত স্থানে বাচ্চাকে নেয়া থেকে বিরত থাকুন।
*বাইরে বের হলে সবাই মাস্ক ব্যবহার করুন। *হাত সাবান দিয়ে ধোয়ার অভ্যাস করুন।
*জ্বরের সাথে গায়ে লালচে দানা দেখলে অবশ্যই নিকটস্থ শিশু রোগ চিকিৎসক এর পরামর্শ নিন অথবা টেলিমেডিসিনের সাহায্য নিন।
সবাই সুস্থ ও নিরাপদ থাকুন।
ডা. ফেরদৌস আরা
এম. ডি. (পেডিয়াট্রিক্স)
সহকারী অধ্যাপক ( শিশুস্বাস্থ্য)
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
#হাম